যুদ্ধবিরোধী অবস্থান বজায় রাখার দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল জাপান

Printed Edition
জাপানের রাজধানী টোকিওতে যুদ্ধবিরোধী ব্যানার হাতে একজন বিক্ষোভকারী  : ইন্টারনেট
জাপানের রাজধানী টোকিওতে যুদ্ধবিরোধী ব্যানার হাতে একজন বিক্ষোভকারী : ইন্টারনেট

বিবিসি

জাপান এখন কয়েক দশকের মধ্যে তার সবচেয়ে বড় যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভগুলো দেখছে। গত বছরের অক্টোবরে ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি অস্ত্র রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে, বিদেশে জাপানের সামরিক বাহিনীর ভূমিকা বিস্তৃত করে দেশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিপূর্ণ অবস্থান থেকে সরানোর চেষ্টায় মত্ত। তার সরকার বলছে, ‘আগ্রাসী’ চীন, অস্থির থউত্তর কোরিয়া, কাছেই থাকা যুদ্ধংদেহী রাশিয়ার কারণে জাপানের আশপাশের অঞ্চলে ক্রমেই যেভাবে উত্তেজনা বাড়ছে, তাতে এসব পদক্ষেপ খুবই জরুরি। টোকিওর মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও নিরাপত্তায় জাপানকে আরো সক্রিয় ভূমিকা নিতে উৎসাহিত করছে।

কিন্তু এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশটির অনেক বাসিন্দার কাছেই এসব পরিবর্তন আতঙ্ক নিয়ে হাজির হয়েছে। জাপান যুদ্ধ-সক্ষম দেশে পরিণত হচ্ছে- এই ভয় বাড়তে থাকায় দেশটিতে বিক্ষোভও ক্রমেই জোরাল হচ্ছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান তার সংবিধানে যে ধারা ৯-কে গ্রহণ করে নিয়েছিল, তাতে যুদ্ধকে দেশের সার্বভৌম অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি, যুদ্ধের জন্য সশস্ত্র বাহিনী গঠনেও ছিল নিষেধাজ্ঞা। পরে ওই ধারার ব্যাখ্যা খানিকটা বদলে দেশটি আত্মরক্ষা বাহিনী বানানোর সুযোগ পায়।

তাকাইচি-ই প্রথম নন, জাপানের অনেক রক্ষণশীল নেতাই সংবিধানের এ ধারা বদলের পক্ষে ছিলেন। এ তালিকায় শিনজো অ্যাবে-ও আছেন। ২০১৫ সালে অ্যাবের আমলেই জাপানের পার্লামেন্ট ডায়েটে পাস হওয়া নিরাপত্তা বিলে হামলার মুখে মিত্রদের সহায়তাসহ সীমিত আকারে আত্মরক্ষামূলক কর্মকাণ্ডের সুযোগ রাখা হয়েছে।

দীর্ঘ দিন ধরে মারণাস্ত্র রফতানিতে যে নিষেধাজ্ঞা ছিল তা তুলে দিয়ে চলতি বছরের ২১ এপ্রিল দেশটির সরকার সংবিধানের ওই ধারা-৯ বিরোধী সবচেয়ে বড় পদক্ষেপটি নেয়। তাদের যুক্তি হচ্ছে, এখনকার ভয়াবহ নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে মিত্রদের অবশ্যই একে অপরের পাশে দাঁড়ানো দরকার। এ সিদ্ধান্তই অনেকের টনক নড়িয়ে দেয়। বৃষ্টি থেমে রোদ উঁকি দেয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বাইরে হওয়া বিক্ষোভে ভিড় আরো বেড়ে যায়। কেবল বয়স্করাই নন, যোগ দেন ২০-৩০ এর ঘরের অনেক তরুণও।

তেমনই একজন আকারি মায়েজোনোর হাতে ছিল উজ্জ্বল রঙে আঁকা কাগজের লণ্ঠন। ‘আমি ক্ষিপ্ত কারণ এসব পরিবর্তন জনগণের মতামত নেয়া ছাড়া করা হচ্ছে,’ বলেছেন তিনি। টকটকে লাল রঙের ব্যানার নিয়ে দাঁড়ানো বয়স্ক আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘যে কোনো মূল্যে জাপানের সংবিধানের ধারা ৯-কে রক্ষা করতে হবে। এই ধারাই জাপানকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের মতো আগের যুদ্ধগুলোতে অংশ নেয়া থেকে বিরত রেখেছে। নাহলে এতক্ষণে আমরা যুদ্ধে ঢুকে যেতাম।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্রের হামলায় বেঁচে যাওয়া জাপানিরা দেশটিতে হিবাকুশা নামে পরিচিত। তাদেরই একজন জিরো হামাসুমি সম্প্রতি জাতিসঙ্ঘে বলেছেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে কারণ আমরা যুদ্ধে গিয়েছিলাম। আর যুদ্ধ নয়, আর হিবাকুশা নয়।’ বিক্ষোভকারীদের অনেকেই বলছেন, ধারা ৯ কেবল একটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি সেই নৈতিক অঙ্গীকার যা গড়ে উঠেছে আগের সর্বনাশা সব যুদ্ধের ভেতর দিয়ে।

বিক্ষোভকারীদের অনেকেই বলছেন, ধারা ৯ কেবল একটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি সেই নৈতিক অঙ্গীকার যা গড়ে উঠেছে আগের সর্বনাশা সব যুদ্ধের ভেতর দিয়ে। তবে বিক্ষোভে কেবল একপক্ষের মতামতই মিলছে।

জাপান এখন এই ধারা-৯ নিয়ে গভীরভাবে বিভক্ত। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতেও এ চিত্র ফুটে উঠছে। কেউ চাইছেন শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, অন্যরা এর কঠোর বিরোধিতা করছেন।

যারা সংবিধানের ধারাটি বদলের পক্ষে, তাদের যুক্তি হলো- জাপানের নিরাপত্তা পরিস্থিতির মৌলিক বদল ঘটে গেছে। বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর যে ধারা ৯ এসেছে, তা খুবই আপত্তিকর। জাপানকে অবশ্যই আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে হবে, মিত্রদের সহযোগিতা করতে হবে এবং যেকোনো সঙ্কটের আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

তাদের মতে, সামরিক বাহিনীকে আরো বৈধতা দেয়ার মানে শান্তিপূর্ণ অবস্থান ছুড়ে ফেলা নয়, এটি অস্থিতিশীল বিশ্বে টিকে থাকার চেষ্টা। যারা বিপক্ষে তাদের ভাষ্য হলো- যেসব বড়সড় পরিবর্তন হচ্ছে তা শান্তিপূর্ণ অবস্থানে থাকার ধারাটিকে ফাঁপা, অন্তসারশূন্য করে ফেলবে। সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালীকরণ ও বিধিনিষেধ শিথিল জাপানকে দেশের বাইরের সঙ্ঘাতে জড়াতে ধাবিত করবে।

তাদের অনেকেই বলছেন, ধারা ৯ কেবল একটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি সেই নৈতিক অঙ্গীকার যা গড়ে উঠেছে আগের সর্বনাশা সব যুদ্ধের ভেতর দিয়ে। টোকিওতে ওই বিক্ষোভ চলার সময় কাছেই একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানের ক্যাশিয়ারের মুখ থেকে এলো উল্টো কথা। ‘তারা সবসময় এখানে আসে। এখন সময় হয়েছে নতুন জাপানের,’ বলেছেন বিরক্তি নিয়ে বিক্ষোভ দেখা এ ব্যক্তি।

এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে জাপান, যেখানে যেকোনো পরিবর্তনই আসে ধীরগতিতে। সেই দেশকে এখন হয় অতীতের অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা শান্তিপূর্ণ পরিচয় ধরে রাখতে হবে, নতুবা মেনে নিতে হবে অস্থিতিশীল ভবিষ্যৎকে। কী সিদ্ধান্ত নেবে তার চেয়েও বড় যে প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে, তা হলো- কত দ্রুত তারা সিদ্ধান্তটি নেবে।