সাক্ষাৎকার : ড. শরিফুল আলম

সংসদ হতে হবে দায়বদ্ধতাকে কেন্দ্র করে, প্রতিফলিত হবে ডেডলাইনে

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংস্কারের অনেক প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও বাস্তবে জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষ করে গণভোট, ‘জুলাই সনদ’ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অর্ডিন্যান্স বাতিলের পর আইনি শূন্যতা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন সম্প্রতি শেষ হয়েছে। ২৫ কার্যদিবসে রেকর্ডসংখ্যক বিল পাস ও কর্মকাণ্ডের খতিয়ান তুলে ধরা হলেও এর গুণগত মান ও জন-আকাক্সক্ষা পূরণ নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি প্রেসিডেন্ট, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও সাবেক সচিব ড. শরিফুল আলম।

তিনি মনে করেন, ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংস্কারের অনেক প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও বাস্তবে জন-আকাক্সক্ষা পূরণে ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষ করে গণভোট, ‘জুলাই সনদ’ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অর্ডিন্যান্স বাতিলের পর আইনি শূন্যতা তৈরি হয়েছে।

ড. শরিফুল আলম বলেন, প্রথম অধিবেশন ছিল একটি ‘ট্রেলার’। প্রশ্ন হলো- দর্শক হিসেবে জনগণ আর কতদিন অপেক্ষা করবে? ত্রয়োদশ সংসদ যদি সত্যিই ভিন্ন হতে চায়, তবে ‘দ্রুততা’ নয়, ‘দায়বদ্ধতা’কে কেন্দ্র করতে হবে। এই দায়বদ্ধতা স্লোগানে নয়, বাস্তব ডেডলাইনে প্রতিফলিত হতে হবে। অন্যথায় ইতিহাস এই সংসদকেও গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠান নয়; বরং কেবল একটি ‘আইন পাস করার যন্ত্র’ হিসেবেই মনে রাখবে।

গত শুক্রবার নেয়া ড. শরিফুল আলমের সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত নিচে দেয় হলো-

প্রশ্ন : ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হলো। ২৫ কার্যদিবসে ৯৪টি বিল পাস এবং ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপিত হয়েছে। এই বিশাল পরিসংখ্যানকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

ড. শরিফুল আলম : দেখুন, পরিসংখ্যানের এই উজ্জ্বলতা আসলে সংসদের ভেতরের অন্ধকারকে ঢাকতে পারছে না। সংসদীয় গণতন্ত্রের শক্তি কেবল সংখ্যায় নয়; বরং আইন প্রণয়নের স্বচ্ছতা এবং বিতর্কের গভীরতায় নিহিত। ২৫ দিনে ৯৪টি বিল পাস হওয়া কোনো ‘দক্ষতা’ নয়; বরং আইনসভাকে ‘রাবার-স্ট্যাম্প’ হিসেবে ব্যবহার করার পুরনো প্রবণতা। আইন প্রণয়ন কোনো কারখানার প্রোডাকশন লাইন নয় যে, গতিই সব। দ্রুত আইন পাস করার ফলে ভুল ও অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ে, যার মাশুল দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।

প্রশ্ন : আপনি এই অধিবেশনকে ‘ব্যর্থ’ বলছেন কেন? বিশেষ করে চব্বিশের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে?

ড. শরিফুল আলম : এই সংসদ বিপ্লব-পরবর্তী জন-আকাক্সক্ষা পূরণে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। গত ১৭ বছরের বর্বরতা ও নির্যাতনের বিচারের দাবি এই সংসদ থেকে জোরালোভাবে আসেনি; বরং জনগণের দাবিকে এক অর্থে কবর দেয়া হয়েছে। গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার রক্ষা এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো পাস করা হয়নি। এমনকি সংসদ নেতা নিজের ওপর হওয়া নির্যাতনের বিচারও চাইতে পারেননি। ব্যাংক লুটপাট বা অর্থপাচারের শ্বেতপত্র নিয়ে কোনো অর্থবহ আলোচনা হয়নি। সংবিধান সংস্কার বা গণভোটের মতো বিষয়গুলোকেও অগ্রাহ্য করা হয়েছে। এটি কেবল সংসদের নয়, সরকারেরও বড় ব্যর্থতা।

প্রশ্ন : অধ্যাদেশের পাহাড় (১৩৩টি) যেভাবে সংসদে আনা হয়েছে, সেটিকে কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

ড. শরিফুল আলম : এটি একটি অস্বস্তিকর সত্য প্রকাশ করে যে, নির্বাহী বিভাগ যখন খুশি অধ্যাদেশ দেয় এবং সংসদ পরে তা কেবল ‘বৈধ’ করে। সংসদ নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র হতে পারেনি। বকেয়া অধ্যাদেশগুলো বিল হিসেবে পাস করতে গিয়ে সংসদ জনজীবনের বর্তমান সঙ্কট- যেমন দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান বা ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম নিয়ে সময় দিতে পারেনি। সংসদ ভবনের আলো জ্বলছে ঠিকই; কিন্তু জনজীবনে তার সুফল পৌঁছাচ্ছে না।

প্রশ্ন : সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

ড. শরিফুল আলম : কাঠামো গড়া হয়েছে; কিন্তু সেগুলোকে কি স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে? কমিটির রিপোর্ট যদি জনসমক্ষে না আসে, সুপারিশ বাস্তবায়নের ট্র্যাকিং যদি না থাকে, তবে কমিটিগুলো পর্দার আড়ালের সমঝোতার জায়গা হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে বড় বড় নীতিগত ভুল জন্মায় তখন, যখন কমিটি পর্যায়কে ‘ফাস্ট-ফরোয়ার্ড’ বা এড়িয়ে যাওয়া হয়।

প্রশ্ন : সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা কি আপনার কাছে সন্তোষজনক মনে হয়েছে?

ড. শরিফুল আলম : বিরোধী দলের দু-একজনের ভূমিকা আশাব্যঞ্জক হলেও সামগ্রিকভাবে তারা জোরালো ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা ছিল তারা সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপকে গঠনমূলকভাবে চ্যালেঞ্জ করবে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করবে; কিন্তু সেই ধারালো বিরোধী সত্তা আমরা এখনো দেখতে পাইনি।

প্রশ্ন : আপনি বলছেন প্রথম অধিবেশনে জন-আকাক্সক্ষা বুঝতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। কেন এমন মনে হচ্ছে?

ড. শরিফুল আলম : দেখুন, চব্বিশের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের মানুষ চেয়েছিল একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের নিশ্চয়তা; কিন্তু অধিবেশনে যা দেখা গেল তা হলো- বক্তৃতা আছে; কিন্তু ডেলিভারির নকশা নেই। গণভোটের কথা বলা হচ্ছে; কিন্তু তার আইনি কাঠামো বা সময়সীমা অনুপস্থিত। ‘জুলাই সনদ-২০২৫’ নিয়ে আলোচনা আছে; কিন্তু মাঠপর্যায়ে এটি কিভাবে বাস্তবায়ন হবে তার কোনো প্রশাসনিক রূপরেখা দেয়া হয়নি। এটি জনগণের আস্থার ওপর বড় একটি ধাক্কা।

প্রশ্ন : অধিবেশনের একটি বড় ঘটনা হলো দুর্নীতি দমন, মানবাধিকার ও বিচার বিভাগ সংক্রান্ত বেশ কিছু অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশ বাতিল করা। এটাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

ড. শরিফুল আলম : এটিই এই অধিবেশনের সবচেয়ে নেতিবাচক দিক। কোনো অর্ডিন্যান্স বাতিল করা দোষের নয়- যদি তার বিপরীতে আরো শক্তিশালী ও উন্নত কোনো আইন আনা হয়; কিন্তু এখানে ‘বাতিল’ দৃশ্যমান হলেও ‘বিকল্প আইন’ অদৃশ্য। গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো বাতিলের মাধ্যমে একটি আইনি শূন্যতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করা হয়েছে। এতে করে জনগণের মনে সন্দেহ জাগছে- সরকার কি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার বদলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চাইছে?

প্রশ্ন : বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথক সচিবালয় নিয়ে যে দাবি দীর্ঘ দিনের, সেখানে সংসদের ভূমিকা কী ছিল?

ড. শরিফুল আলম : এখানে সংসদ পুরোপুরি নীরব থেকেছে। ‘ইনডিপেনডেন্ট জুডিশিয়ারি অর্ডিন্যান্স’ অকার্যকর হওয়া এবং বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের উদ্যোগ থমকে যাওয়া বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে বড় একটি আঘাত। মানুষ চেয়েছিল বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসুক; কিন্তু প্রথম অধিবেশনে ‘নিয়োগ সংস্কার’ বা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার কোনো দৃশ্যমান রোডম্যাপ আমরা দেখিনি।

প্রশ্ন : ‘গণভোট’ বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচনা আছে। আপনার মতে এই প্রক্রিয়ায় ঘাটতি কোথায়?

ড. শরিফুল আলম : গণভোট কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি একটি জটিল আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। কোন আইনের অধীনে ভোট হবে? প্রশ্ন কে নির্ধারণ করবে? প্রচারণার সমান সুযোগ কিভাবে নিশ্চিত হবে? প্রথম অধিবেশনে সরকার যদি অন্তত একটি খসড়া কাঠামো বা বিশেষজ্ঞ কমিটি ঘোষণা করত, তবে জনমনে আস্থা তৈরি হতো। তা না হওয়া সরকারের একটি বড় নীতিগত ব্যর্থতা।

প্রশ্ন : ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

ড. শরিফুল আলম : এই আদেশটি বর্তমানে কেবল নথিতে সীমাবদ্ধ। কোনো বাস্তবায়ন আদেশ কার্যকর হতে হলে তিনটি জিনিস লাগে- নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন, সময়সীমা এবং তদারকি। অধিবেশনে এগুলোর কোনোটিই পরিষ্কার করা হয়নি। বাজেট বরাদ্দ বা প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা না হওয়ায় মনে হচ্ছে এটি একটি কাগুজে প্রতিশ্রুতি হয়েই থেকে যাবে।

প্রশ্ন : সাধারণ মানুষের ‘হাঁড়ির খবর’ অর্থাৎ দ্রব্যমূল্য ও জীবিকা নিয়ে সংসদের সক্রিয়তা কেমন ছিল?

ড. শরিফুল আলম : এখানেই সংসদ সাধারণ মানুষের থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে সরে গেছে। বাজার সিন্ডিকেট দমন, আমদানির সাপ্লাই চেইন ঠিক করা বা কৃষক-ভোক্তা সুরক্ষায় কোনো শক্তিশালী নীতিগত বার্তা সংসদ দিতে পারেনি। সংসদ যখন মানুষের প্রতিদিনের অন্ন-বস্ত্রের সঙ্কট নিয়ে কার্যকর কিছু করতে পারে না, তখন সেই অধিবেশন সাধারণ মানুষের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।

প্রশ্ন : সংসদকে কার্যকর করতে আপনার প্রধান পরামর্শ বা ‘ডেডলাইন’গুলো কী কী?

ড. শরিফুল আলম : সংসদকে ‘বৈধতার কারখানা’ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমার পরামর্শগুলো হলো : ১. আগামী অধিবেশন থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বিলে গণশুনানি ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। ২. কণ্ঠভোটের বদলে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ‘রেকর্ডেড ভোট’ দিতে হবে, যাতে জনগণের কাছে এমপির দায়বদ্ধতা থাকে। ৩. ৯০ দিনের মধ্যে একটি শক্তিশালী গবেষণা সহায়তা ইউনিট গঠন করতে হবে, যাতে নতুন এমপিরা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বিতর্ক করতে পারেন। ৪. প্রধানমন্ত্রীর উত্তর ও মন্ত্রীদের জবাবের পর ৬০ দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেয়ার বিধান করতে হবে। ৫. বাজেট অধিবেশনের আগেই অডিট আপত্তি ও প্রকল্প ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে শুনানি করতে হবে।

প্রশ্ন : জবাবদিহিতার বিষয়টি কি আরেকটু ব্যাখ্যা করবেন?

ড. শরিফুল আলম : সরকারকে ‘কথা’ কমিয়ে ‘সময়বদ্ধ জবাবদিহি’ নিশ্চিত করতে হবে। আমার দাবিগুলো স্পষ্ট : ১. গণভোটের আইনি ভিত্তি ও পূর্ণাঙ্গ সময়সূচি ঘোষণা করতে হবে। ২. ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের মাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে। ৩. দুর্নীতি দমন, গুম তদন্ত ও বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে বাতিল হওয়া অর্ডিন্যান্সের স্থলে দ্রুত শক্তিশালী খসড়া আইন টেবিলে আনতে হবে।

প্রশ্ন : সবমিলিয়ে আপনার চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ কী?

ড. শরিফুল আলম : প্রথম অধিবেশন কোনো ‘ট্রেলার’ নয়, এটি ছিল সরকারের দায়বদ্ধতা প্রমাণের প্রথম বড় মঞ্চ; কিন্তু সরকার সেখানে কেবল আশ্বাস দিয়েছে, জবাবদিহির কোনো কাঠামো দেয়নি। জনরায়ের নাম করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার কোনো চেষ্টা হলে রাষ্ট্রের বৈধতা নড়বড়ে হয়ে পড়বে। পরবর্তী অধিবেশনে যদি এই আইনি শূন্যতাগুলো পূরণ না হয়, তবে ‘সংস্কার’ শব্দটি জনগণের কাছে কেবল একটি প্রতারণার প্রতিশব্দ হিসেবেই গণ্য হবে।