সিলেট ব্যুরো
‘বীমা করলে বোনাস ও মেয়াদ শেষে দেয়া হবে দ্বিগুণ লাভ’- এমন আশ্বাসে সিলেটে নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে বিত্তবানদের জীবন বীমা করিয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার চার থেকে পাঁচ বছর কেটে গেলেও আমানত ফেরত পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। এমন কাণ্ডে হতাশ ওই বীমা কোম্পানির তিন হাজার গ্রাহক। প্রতিদিন ঘুরছেন ফারইস্টের দ্বারে দ্বারে। মিলছে না কোনো উত্তর। এমনকি কেউ আশার বাণীও শোনাতে পারছে না। ফলে হতাশায় ভুগছেন তারা। এ থেকে মুক্তি পেতে বাণিজ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন তারা।
সোমবার দুপুরে সিলেট নগরীর সুবিদবাজারস্থ ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিভাগীয় অফিসে গিয়ে দেখা গেছে ভুক্তভোগীদের জটলা। মাসে মাসে অফিসে এলেও কোনো আশা না পাওয়ায় ভেঙে পড়ছেন অনেকেই। গুরুতর অসুস্থ স্বজনদের চিকিৎসার জন্য অনুনয় বিনয় করলেও মিলছেনা ফল।
সেখানে কথা হয় সিলেট নগরীর আরামবাগের বাসিন্দা লাকী বেগমের সাথে। তিনি জানান, তার স্বামী অসুস্থ ২০২২ সালে মেয়াদ পূর্ণ হলেও তিনি এখন পর্যন্ত তার প্রিমিয়ামের এক লাখ ৪৬ হাজার টাকা পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতিতে স্বামীকে বিনা চিকিৎসায় মরতে বসতে হচ্ছে। সিলেট সদর উপজেলার বাসিন্দা রুখসানা বেগম জানান, ২০২৩ সালে মেয়াদ পূর্ণ হলেও এখন পর্যন্ত তার প্রিমিয়ামের ৭২ হাজার টাকা তিনি তুলতে পারছে না।
ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিলেট বিভাগীয় জোনাল অফিসের শুধু গ্রাহক নয়, একাধিক এজেন্টের সাথেও কথা হয়। তারা অভিযোগ করে বলেন, আমরা উদ্ধুদ্ধ করে সাধারণ মানুষকে বীমা করিয়েছি। মেয়াদ পূর্ণ হলে প্রিমিয়ামের টাকা পাওয়া তাদের অধিকার। কিন্তু কোম্পানি টাকা দিতে পারছে না। আমরা বিপাকে পড়েছি।
সিলেট বিভাগীয় জোনাল অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের পর থেকে বিভাগজুড়ে প্রিমিয়ামের টাকা দেয়া বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে খুব কমসংখ্যক ছোট পরিমাণের পলিসির টাকা দেয়া হয়েছে। বাকি প্রিমিয়ামের টাকা দেয়া পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। সিলেট ডিভিশনাল অফিসে তিন হাজারের বেশি গ্রাহকের প্রিমিয়ামের মেয়াদ ইতোমধ্যে পূর্ণ হয়েছে। এসব প্রিমিয়ামের মধ্যে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ এক কোটি ৮৫ লাখ টাকার পলিসি রয়েছে। এই তিন হাজার গ্রাহকের টাকার পরিমাণ ১০০ কোটি টাকার বেশি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের বিরুদ্ধে সীমাহীন অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের ফলে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে গভীর তারল্য সঙ্কটে পড়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি, তবে আইডিআরএর পরিসংখ্যান কোম্পানিটির আর্থিক দুর্বলতার চিত্র স্পষ্ট করছে।
এ দিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ফারইস্ট ইসলামী লাইফের দায়িত্ব নেন বিএনপি নেতা ফখরুল ইসলাম। পরে তিনি নোয়াখালী-৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কোম্পানির ২৫তম বোর্ড সভায় তাকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। তবে দায়িত্ব নেয়ার প্রায় ১৮ মাস পার হলেও কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতের অনিয়ম, দুর্বল তদারকি ও আর্থিক অব্যবস্থাপনার প্রভাব এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আবদুর রহিম ভূঁইয়া বলেন, ব্যবসা কমে যাওয়ার কারণে ম্যাচিউরিটি বা পরিপক্ব দাবির চাপ বেড়েছে। লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মূল থিম হলো ব্যবসা। ব্যবসা কমে গেলে ব্যয় বেড়ে যায়। কোম্পানির খরচ কমানোর জন্য নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
সিলেট ডিভিশনাল কার্যালয়ের কর্মকর্তা আবদুল কুদ্দুছ জানান, আওয়ামী সরকারের আমলে সাবেক চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের টাকা লুটপাট হয়। ফলে কোম্পানিটির মূলধনই খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমরা কেন্দ্রীয় অফিসকে বিষয়টি জানিয়েছি। প্রতিদিন গড়ে ৭০-৮০ জন গ্রাহক মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় প্রিমিয়ামের টাকার জন্য অফিসে আসেন। আমাদেরকে বকাঝকা করেন। কোনো উত্তর দিতে পারি না। শুনেছি কেন্দ্রীয়ভাবে ফারইস্টের নিজস্ব সব সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে গ্রাহকের টাকা পরিশোধের একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সদর উপজেলার মাসুক বাজার এলাকায় রাহেলা বেগম জানান, তার স্বামী কৃষি কাজ করে অনেক কষ্টে সংসার পরিচালনা করেন। তাদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। তার মেয়ের বিয়ের জন্য তিনি ১০ বছর মেয়াদে একটি বীমা করেন। কিন্তু মেয়ের বিয়ের সময় মেয়াদোত্তীর্ণ বীমার টাকা আনতে গিয়ে টাকা পাননি।
একই উপজেলার শিবেরবাজার এলাকার আব্দুর রশিদ জানান, দু’টি বীমা করেছেন, মেয়াদ শেষে হলেও এখন টাকা ফেরত পাননি তিনি। তার মাধ্যমে দুই আত্মীয়কে বীমা করিয়েছিলেন। সেটিরও মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে কিন্তু সেই টাকা না পাওয়ায় তাদের সাথে আমরা প্রতিনিয়ত ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে।
এ ব্যাপারে কথা বলতে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিলেট ডিভিশনার ইনচার্জ এখলাছুর রহমানের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কলে দিলেও কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।



