ইয়াহইয়া নাদিম
আল্লাহ তায়ালা কাফের মুশরিক এবং জালিমদের কেন এত ছাড় দিচ্ছেন? মুসলিমদের উপর এত জুলুম অত্যাচার চালানো সত্ত্বেও তাদেরকে ধ্বংস করে দিচ্ছেন না কেন? এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই ঘুরপাক খায়। এর জবাব পবিত্র কুরআন এবং হাদিস শরিফে স্পষ্টভাবে বিদ্যমান।
জুলুম অত্যাচার একটি মারাত্মক অপরাধ। এর পরিণাম খুবই ভয়াবহ। জালিমের শাস্তি অনিবার্য। জুলুমের শাস্তি আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতেও দিয়ে থাকেন। পাপিষ্ঠ জালিমের কঠিন বিচার শুধু পরকালেই হবে এমনটি নয়, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া থেকেই শাস্তি দেয়া শুরু করেন। এ মর্মে রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘দুটি পাপের শাস্তি আল্লাহ তায়ালা আখিরাতের পাশাপাশি দুনিয়াতে ও দিয়ে থাকেন : ১. জুলুমের শাস্তি, ২. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার শাস্তি।’ (তিরমিজি-২১২৫)
কিন্তু আল্লাহ তায়ালা জালিম ও পাপাচারীদের দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ছাড় দিয়ে থাকেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না। তবে জালিমদের ছাড় দেয়া, তাদের শাস্তি বিলম্বিত হওয়ার মানে এই নয় যে, আল্লাহ তাদেরকে ছেড়ে দিচ্ছেন বা দেবেন। এমন নয় যে তিনি তাদেরকে শাস্তি দিতে বিলম্ব করে মজলুমের উপর জুলুম করছেন (নাউজুবিল্লাহ)। মনে রাখতে হবে, জালিমদের শাস্তি বিলম্বিত হওয়া এবং তাদেরকে অবকাশ দেয়ার ক্ষেত্রে রহস্য বিদ্যমান।
আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের প্রতি দয়াশীল। বান্দা কোনো অপরাধ করে ফেললে তৎক্ষণাৎ তিনি সাজা দেন না। তাওবা করে ফিরে আসার সুযোগ দেন। তাওবা করার সুযোগ দেয়ার ফলে অসংখ্য পাপী বান্দা সরল সঠিক পথে ফিরে আসার সুযোগ পায়। ফলে পরকালের কঠিন শাস্তি থেকে বেঁচে যায়। সুযোগ পাওয়ার পরও কেউ তাওবা না করলে তিনি দুনিয়াতে কিছুটা সাজা দেন। যাতে করে পাপী বান্দা সতর্ক হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘কঠিন শাস্তির আগে আমি তাদেরকে লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব, যাতে করে তারা (তাওবা করে) ফিরে আসে।’ (সূরা সাজদা-২১)
আল্লাহ কতটা দয়ালু হলে এত পাপ করা সত্ত্বেও বান্দাকে বারবার তাওবা করার সুযোগ দেন। আচ্ছা ধরুন আপনি বড় একটি পাপ করে ফেললেন। এরপর আপনি একসময় নিজের ভুল বুঝতে পেরে তাওবা করলেন। এখন চিন্তা করুন পাপ কাজটা করার সাথে সাথে আল্লাহ যদি আপনাকে ধ্বংস করে দিতেন তাহলে আপনি তাওবার সুযোগ পেতেন? কিংবা আপনাকে যদি শাস্তি দেয়া হতো তাহলে আপনি কি ধৈর্য ধারণ করতে পারতেন? আল্লাহ বান্দাকে কতটা ভালোবাসেন এবং কত দয়াময় তিনি, এই আয়াত নিয়ে চিন্তা করলে বুঝা যায় : ‘আপনার পালনকর্তা ক্ষমাশীল, দয়ালু। যদি তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের কারণে পাকড়াও করতেন, তাহলে তাদের শাস্তি তিনি ত্বরাম্বিত করতেন, কিন্তু তাদের জন্য রয়েছে একটি প্রতিশ্রুত সময়, যা থেকে তারা কোনো আশ্রয়স্থল পাবে না।’ (সূরা কাহাফ-৫৮)
এভাবে কাফের মুশরিকদের ও তিনি সুযোগ দিয়ে থাকেন, যাতে করে তারা ইসলাম গ্রহণ করতে পারে। আর যদি ইসলাম গ্রহণ নাও করে, তথাপি সে হাশরের মাঠে বলতে পারবে না যে, হে আল্লাহ! আপনি আমাকে সঠিক পথে আসার সুযোগ দেননি। যখন দেখেন মানুষ তাওবা করে না। সীমালঙ্ঘন ও জুলুম-অত্যাচারের সীমা অতিক্রম করে ফেলে, তখন দুনিয়াতেই তাকে শাস্তি দিয়ে থাকেন। অথবা পরকালে দেন। কিংবা উভয় জগতেই দেন। তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত কঠিন। অবাধ্য ও জালিমদের সাময়িক ছাড় দেয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘জালিমরা যা করে, সে ব্যাপারে আল্লাহকে কখনোই বেখবর মনে করো না, তিনি তো তাদেরকে সেই দিন পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে রেখেছেন যেদিন চক্ষুসমূহ বিস্ফোরিত হবে।’ (সূরা ইবরাহিম-৪১)
ইমাম শাওকানি রহ: বলেন, এই আয়াতটি মুমিনদের মনে প্রশান্তি জোগায় এবং তাদেরকে নিশ্চিত করে যে, জালিম ও পাপিষ্ঠদের শাস্তি বিলম্বিত হওয়া এ জন্য নয় যে, তিনি তাদের ব্যাপারে বেখবর; বরং প্রত্যেক জালিমের চূড়ান্ত অধঃপতন ও ধ্বংসের নির্দিষ্ট একটা সময় তিনি নির্ধারিত করে রেখেছেন। অবকাশের কারণে তাদের পাপ বেড়ে যায়, ফলে তারা কল্পনাতীত কঠিন শাস্তির উপযুক্ত হয়।
আল্লাহ তায়ালা কাফের মুশরিকদের প্রচুর নিয়ামত ও ধন-সম্পদ দিয়ে থাকেন। এতে তারা মনে করে যে তারা শান্তি, নিরাপত্তা ও সুখে রয়েছে। দুনিয়ার লিপ্সা এবং ক্ষমতার লোভ তাদের মোহগ্রস্ত করে রাখে। অথচ তারা বুঝতেই পারে না যে, আল্লাহ তাদের অবকাশ দিচ্ছেন।
এই মর্মে আল্লাহর বাণী তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল, ‘যখন তারা তা ভুলে গেল, তখন তাদের জন্য আমি যাবতীয় নিয়ামতের দুয়ার খুলে দিলাম; অবশেষে তাদের যা দেয়া হয়েছে তাতে তারা যখন আনন্দে মেতে উঠল, হঠাৎ করে তাদের পাকড়াও করে বসলাম! তখন (সব কল্যাণ থেকে) তারা নিরাশ হয়ে গেল।’ (সূরা আনআম-৪৪) ।
রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ তায়ালা জালিমকে অবকাশ দেন, সুতরাং যখন তিনি তাকে পাকড়াও করেন তখন তার কোনো নিস্তার থাকে না।’ (বুখারি-৪৬৮৬)
যুগে যুগে আল্লাহ তায়ালা অনেক জালিমকে অবকাশ দিয়েছেন। অবশেষে ফিরআউন, কারুন, আদ ও ছামুদ জাতি, আবু জেহেল, আবু লাহাবের মতো এমন অনেক জালিমকেই তিনি শাস্তি দিয়েছেন।
অনেক সময় দেখা যায়, অনেক পাপিষ্ঠ লোক প্রচুর ধন-সম্পদ এবং নাজ-নিয়ামতের মালিক। আনন্দ ও ভোগবিলাসের মধ্যে সে জীবন কাটায়। পক্ষান্তরে অনেক পরহেজগার লোক অভাব অনটন এবং বিভিন্ন বিপদাপদে তাঁর দিন কাটে। এটা দেখে অনেকের মন খারাপ হয়। মনে মনে অভিযোগ করে বলে, ‘অমুক এত পাপী। তারপরও আল্লাহ তাকে কত সুখে রেখেছেন। অথচ আমি কত নামাজ আদায় করি, ইসলামের পথে চলি, এরপরও অভাব ও বালা-মুসিবত আমার পিছু ছাড়ে না।’ আমাদের মনে রাখতে হবে, দুনিয়াতে সুখে থাকলে ধন-সম্পদে সমৃদ্ধশালী হলে সে যে আল্লাহর প্রিয় বান্দা এমনটি নয়। আল্লাহ পাপি ও জালিমকে দুনিয়াবি সুখ শান্তি ও সম্পদ দেন এটা মূলত তাদের জন্য একটা অবকাশ, ছাড়। রাসূল সা: ইরশাদ করেন, যদি দেখো যে, পাপকাজ করা সত্ত্বেও আল্লাহ কোনো বান্দাকে ধন-সম্পদ ও সুখ দান করেছেন, তাহলে এটি অবকাশ।’ (আহমাদ-১৭৩১১)
আল্লামা ইবনুল কাইয়ুম রহ: বলেন, কঠিন শাস্তির মধ্যে থেকে একটি হলো, পাপিষ্ঠ যখন মনে করে যে, সে আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিরাপদ। সুখ শান্তি তো শুধু তারই জন্য। এর ফলে সে জুলুম ও পাপাচারে সীমালঙ্ঘন করে ফলে। এরই মধ্যে হঠাৎ আল্লাহ তাকে ধরে বসেন। (ইলামুল মুকিঈন-১/১৩৪)
মূলত দুনিয়া হলো পরীক্ষার জায়গা। আল্লাহ তাঁর বান্দাকে ভয়ভীতি, অভাব-অনটন, আর্থিক ক্ষতি ইত্যাদির মাধ্যমে পরীক্ষা করে থাকেন। এর মাধ্যমে তিনি দেখেন কে বেশি ধৈর্যশীল, কে নেক আমলে এগিয়ে, কে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়।
আল্লাহ বলেন- ‘তোমাদেরকে ভয় ও ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি (এসবের) কোনো কিছুর দ্বারা নিশ্চয়ই পরীক্ষা করব, ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ প্রদান করো। যারা বিপদকালে বলে থাকে, ‘আমরা আল্লাহরই আর আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী’। এদের জন্য রয়েছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে অনুগ্রহ ও করুণা আর এরাই হিদায়াতপ্রাপ্ত। (সূরা বাকারা-১৫৫-৫৭)।
ইবনে তাইমিয়া রহ: বলেন, দুনিয়া পরীক্ষার ময়দান। অতএব পাপ ও জুলুমের কারণে প্রত্যেক অপরাধীকে যদি সাথে সাথে শাস্তি দেয়া হয়, তাহলে তো (বান্দাকে দেয়া) দায়িত্ব ও পরীক্ষার উদ্দেশ্য অর্জন হয় না। অপরাধী হোক কিংবা মুমিন, নিজ নিজ কর্মের ফলাফল পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিচার করা হবে। আর সুবিচার প্রতিষ্ঠার দিন হলো আখিরাত দিবস। আগুনে পোড়ালে স্বর্ণ থেকে যেভাবে খাদ আলাদা হয়ে যায়, তেমনি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত মুমিন এবং মুনাফিকের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি হয়। ইমান আনার পর আল্লাহ অবশ্যই ঈমানি পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। এ মর্মে কুরআনের ঘোষণা-‘মানুষ কি মনে করে যে, তারা এ কথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে যে, আমরা ঈমান এনেছি এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না?’ (সূরা আনকাবুত-২)
জালিম ও পাপাচারীদের অস্তিত্ব মুমিনদের জন্য পরীক্ষা। এদের উসিলায় মুমিন ঈমানের ওপর অটল অবিচল থাকতে শিখে। জিহাদ করার সুযোগ ও প্রেরণা পায়। ফলে ঈমানদারদের মর্যাদা বৃদ্ধি পেতে থাকে। শাহাদাতের মতো সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করতে পারে।
লেখক : প্রাবন্ধিক



