- প্রথম দিনেই ওয়াকআউট করতে পারেন জামায়াত-এনসিপি জোটের সংসদ সদস্যরা
- প্রতি বুধবার প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রশ্নোত্তর পর্ব থাকছে
জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় আগামীকাল বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। তবে শুরু থেকেই অধিবেশন উত্তপ্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। গণভোটে পাস হওয়া জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে সংসদে ওয়াকআউটও করতে পারেন জামায়াত-এনসিপি জোটের সংসদ সদস্যরা। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যেই নতুন সংসদের যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে কাল। সপ্তাহের প্রতি বুধবার আগের মতোই প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রশ্নোত্তর পর্ব থাকছে।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হবে। তবে শুরুর পরপরই দু’দিন সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় সংসদের কার্যক্রম চলবে আগামী ১৫ ও ১৬ মার্চ (রোববার ও সোমবার)। এরপর আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অধিবেশন ১৩ দিনের জন্য মুলতবি রাখা হতে পারে। ঈদের ছুটি শেষে আগামী ২৯ মার্চ পুনরায় সংসদের কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংসদের প্রথম অধিবেশন সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে চলে এবং এতে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। প্রথম অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়। একই সাথে একটি স্পিকার প্যানেলও নির্বাচন করা হয়ে থাকে। ডেপুটি স্পিকার পদে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর কাউকে মনোনয়ন দিতে সরকারি দল বিএনপি প্রস্তাব দিয়েছে। তবে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের অবস্থানের ওপর জামায়াত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর কথা জানিয়েছে।
প্রথম দিনেই নবনির্বাচিত স্পিকার বিরোধী দলীয় নেতা ও উপনেতার অনুমোদন দেন। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা দীর্ঘ আলোচনা করে থাকেন।
তবে এবারের প্রথম অধিবেশনকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বিশেষ করে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হওয়ায় নতুন নির্বাচিত সংসদকে প্রথম ছয় মাস বা ১৮০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও কার্যকর থাকার কথা রয়েছে। গণভোট আয়োজন সংক্রান্ত আদেশে এমন নির্দেশনা উল্লেখ করা হয়েছে।
সে অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের একই দিনে দু’টি শপথ নেয়ার কথা ছিল- একটি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। কিন্তু সরকারি দল বিএনপি জোটের সংসদ সদস্যরা এখনো সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। অন্য দিকে জামায়াত জোটের সংসদ সদস্যরা দু’টি শপথই গ্রহণ করেছেন। ফলে সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর আগেই সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো সঙ্কটের কথা অস্বীকার করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির অন্যতম নীতিনির্ধারক সালাহউদ্দিন আহমেদ একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, বৃহৎ বিরোধী দল বলছে জনরায় অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে এমপিদের শপথ নিতে হবে বলছেন। তাদের এ বক্তব্য গায়ের জোরে। আমরা সংবিধান মেনেই এ পর্যন্ত এসেছি। সংবিধান মেনে চলছি, সামনে মেনে চলব। কিন্তু আমাদের বক্তব্য ছিল যদি আমরা গণভোটের রায়কে সম্মান দিতে চাই, জাতীয় সংসদে আগে যেতে হবে। সেখানে আলাপ আলোচনা করে আইন প্রণয়ন করতে হবে। সংবিধানে সেটা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তারপরে যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে হয়, সেখানেই নির্ধারণ হবে। এবং কোন ফরমে শপথ হবে সেটা তৃতীয় তফসিল আনতে হবে। কে শপথ বাক্য পাঠ করাবে, সেটা নির্ধারিত হবে। তারপর এটা বিধিসম্মত হবে।
তিনি এ-ও বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের প্রতি আমরা শতভাগ অঙ্গীকারাবদ্ধ। এটা রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল। আমরা এতে স্বাক্ষর করেছি। বরং যারা সমালোচনা করছে তারা স্বাক্ষর করেছে গত কয়েক দিন আগে। জাতীয় সনদের প্রত্যেকটি প্রস্তাব, যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, নোট অব ডিসেন্টসহ আপনারা সেটা হাতে নিয়ে দেখবেন- বলা আছে যেসমস্ত রাজনৈতিক দল নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক জনগণের ম্যান্ডেট পায় তাহলে তারা সেভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবেন।
এ দিকে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৪৭ বিধি অনুযায়ী প্রথম অধিবেশন চলাকালে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রশ্নোত্তরের দিনও অস্থায়ীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, আগামী ১৫ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত এই সূচি কার্যকর থাকবে এবং সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটি বাদে অধিবেশন চলবে। আগের মতোই সংসদে প্রতি সপ্তাহের বুধবার প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। এ দিন প্রথম ৩০ মিনিট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য নির্ধারিত থাকবে, যেখানে সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারবেন।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য প্রশ্নোত্তর পর্বে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার বিভাগ, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয় সম্পর্কিত বিষয়ে প্রশ্ন করা যাবে। এসব প্রশ্ন জমা দেয়ার জন্য আগামী ১৬ মার্চ পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদ সদস্যরা নির্দিষ্ট ফরমে প্রশ্ন জমা দিতে পারবেন।
পরবর্তী সপ্তাহে ৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য প্রশ্নোত্তর পর্বে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠিত হবে।
অন্য দিকে ১৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর দেবেন।
জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন কত দিন চলবে তা নির্ধারণ করবেন নবনির্বাচিত স্পিকার। সাধারণত প্রথম অধিবেশনেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এ দিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। অন্য দিকে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। ফলে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন কিভাবে হবে তা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সূত্র বলছে, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আজ বুধবার প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারি দলের সংসদীয় কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংসদের জ্যেষ্ঠ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরুর সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় রয়েছে।
জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্রপতির ভাষণ। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিয়ে থাকেন। তবে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো: শাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ায় তার ভাষণ নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং জুলাই আন্দোলন ঘিরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ইতোমধ্যে সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিরোধিতা করে বক্তব্য রাখছেন। জুলাইপন্থী বিভিন্ন সংগঠনের চাপে শেষ পর্যন্ত জামায়াত-এনসিপি জোটের সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করতে পারেন বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট শিশির মনির সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, আখতার হোসেনদের (এনসিপি সদস্য সচিব) রাষ্ট্রপতির ভাষণ শোনা উচিত নয়। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি যখন ভাষণ দেবেন তখন তাদের বের হয়ে যাওয়া উচিত। ভাষণ শেষ হওয়ার পর আবার সংসদে ফিরে আসা যেতে পারে। তার মতে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির ভাষণ শোনার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এসব অধ্যাদেশের বেশির ভাগই প্রথম অধিবেশনে সংসদের সামনে উপস্থাপন করা হতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শেষ দিনে শেষ মুহূর্তে অধ্যাদেশ জারির প্রস্তাব দিয়েছিল। এই সরকার ছিল একটা অধ্যাদেশ জারির সরকার। সংবিধানে বাধ্যবাধকতা আছে যেদিন জাতীয় সংসদ বসবে, প্রথম অধিবেশনে ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করতে বাধ্য। কিন্তু এই ১৩৩টি অধ্যাদেশের কোনটা কিভাবে গৃহীত হবে- কোনটা ল্যাপস্ হয়ে যাবে- সেটা জাতীয় সংসদের এখতিয়ার।
তিনি আরো বলেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশের বাইরে আরেকটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। সেটা হলো- জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ।-এটা ম্যাসকুলিন, ফেমিলিন নাকি কমন জেন্ডার, আমি জানি না।



