এএইচএফ কাপ চ্যাম্পিয়ন

ইতিহাস লিখেছে মেয়েরা, এবার মর্যাদা দেয়ার পালা

Printed Edition
ইতিহাস লিখেছে মেয়েরা, এবার মর্যাদা দেয়ার পালা
ইতিহাস লিখেছে মেয়েরা, এবার মর্যাদা দেয়ার পালা

ক্রীড়া প্রতিবেদক

অনেক বছর ধরে বাংলাদেশের হকি মানেই ছিল হতাশা, অবহেলা আর অপূর্ণ সম্ভাবনার গল্প। আলোচনার টেবিলে ক্রিকেট, ফুটবল কিংবা অন্য খেলাগুলোর ভিড়ে হকির নাম খুব কমই উচ্চারিত হয়েছে। আর নারী হকি? সেটি যেন ছিল আরো প্রান্তিক এক অধ্যায়। কিন্তু ওমানের মাস্কাটে বাংলাদেশের মেয়েরা সেই পুরনো গল্পটাই বদলে দিল। তারা শুধু এএইচএফ কাপ টুর্নামেন্ট জেতেনি, তারা দেশের হকির ইতিহাসে প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা এনে লিখেছে এক নতুন অধ্যায়। মাস্কাটের সেই ট্রফি শুধু একটি ধাতব কাপ নয়। এটি বাংলাদেশের নারী শক্তির প্রতীক, অবহেলাকে হার মানানো সাহসের প্রতীক, অসম্ভবকে সম্ভব করার এক উজ্জ্বল দলিল। আজ যারা লাল-সবুজ পতাকা কাঁধে নিয়ে বিজয়ের হাসি হাসছে, তারা আমাদের জাতীয় সম্পদ।

এই সাফল্যের আনন্দে ভেসে যাওয়ার আগে আমাদের নিজেদের কাছেও কিছু জবাব চাওয়া উচিত। এই মেয়েরা কি পর্যাপ্ত অনুশীলন সুবিধা পেয়েছে ? আন্তর্জাতিক মানের টার্ফ, নিয়মিত প্রতিযোগিতা, আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা সম্মান, সবকিছু কি তাদের প্রাপ্য অনুযায়ী ছিল? উত্তরটি সুখকর নয়। সীমিত সুযোগ, অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধা আর অগণিত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়েই তারা ইতিহাস লিখেছে। তাই এই ট্রফি শুধু সোনালি সাফল্যের প্রতীক নয়, এটি আমাদের ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার জন্যও একটি কঠিন বার্তা।

অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন। কথাটি শুনতে যতটা সহজ, অর্জনটি ততটাই কঠিন। হংকং চায়নাকে ৬-০, উজবেকিস্তানকে ১-০, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে ৮-০ গোলের লজ্জা, গ্রুপ পর্বে কাজাখস্তানকে ২-১ এবং ফাইনালে সেই একই প্রতিপক্ষকে ২-০ গোলে হারিয়ে ট্রফি উঁচিয়ে ধরা- এটি কোনো দৈব ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, শৃঙ্খলা, আত্মবিশ্বাস ও দেশের পতাকাকে বুকে ধারণ করার অনন্য প্রতিদান।

রিয়া, নিনি সেন রিমনরা আজ শুধু কয়েকটি নাম নন। তারা বাংলাদেশের হাজারো কিশোরীর স্বপ্নের নতুন ঠিকানা। তারা প্রমাণ করেছে, সুযোগ পেলে, যতœ পেলে এবং বিশ্বাস পেলে মেয়েরাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। প্রতিটি গোলের সাথে তারা ভেঙেছে অবহেলার দেয়াল, প্রতিটি জয়ের সঙ্গে তারা ছুঁড়ে দিয়েছে এক কঠিন প্রশ্ন, এতদিন তাদের প্রাপ্য সম্মান কোথায় ছিল?

সবচেয়ে বড় ভুল হবে যদি এই বিজয়কে কয়েকদিনের উচ্ছ্বাসে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। সংবর্ধনার ফুল শুকিয়ে যাবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভিনন্দন থেমে যাবে, কিন্তু এই মেয়েদের স্বপ্ন যেন থেমে না যায়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ, উন্নত প্রশিক্ষণ, আর্থিক প্রণোদনা এবং নারী হকির জন্য একটি সুসংগঠিত কাঠামো। কারণ এই দলটি প্রমাণ করেছে, বিনিয়োগ করলে তারা শুধু এশিয়া নয়, আরো বড় মঞ্চেও বাংলাদেশের পতাকা উড়াতে পারে।

তাই বাহবা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। ইতিহাস গড়া মেয়েদের ইতিহাস হয়ে যেতে দেয়া যাবে না। তাদের হাতে আরো ট্রফি তুলে দেয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কারণ এই মেয়েরা দেখিয়ে দিয়েছে- বাংলাদেশের হকির ভবিষ্যৎ কোনো কল্পনা নয়, সেটি বাস্তব। আর সেই বাস্তবের নাম, বাংলাদেশের অদম্য মেয়েরা।

ওমানের মাস্কাটে অনুষ্ঠিত উইমেন্স জুনিয়র এএইচএফ কাপ হকির মেগা ফাইনালে শক্তিশালী কাজাখস্তানকে ২-০ গোলে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়নের ট্রফি নিয়ে বীরঙ্গনার বেশে দেশে ফিরেছেন লাল-সবুজের মেয়েরা। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর দেশের জন্য হকি অঙ্গনে ইতিহাস গড়া এই স্বর্ণকন্যাদের বরণ করে নিতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন ফেডারেশনের কর্মকর্তারা। পুরো দল এবং কোচিং স্টাফের প্রত্যেক সদস্যের গলায় পরিয়ে দেয়া হয় ফুলের মালা এবং হাতে তুলে দেয়া হয় বর্ণিল তোড়া। বাংলাদেশ হকির নবনিযুক্ত সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক সাদেকের পক্ষ থেকে ২৩ সদস্যের দলের প্রত্যেককে নগদ ২৫ হাজার টাকা ও একটি করে সুইট বক্স দেয়া হয়।

এএইচএফ কাপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে তারা কোয়ালিফাই করেছে এশিয়া কাপের মূল পর্বে। এশিয়া কাপের এই মঞ্চে তাদের লড়তে হবে এশিয়ার সবচেয়ে পরাশক্তি ভারত, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার মতো অভিজ্ঞ দলগুলোর সাথে। এশিয়া কাপের ভালো করলে সরাসরি কোয়ালিফাই করবে বিশ্বকাপে।

দলের অধিনায়ক শারিকা সাফা রিমন বলেন, ‘আমরা আশাই করতে পারিনি যে দেশে ফিরে আমাদের জন্য এত কিছু রেডি থাকবে। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্য নিয়েই দেশ ছেড়েছিলাম। সেটা পূরণ করতে পেরেছি। সামনে এশিয়া কাপ রয়েছে- সেটার জন্য আমরা প্রস্তুতি নিবো।’

২০১৯ সালে বাংলাদেশ নারী হকি দলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর পর, জুনিয়র এএইচএফ কাপের গত আসরে রানার্সআপ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল দলকে। এবার সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে ট্রফি নিজেদের করে নিলো মেয়েরা।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান ও বাহফে প্রেসিডেন্ট এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে ওমানে স্ব-শরীরে উপস্থিত থেকে হকি দলের সাফল্যে উৎসাহ ও অভিনন্দন জানান।