কোরবানির ঈদের প্রস্তুতি দেশজুড়ে

খালিদ সাইফুল্লাহ
Printed Edition

আগামী ১০ জিলহজ ২৮ মে বৃহস্পতিবার পবিত্র ঈদুল আজহা। মুসলিম উম্মাহর অন্যতম ধর্মীয় উৎসবের দিন, যা মুসলিম বিশ্বে ইয়াওমুন নাহর নামে সমাদৃত। তবে আমাদের দেশে এটি কোরবানির ঈদ নামেই বেশি পরিচিত। ঈদ শব্দটি যেমন মিশে আছে এক অনাবিল আনন্দের উপলক্ষ হিসেবে। তেমনি মুসলমানদের জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম আ:-এর ত্যাগের স্মৃতিবিজড়িত দিনও এটি। এজন্য ঈদুল আজহার উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ত্যাগ ও উৎসর্গ করা। যার মধ্যে নিহিত রয়েছে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণমুখী কাজ ও ত্যাগের উজ্জ্বল উপমা। এ দিনটিতে মুসলিম উম্মাহ ফজরের নামাজের পর ঈদগাহে গিয়ে দুই রাকাত ঈদুল আজহার ওয়াজিব নামাজ আদায় করবেন। এরপর আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ, দুম্বা ও উট আল্লাহর নামে কোরবানি করবেন। মূলত মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দ্বিধাহীনভাবে তার কাছে আত্মসমর্পণ এবং তার নির্দেশ শর্তহীনভাবে মেনে নেয়াই হলো ঈদুল আজহার প্রকৃত শিক্ষা। আল্লাহর রাহে পশু কোরবানি করে সেই ত্যাগের কথাকেই স্মরণ করা হয়।

ঈদুল আজহা হজরত ইবরাহিম আ: ও তাঁর ছেলে হজরত ইসমাইল আ:-এর সাথে সম্পর্কিত। হজরত ইবরাহিম আ: স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে ছেলে ইসমাইলকে আল্লাহর উদ্দেশে কোরবানি করতে গিয়েছিলেন। আসলে আল্লাহর পক্ষ থেকে এ আদেশ ছিল হজরত ইবরাহিম আ:-এর জন্য পরীক্ষা। তিনি ছেলেকে আল্লাহর নির্দেশে জবাই করার সব প্রস্তুতি নিয়ে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইসমাইলের আ:-এর পরিবর্তে কোরবানি হয় দুম্বা। সেই ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণে হজরত ইবরাহিম আ:-এর সুন্নত হিসেবে পশু জবাইয়ের মধ্য দিয়ে কোরবানির বিধান এসেছে ইসলামী শরিয়তে। সামর্থ্যবানদের জন্য পশু কোরবানি করা ওয়াজিব। আল্লাহর উদ্দেশে কোরবানি করার পর আনন্দ থেকেই জিলহজ মাসের ১০ তারিখ উদযাপিত হয় ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। এ ছাড়া ১১ ও ১২ তারিখও পশু কোরবানি করা যায়। ইসলামে কোরবানি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। পবিত্র কুরআনের সূরা কাউসারে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে- ‘অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশে নামাজ পড়–ন এবং কোরবানি করুন।’ সূরা হজে বলা হয়েছে ‘কোরবানি করা পশু মানুষের জন্য কল্যাণের নির্দেশনা।’ কোরবানির মূল উদ্দেশ্যই তাকওয়া বা খোদাভীতি। এ প্রসঙ্গে কুরআনে বলা হয়েছে- ‘এগুলোর গোশত আমার কাছে পৌঁছায় না। কিন্তু তোমাদের তাকওয়া পৌঁছে যায়।’ রাসূল সা: বলেছেন, ‘ঈদুল আজহার দিন কোরবানির চেয়ে আর কোনো কাজ আল্লাহর কাছে অধিক পছন্দনীয় নয়।’ অন্যত্র বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকার পরও কোরবানি দিলো না সে যেন আমার ঈদগাহে না যায়।’

বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, পৃথিবীতে মানবজাতির সূচনা থেকেই কোরবানির প্রচলন ছিল। হজরত আদম আ:-এর দুই ছেলে হাবিল ও কাবিল সর্বপ্রথম কোরবানি দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে কুরআনে এসেছে- ‘আপনি তাদের আদমের দুই ছেলের বাস্তব অবস্থা পাঠ করে শোনান। যখন তারা উভয়ে কিছু কোরবানি করেছিল। তখন তাদের একজনের কোরবানি গৃহীত হয়েছিল এবং অপর জনেরটি গৃহীত হয়নি।’ (সূরা মায়েদা-২৭)

আল্লাহর সন্তুষ্টিই কোরবানির মূল উদ্দেশ্য। তাঁর পথে প্রয়োজনে জীবন ও সবচেয়ে প্রিয় বস্তু উৎসর্গের জন্য তৈরি হওয়ার শিক্ষাই এতে নিহিত। এ জন্যই কোরবানির পশু জবাইয়ের সময় বলা হয়- ‘ইন্নাস সলাতি ওয়ান্নুসুকি ওয়া মাহ্ইয়াইয়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রব্বিল আলামিন।’ অর্থাৎ- নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার কোরবানি আমার জীবন, আমার মৃত্যু সবই আল্লাহর জন্য, যিনি নিখিল বিশ্বের প্রতিপালক।’ গরু, মহিষ, উট, ভেড়া, ছাগল, দুম্বা থেকে যেকোনো একটি প্রাণী দিয়ে কোরবানি করা যায়।

ঈদুল আজহার সাথে পবিত্র হজের সম্পর্ক রয়েছে। আজ মঙ্গলবার পবিত্র মক্কা নগরীর অদূরে আরাফাতের ময়দানে হাজীদের সমবেত হওয়ার মধ্য দিয়ে পবিত্র হজ পালিত হচ্ছে। প্রায় ১৭ লাখ মুসলমানের অংশগ্রহণে লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত আরাফাত ময়দান। আগামীকাল বুধবার সৌদি আরবে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে। সকালে মুজদালিফা থেকে ফিরে হাজীরা মিনায় অবস্থান করে পশু কোরবানিসহ হজের অন্যান্য কার্যক্রম পালন করবেন। দেশে হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় ঈদুল আজহার প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে এবারো ঈদের পাঁচটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে।

মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশে প্রতি বছর ঈদুল আজহা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আনন্দ ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়। রাজধানীসহ সারা দেশের পশুর হাটগুলোতে গত কয়েক দিন ধরে চলছে কেনাবেচা। স্বজনদের নিয়ে ঈদ উদযাপনের জন্য ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন। কোরবানিকৃত পশুর রক্ত বা বর্জ্যপদার্থের কারণে যাতে পরিবেশ দুর্গন্ধময় না হয় সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ দেশের সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। মুসলমানদের ধর্মীয় এ উৎসব উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।