নয়া দিগন্ত ডেস্ক
হাম পরিস্থিতি ক্রমেই গুরুতর আকার ধারণ করছে। ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে আরো আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ছয় শিশু মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে, আর একটি শিশুর হামে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ নিয়ে গত ৫৪ দিনে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৪। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৮৬টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে, আর ৫৮টি শিশুর হামে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। এই হিসাব গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) সকাল ৮টা থেকে গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ের।
২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে যে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে চার শিশু সিলেট বিভাগের। এ ছাড়া ঢাকায় দু’টি এবং খুলনা ও বরিশাল বিভাগে একটি করে শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
২৪ ঘণ্টায় দেশের আট বিভাগে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা এক হাজার ২১২, হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯৫০টি শিশু। এ সময়ে হাম শনাক্ত হয়েছে ২৮২টি শিশুর। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২০৪ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে, এরপর আছে চট্টগ্রাম (৪৬)।
সিলেট ব্যুরো জানায়, সিলেটে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে হাম। ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে হাসপাতালে ভর্তি আরো চার শিশুর মৃত্যুর হয়েছে। এ নিয়ে হাম উপসর্গে নিয়ে সিলেট বিভাগের মৃত্যু সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪ জনে।
শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা: নুরে আলম শামীম।
তিনি জানান, ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে মারা যায় পাঁচ মাস বয়সী শিশু মাহদী হাসান। সে সিলেট নগরীর সুরমা আখালিয়া এলাকার বাসিন্দা। এ ছাড়া এই সময়ে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যাওয়া ছয় মাস বয়সী মুসতাকিন সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জের বাসিন্দা, একই হাসপাতালে মৃত্যুবরণকারী সাত মাস বয়সী জারা সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাসিন্দা ও আট মাস বয়সী রায়হানা সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বাসিন্দা।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২৪ ঘণ্টায় ল্যাব পরীক্ষায় আরো এক শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছে। গত ১ জানুয়ারি থেকে ৮ মে পর্যন্ত ল্যাব পরীক্ষায় প্রমাণিত হাম রোগীর সংখ্যা ১৪২। এর মধ্যে হবিগঞ্জে ১৩ (রুবেলা আক্রান্ত দুই), মৌলভীবাজারে ১৬, সুনামগঞ্জে ৭১ ও সিলেট জেলার রোগী ৪২ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে আরো ৫৩ জন শিশু সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে ২৯, রাগিব রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তিন, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক, শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক, সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ১৬০, জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক ও মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে আটজন শিশু ভর্তি হয়েছে।
বর্তমানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে ২৪১ জন সন্দেহজনক হাম রোগী। তাদের মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে সর্বোচ্চ ১০৪, ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৯, সিলেট উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চার, আল হারামাইন হাসপাতালে দুই, রাগীব রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সাত, মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে দুই, নর্থ ইস্ট হাসপাতালে দুই, পার্কভিউ হাসপাতালে দুই, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক, বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুুই, আজমিরীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিন, বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চার, দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুই, শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক, সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৫৮, জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিন, জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিন, হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ১৫ ও মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ১৭ জন শিশু ভর্তি রয়েছে।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর মুনীর রাশেদ জানিয়েছেন, হাম উপসর্গে রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় ওসমানী হাসপাতালে ৩২ নম্বর ওয়ার্ডটি হামের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়েছে। বর্তমানে শহীদ ডা: শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালকে হামের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়েছে। এ হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ১০০টি। এ হাসপাতালে বর্তমানে অতিরিক্ত রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। রোগীরা সেখানে গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিচ্ছে। সিলেটে হামের রোগী বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং আরেকটি ডেডিকেটেড হাসপাতাল চালুর জোরালো দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ওসমানী হাসপাতালের নতুন এই (৩২ নম্বর ওয়ার্ড) ইউনিট চালু করা হয়েছে। ওসমানী ও শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
চিকিৎসকের আবেগঘন স্ট্যাটাস
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা: হেদায়েত হোসেন সারোয়ার হাম রোগ নিয়ে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তার লেখাটি হুবহু তুলে ধরে হলো, ‘হাম আক্রান্ত হয়ে সিলেটে এখন পর্যন্ত ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার বেশির ভাগ আমার কর্মস্থল হাম পিআইসিইউ, সিলেট ওসমানী মেডিক্যালে। হামের সাথে নিউমোনিয়া ও নানা জটিলতায় এই শিশুগুলো শ্বাস নিতে না পেরে যখন ছটফট করতে থাকে, সে দৃশ্য দেখে সহ্য করা কঠিন, এদের বাঁচাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করা ডাক্তার, নার্সদেরও অনেক কষ্ট হয়, চোখে জল আসে, তা দেখা যায় না। এই রোগীগুলো কেউই হামের টিকা দেয়নি। বিগত দুই বছর হাম এ টিকা না দেয়ার ফল ভোগ করছে বাংলাদেশ। হামের রোগী ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। একমাত্র টিকা দেয়া ছাড়া এটার বিস্তার রোধে আপাতত আর কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার এই মহামারী মোকাবেলা করার জন্য টিকার ব্যবস্থা করেছে। অথচ অনেকের মধ্যে এখনো এটা নিয়ে অনীহা দেখা যাচ্ছে!
মনে রাখবেন, সরকারের এই প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আপনার অবহেলায় টিকা না দেয়ায় যদি হামে শিশু মারা যায়, এর দায় আপনার। এখনো সময় আছে ১০ তারিখ পর্যন্ত সবখানে, ২০ তারিখ পর্যন্ত সিলেট সিটি করপোরেশনে এ টিকা দেয়া হবে। দেরি না করে কাজটি সেরে ফেলুন। বেশি বুঝে বা না বুঝে নিজ শিশুর খুনি হবেন না। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সব শিশুকে টিকা দিন, শুধু নিজের পরিবারের নয়, আত্মীয়, প্রতিবেশী কেউ না দিয়ে থাকলে তাদেরকে বোঝান। বিগত ২৮ দিনের মধ্যে হামের টিকা না দেয়া হয়ে থাকলে তাদের সবাইকে টিকা দিতে হবে। আগে দুইটা বা একটা টিকা দেয়া থাকলেও টিকা দিতে হবে। সবাই মিলে আসুন আমাদের ফুলগুলোকে অকালে ঝরে যাওয়া থেকে বাঁচাই।’
সিলেট বিভাগে লক্ষ্যমাত্রার ৯৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ টিকাদান সম্পন্ন
এ দিকে হাম-রুবেলা জরুরি টিকাদান কর্মসূচি উপলক্ষে সিলেট বিভাগীয় সমন্বয় সভা বৃহস্পতিবার বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের আয়োজনে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় আয়োজিত সভায় সভাপতিত্ব করেন সিলেট বিভাগের ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা: মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম।
সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, হাম-রুবেলা একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হওয়ায় জনমনে যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। সরকারের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের ফলে এখন সর্বত্র টিকা পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসবে।
তিনি বলেন, সিলেট বিভাগে হাম-রুবেলা জরুরি টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ লাখ ২৩ হাজার ৯৬৬ জন। এর মধ্যে ১২ লাখ ৪৭ হাজার ৮৩৫ জনকে টিকা প্রদান করা হয়েছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৯৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ। জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরুর পর থেকে সংশ্লিষ্ট সবার নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই এ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই সাথে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সভায় জানানো হয়, সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগ গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের অংশ হিসেবে সব উপজেলা ও জেলা সদর হাসপাতালে আনুপাতিক হারে আইসোলেশন শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সমন্বয় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন- সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: মো: জাহিদুল ইসলাম, সিলেটের সিভিল সার্জন ডা: মো: নাসির উদ্দিন, রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাখী রাণী দাস এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক ডা: সুফী মো: খালিদ বিন লুৎফর। এ সময় সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।



