সংরক্ষিত নারী আসনে কয়েক শ’ প্রার্থীর চাপে বিএনপি হিমশিম

জোট থেকে মনোনয়ন পেতে পারেন একাধিক জন

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ
Printed Edition

দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম ও দমন-পীড়নের কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে এবার সংসদে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর বিএনপির নারী নেত্রীরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি হতে দলটির ভেতরে শুরু হয়েছে ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল সব পর্যায়ের শত শত নেত্রী মনোনয়নপ্রত্যাশায় সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। ফলে যোগ্যতা, ত্যাগ ও সাংগঠনিক অবদানের ভিত্তিতে প্রার্থী বাছাই করতে গিয়ে কার্যত হিমশিম খেতে হচ্ছে বিএনপিকে। এ ছাড়াও জোটের শরিক থেকেও একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারে বিএনপি।

এসব নারী প্রার্থীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন, যুগপৎ আন্দোলন শরিক দল ও জোট থেকে জেএসডির আ স ম রবের স্ত্রী তানিয়া রব, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার স্ত্রী মেহের নিগার, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকির স্ত্রী তসলিমা নাসরিন, গণসংহতি আন্দোলন শীর্ষ নেতা ট্রাক চাপায় নিহত আরিফুল ইসলামের স্ত্রী রেবাকা নীল, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হকের মেয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মোশরেকা অদিতি হক, (কাজী জাফরের জাতীয় পার্টি) মেয়ে জয়া কাজী, জাতীয় দলের এহসান হুদার স্ত্রী রোকসানা শারমিন, সমমনা জোট ডক্টর ফরিদুজ্জামান ফরহাদের স্ত্রী।

দলীয় সূত্র জানায়, রাজপথের লড়াকু নেত্রী, মহিলা দল ও ছাত্রদল থেকে উঠে আসারা মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখরাও আলোচনায় আছেন। অনেকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করছেন, আবার কেউ কেউ দলীয় শীর্ষ নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

ইতোমধ্যে নারী এমপি নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। গত ৬ এপ্রিল কমিশনের সভায় এ সংক্রান্ত আলোচনা হয়েছে এবং সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গতকাল তফসিল ঘোষণা করা হয়।

ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ তারিখ ২১ এপ্রিল। মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ভবনে দাখিল করতে হবে।

সংরক্ষিত নারী আসনের বণ্টন প্রসঙ্গে ইসি সচিব জানান, বিএনপি ও তাদের জোটের জন্য ৩৬টি আসন নির্ধারণ করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোট পাবে ১৩টি আসন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে একটি আসন। সব মিলিয়ে মোট আসন সংখ্যা ৫০।

তিনি আরো জানান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও রুমিন ফারহানা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করবেন; তারা কোনো জোটে নেই।

বিএনপির দলীয় সূত্রে জানা যায়, সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক নেত্রী মনোনয়নপ্রত্যাশী। তাদের মধ্যে রয়েছেন দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাকর্মী, সাবেক এমপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের দায়িত্বশীল নেত্রী এবং নতুন মুখও। ফলে মনোনয়ন নির্ধারণ দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দলটির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানান, এবার মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবদান, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা ও ত্যাগকে। একই সাথে নারী নেতৃত্বের বিকাশ এবং তরুণদের সুযোগ দেয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। ২০০৮ সালের সংরক্ষিত আসনের এমপি এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়া নারীদের অগ্রাধিকার দেয়া হতে পারে। ত্রয়োদশ নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়া প্রার্থীরাও প্রাধান্য পেতে পারেন। পাশাপাশি অতীতে ভোটাধিকার আন্দোলনে নিহত ও গুরুতর আহত সিনিয়র নেতাদের পরিবারের সদস্যদেরও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

এদিকে তফসিল ঘোষণার তারিখ ঘনিয়ে আসায় সংরক্ষিত নারী মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তৎপরতাও ক্রমেই বাড়ছে। দলীয় কার্যালয়, শীর্ষ নেতাদের বাসভবন এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সাথে যোগাযোগ করছেন তারা। নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, যোগ্যতা ও দলের প্রতি অবদানের বিষয় তুলে ধরে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন অনেকে।

বিএনপির প্রার্থী তালিকায় আলোচনায় আছেন সাবেক ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে দলের ভরাডুবির মধ্যে বিজয়ী কক্সবাজার-১ আসনের হাসিনা আহমদ ও সিরাজগঞ্জ-২ আসনের রুমানা আহমেদ। ২০১৮ সালের বিতর্কিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে হামলা-মামলার মধ্যেও তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। বিগত সময়ে আন্দোলনে সংগ্রামে তাদের অবদান রয়েছে।

জানা গেছে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের সহধর্মিণী হাসিনা আহমদ এবং আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সহধর্মিণী রুমানা আহমেদ সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন।

এ ছাড়া নবম জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের এমপিরাও বিবেচনায় আছেন। সেই সময়ে সংসদের ভেতরে বক্তব্য দিয়ে তারা যেমন গরম রাখতেন, ঠিক তেমনি বিগত সময়েও আন্দোলনে-সংগ্রামেও তারা সক্রিয় ছিলেন। এরা হলেন- বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সহসম্পাদক নিলোফার চৌধুরী মনি, বিএনপির মানবাধিকারবিষয়ক সহসম্পাদক সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, মিডিয়া সেলের সদস্য শাম্মী আক্তার, প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক রাশেদা বেগম হীরা ও নির্বাহী কমিটির সদস্য রেহানা আক্তার রানু।

অষ্টম জাতীয় সংসদের সাবেক সদস্য ও মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ এবং ইয়াসমিন আরা হকও আলোচনায় আছেন। এ ছাড়া বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক এমপি শিরীন সুলতানাও আলোচনায় আছেন। তিনি যুগ্মমহাসচিব খায়রুল কবির খোকনের সহধর্মিণী।

আলোচনায় যেসব কেন্দ্রীয় নেতার সহধর্মিণী এবং মেয়ে আলোচনায় আছেন তারা হলেন- রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর সহধর্মিণী সাবিনা ইয়াসমিন, কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা, পটুয়াখালী-২ আসনের সালমা আলম, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য জেবা আমিন খান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের স্ত্রী তাহমিনা জামান শ্রাবণী, বিএনপির ক্ষুদ্র ঋণবিষয়ক সম্পাদক এম এ কাইয়ুমের সহধর্মিণী শামীম আরা বেগম। স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রয়াত সভাপতি শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন।

শফিউল বারী বাবু কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের আমলে হামলা মামলা নির্যাতনের শিকার হয়ে একপর্যায়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এরপর তার স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন অর্পণ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে গুম খুন ও নির্যাতনের শিকার নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ান।

এ ছাড়া আলোচনায় আছেন মরহুম ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের স্ত্রী হাসনা জসিম উদ্দিন মওদুদ, মরহুম মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদারের একমাত্র মেয়ে ব্যারিস্টার সালিমা বেগম আরুণি, বিএনপির সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর মেয়ে সামিরা তানজিনা চৌধুরী।

এ ছাড়া তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে বেড়ে ওঠা ছাত্রদল নেত্রী সাবেক ভিপি অধ্যাপিকা নাজমা সুলতানা ঝংকার। তিনি ১৯৯৬ সালে কুমিল্লা সরকারি মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্রী সংসদের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। এরপর তিনি ছাত্রদল ও মহিলাদলের দায়িত্ব পালন করেন।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তিন প্রার্থীও এগিয়ে আছেন। এই নির্বাচনে ৯ নারীপ্রার্থী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোটে লড়াই করে তিনজন পরাজিত হন। এরা হলেন- শেরপুর-১ আসনে যুগ্ম আহ্বায়ক সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা, যশোর-২ আসনে সাবিরা সুলতানা, ঢাকা-১৪ আসনে মায়ের ডাকের সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, এই তিনজনকে সংসদের সংরক্ষিত আসনে দেখার সম্ভাবনা বেশি।

এছাড়া সংখ্যালঘু হিন্দু ও উপজাতীয় সম্প্রদায় থেকে ৫ জনকে নারী সংসদ সদস্য করা হতে পারে বলে জানা গেছে।

বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির এক সদস্য জানান, প্রাথমিকভাবে একটি বড় তালিকা প্রস্তুত করে তা থেকে পর্যায়ক্রমে সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হচ্ছে। পরে সংসদীয় বোর্ডের বৈঠকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হবে। সে ক্ষেত্রে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অনুমোদন ছাড়া কোনো তালিকা চূড়ান্ত হবে না।