অস্বস্তিকর পরিস্থিতি চাপা আতঙ্ক

এস এম মিন্টু
Printed Edition
  • ৪ মাসে সারা দেশে হত্যাকাণ্ড ১১৪২
  • ১৬ মাসে ৫২২ শিশু হত্যা
  • ৪ মাসে ৫৯৫৮ নারী-শিশু নিপীড়ন
  • চার মাসে ডাকাতি ১৮৪, চুরি ৪০৯৯
  • পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ২১৩

আট বছরের ফুটফুটে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় দেশ যখন উত্তাল ঠিক তখনই বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে আরেক শিশু ধর্ষণের ঘটনায় নিন্দার ঝড় উঠেছে। দেশে একের পর এক নারী ও শিশু নিপীড়ন-ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড, ডাকাতি-ছিনতাই, চুরি এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাংবাদিকের ওপর হামলায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি ও চাপা আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে সিলেটের সুরমা ক্বিন এলাকায় মাদককারবারিদের ধরতে গিয়ে এক মাদকসেবীর ছুরিকাঘাতে র‌্যাব সদস্য নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া গতকাল ভোরে সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ থানার পুরাতন কালারুকা গ্রামে মায়মুনা জান্নাত তোহা নামে দেড় বছরের কন্যা শিশুকে ঘুমন্ত অবস্থায় হাত-পা বেঁধে গলাকেটে হত্যার অভিযোগ উঠেছে মায়ের বিরুদ্ধে। এ সময় তার আরেক শিশু সন্তানকেও হত্যা করতে গেলে শিশুটি পালিয়ে মসজিদের ভেতর আশ্রয় নিয়ে তার বাবাকে বিষয়টি জানায়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত নারীকে আটক করে পুলিশে দিয়েছেন স্থানীয়রা।

এ দিকে অপরাধীদের ধরতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার সাংবাদিক, তুচ্ছ কারণে রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের ওপর হামলা এবং হত্যার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে। পাশাপাশি নিজের সন্তানকে হত্যার ঘটনাও সাধারণ মানুষের মনকে নাড়া দিচ্ছে।

গতকাল সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাভারে মাদককারবারিদের হামলায় দেশ টিভির রিপোর্টার ও ক্যামেরাম্যান গুরুতর আহত হয়েছেন। মাদককারবারিরা তাদের গাড়ি ভাঙচুর করে। এরআগে বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের খবর নিতে গিয়ে হামলার শিকার হন তিন টিভি সাংবাদিক। আহতরা হলেন- চ্যানেল ওয়ানের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান শাহনেওয়াজ রিটন, ক্যামেরাপারসন অমিত দাশ ও স্টার নিউজের ক্যামেরাপারসন জালাল উদ্দিন। তার একদিন আগে বুধবার রাজধানীর মিরপুরের কালশী বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় অবৈধ বস্তি উচ্ছেদের সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনা ঘটে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষের উচ্ছেদ অভিযানের খবর সংগ্রহের সময় ফেসবুক লাইভ চলাকালে পুলিশের হামলার শিকার হন দুই সংবাদকর্মী। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ব্যাপক সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ওই বছর ৬২২ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার হন।

পুলিশ সদর দফতরের হিসাব অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত গত চার মাসে সারা দেশে শুধু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ১৪২টি। নারী ও শিশুর প্রতি নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৯৫৮টি। এ ছাড়া ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ১৮৪টি। অপহরণের শিকার হয়েছেন ৩৪৭ জন। আর চুরির ঘটনা ঘটেছে ৪ হাজার ৯৯টি। আবার পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন ২১৩ জন পুলিশ সদস্য।

২০২৫ সালে সারা দেশে খুন ও নৃশংস হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩ হাজার ৭৮৬টি, যা ২০২৪ সালে ছিল ৩ হাজার ৪৪২ এবং ২০২৩ সালে হত্যার মামলা হয়েছিল ৩ হাজার ২৩টি। মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিগত ১৬ মাসে ৫২২ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তা নেই সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দিবে কে? সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্বস্তি ফেরাতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো কঠোর হতে হবে। একই সাথে বিচার বিভাগকে সতর্কতার সাথে আসামিকে জামিন দিতে হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিচারহীনতার কারণে নারী-শিশুর প্রতি এমন ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্ম হচ্ছে প্রতিদিন। মাদকসেবী, মাদককারবার নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারায়ও খুনাখুনি একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নুসরাত জাহান আদিবা নামে রাজধানীর এক নারী বলেন, রামিসার হত্যার যে ধরণ তা সব বর্বরতাকে হার মানিয়েছে। এমন পৈশাচিক নিষ্ঠুরতা ঘটানো খুনিকে প্রকাশ্যে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বৃহস্পতিবার রামিসার বাবাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার বাস্তবায়ন এক সপ্তাহের মধ্যে কার্যকর করতে হবে। আদিবা জানান, এতটুকু ফুটফুটে মেয়ের লাশের দৃশ্য কোনো বাবা-মা সহ্য করতে পারবে না। তিনি বলেন, আমার আট মাসের মেয়েকে নিয়েও আমি চিন্তিত। যে দেশে কোনো অবুঝ শিশুর জীবনের নিরাপত্তা নেই সেখানে বসবাস করা দায়। এমন নিষ্ঠুরতা ঘটানোর আগে চিহ্নিত অপরাধীদের আদালত জামিন না দিয়ে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করলে অপরাধ অনেক কমে আসবে।

মেয়েকে হারানোর পর বিচারব্যবস্থার ওপর গভীর আক্ষেপ ও অনাস্থা প্রকাশ করে শিশু রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা সমবেদনা জানাতে আসা জনপ্রতিনিধিদের জানিয়েছিলেন, আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই।

এ প্রসঙ্গে সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ বলেন, এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত মামলা নেয়া, সঠিক তদন্ত করা এবং দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। এমন ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে অপরাধীরা কিছুটা হলেও ভয় পাবে। সমাজে কমবে অপরাধপ্রবণতা।

সম্প্রতি গাজীপুরের কাপাসিয়ায় বসতঘরে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় একই পরিবারের পাঁচজনকে। হত্যাকারী নিহতদের বাবা, স্বামী ও দুলাভাই। ঘটনার পর হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ফোরকান মিয়ার লাশ মেলে নদীতে।

অন্য দিকে গত সোমবার উদ্ধার করা হয় প্রবাসী মোকাররম মিয়ার (৩৭) আট টুকরা লাশ। প্রথমে পাওয়া যায় মস্তকবিহীন সাত টুকরা। পরে মাথা উদ্ধার করা হয়। পরকীয়া, বান্ধবীর মেয়ের সাথে অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং অর্থ লেনদেনের ত্রিমুখী সঙ্কটের কারণে এমন লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা: মেখলা সরকার বলেন, বৈশ্বিকভাবে একটা অস্থিরতা চলছে। বাংলাদেশেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সাথে প্রযুক্তির রেশ প্রকট আকার ধারণ করেছে। আত্মিক বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে মানুষ। সেই সাথে নিজের লোভ পূরণে উদগ্রীব হয়ে পড়া, পরিবারের সাথে সংযোগ কমে যাওয়া, স্বজনদের সাথে সহমর্মিতার অভাব, প্রযুক্তি আসক্তি, টেলিভিশনে ক্রাইম পেট্রোলের মতো অনুষ্ঠান প্রচার, নেটফ্লিক্সে ভয়ানক ছবি দেখা, সংবেদনশীলতার সঙ্কট, ছোট থাকতেই বিভিন্ন গেমসের মাধ্যমে খুন করা শেখা, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ বাধাগ্রস্ত হওয়া, নৈতিকতার অভাব, সংস্কৃতির চর্চার অভাবসহ নানান কারণেই সমাজে খুনাখুনি বাড়ছে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে সংস্কৃতিচর্চা, খেলাধুলার সুযোগ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি জোর দিতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহারও সীমিত পরিসরে করতে হবে।

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধন কমে যাওয়া, অবৈধ সম্পর্কে জড়ানোর কারণে খুনাখুনি বাড়ছে। তিনি বলেন, সামাজিকভাবে মানুষ খুব অল্পতেই ধৈর্যহারা হয়ে যাচ্ছে। এমনিতে খুনাখুনির ঘটনা প্রতিরোধ করা খুবই কঠিন। এরপরও আমরা চেষ্টা করছি যে ঘটনাগুলো ঘটছে সেগুলোর যথাযথ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

রাজধানীর পল্লবী, মুগদা, বাগেরহাট কিংবা গাজীপুরের কাপাসিয়ার মতো প্রতিনিয়ত দেশের কোনো না কোনো স্থানে নৃশংস হত্যার ঘটনা ঘটছে। বিশেষজ্ঞরা এসব খুন দেখছেন সামাজিক অস্থিরতা হিসেবে। তারা বলছেন, এগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়, বরং ভয়ঙ্কর এক সামাজিক অশনিসংকেত। কান্না করায় কোলের শিশুকে হত্যা কিংবা মায়ের বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে সন্তানদের খুন অথবা প্রতিবেশীকে ফাঁসাতে প্রিয় সন্তানকে খুন করা যেন দুধভাত হয়ে উঠেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পারিবারিক অশান্তি, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। ছোটখাটো পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতা সমাজে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। মনোমালিন্যকে কেন্দ্র করে পরিবারে একাধিক পক্ষ তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এতে করে মানুষের মনে জন্ম নিচ্ছে জিঘাংসা। তৌহিদুল হক মনে করছেন, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নৈতিক শিক্ষার অভাব, দৃশ্যমান বিচারের ঘাটতির প্রতিফলন ঘটছে সমাজে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুব কায়সার মনে করেন, গ্লোবালাইজেশনের প্রভাবে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক বন্ধন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে সম্পর্কের ভেতরে জমে থাকা রাগ, হতাশা, হীনম্মন্যতা কিংবা দ্বন্দ্ব অনেক সময় ভয়ংকর সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা, সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী এবং মানবিক মূল্যবোধের পুনর্গঠন। কারণ একটি পরিবার ধ্বংস হওয়া মানে শুধু কয়েকটি প্রাণ হারানো নয়, একটি সমাজের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে মানবিকতার আলো নিভে যাওয়া।

টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক এই পরিস্থিতির সার্বিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেভাবে ঢেলে সাজানোর কথা ছিল, রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সেই জোরালো পদক্ষেপগুলো দেখা যায়নি। তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, অপরাধীদের দমনে পুলিশ প্রশাসনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করতে দিতে হবে। যদি রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, তবে সমাজের এই অস্থিরতা কমানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।