নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় শান্তি উদ্যোগ বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং পশ্চিম তীরে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার প্রেক্ষাপটে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বৈঠকে গাজার জনগণ আরেকটি যুদ্ধ সহ্য করতে পারবে না বলে জাতিসঙ্ঘ কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন।
নিরাপত্তা পরিষদে বক্তব্য দিতে গিয়ে জাতিসঙ্ঘের উপ-বিশেষ সমন্বয়কারী রামিজ আল আকবারভ বলেন, ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাব (গাজা পুনর্গঠন) বাস্তবায়নে বিলম্ব অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখ-ের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে এবং গাজায় মানবিক সঙ্কটকে তীব্রতর করছে। তিনি সকল পক্ষকে এমন যেকোনো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান, যা নতুন করে বড় ধরনের সঙ্ঘাত সৃষ্টি করতে পারে। এ দিকে গাজাবিষয়ক শান্তি পরিষদের উচ্চ প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ বলেন, যুদ্ধবিরতির ফলে সহিংসতা কিছুটা কমেছে এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ বেড়েছে। তবে এখনো এই অঞ্চলে “কোনো প্রকৃত পুনরুদ্ধার” শুরু হয়নি। তিনি আরো জানান, গাজার রূপান্তর পরিকল্পনা ‘পারস্পরিকতা’ নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ উভয় পক্ষের নেয়া পদক্ষেপ পরস্পরের দায়বদ্ধতার সাথে সম্পর্কযুক্ত থাকবে।
বৈঠকে পূর্ব জেরুসালেমসহ পশ্চিম তীরে বাড়তে থাকা সহিংসতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রতিনিধিরা। জাতিসঙ্ঘ কর্মকর্তারা বলেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি কাঠামো আরো সঙ্ঘাত প্রতিরোধ এবং গাজার পুনর্গঠন এগিয়ে নেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। একই সাথে তারা স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণ এবং দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানান। অন্য দিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও ত্রাণ সংস্থা অক্সফাম, সেভ দ্য চিলড্রেন এবং রিফিউজিস ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, জাতিসংঘের গাজা শান্তি পরিকল্পনা গ্রহণের ছয় মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেখানে মানবিক পরিস্থিতির কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা ইসরাইলের প্রতিশ্রুতি এবং ফিলিস্তিনি জনগণের বাস্তব অবস্থার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধানের কথা তুলে ধরেন।
অক্সফাম আমেরিকার প্রেসিডেন্ট অ্যাবি ম্যাক্সম্যান বলেন, ইসরাইল এখনো অধিকাংশ অভিজ্ঞ সহায়তা সংস্থাকে গাজায় প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। ফলে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার পাইপ, আশ্রয় নির্মাণ সামগ্রী, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য জরুরি উপকরণ সেখানে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, স্যানিটেশন ও জীবাণুনাশক সামগ্রীর ঘাটতির কারণে পরিবারগুলো খোলা নর্দমার পানি থেকে ছড়িয়ে পড়া রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সাথে বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। সম্প্রতি গাজা সফর শেষে ফিরে আসা মার্কিন সার্জন ড. টেরেসা সোল্ডনার বলেন, ইসরাইলের অব্যাহত হামলার কারণে সহিংসতা কমেনি এবং ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। এ দিকে সেভ দ্য চিলড্রেনের জান্তি সোয়েরিপ্তো জানান, তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের প্রতিনিয়ত ক্লিনিকে আনা হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা আরো বেড়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, শিক্ষাব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ছয় লাখের বেশি শিশু টানা তৃতীয় বছরের মতো বিদ্যালয়ে যেতে পারবে না।
গাজায় ইসরাইলি ড্রোন হামলা, ত্রাণ প্রবেশে বাধা
গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় রাফাহ শহরের শাকুস এলাকায় ইসরাইলি ড্রোন হামলায় রাফেত আদিল বারিকে নামে ৪২ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি রাখাল নিহত হয়েছেন। স্থানীয় হাসপাতাল সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে আনাদোলু জানায়, নিহত রাফেত আদিল বারি পশু চরানোর সময় হামলার শিকার হন। একই সময়ে খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চলেও ভারী গোলাবর্ষণ চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও প্রায় প্রতিদিন হামলা চলছে। ফিলিস্তিনি সূত্রগুলোর দাবি, অক্টোবর ২০২৩ থেকে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৭২ হাজার ৭৭৫ জনে পৌঁছেছে এবং আহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার ৭৫০ জন।
এ দিকে গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন ৬০০টি ও সপ্তাহে ৪ হাজার ৪০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশের কথা থাকলেও গত সপ্তাহে মাত্র ১ হাজার ২৮৭টি ট্রাক ঢুকতে পেরেছে। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় সহায়তার মাত্র ৩০ শতাংশ প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রবেশ করা ট্রাকগুলোর মধ্যে ৬৯৩টি মানবিক সহায়তা, ৫৫৯টি বাণিজ্যিক পণ্য এবং মাত্র ৩৫টি জ্বালানি বহন করছিল। একই সাথে রাফাহ সীমান্ত ক্রসিংয়েও যাত্রী চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ বজায় রয়েছে। গাজার কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ইসরাইলের এসব বিধিনিষেধর কারণে গাজায় খাদ্য, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সঙ্কট আরো তীব্র হচ্ছে এবং মানবিক পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে।
ইঁদুরবাহী রোগে আক্রান্ত ১ লাখ ২৫ হাজারের বেশি মানুষ
গাজা উপত্যকায় ১ লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি ইঁদুর ও পরজীবীজনিত ত্বকের রোগে আক্রান্ত হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে এত সংখ্যক মানুষ ত্বকের রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে নথিভুক্ত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার এই তথ্য প্রকাশ করেছে জাতিসঙ্ঘের ফিলিস্তিনবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিওএ। সংস্থাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে জানায়, গাজা উপত্যকায় আরেকটি নতুন সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। ইঁদুর ও পরজীবী সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। ত্বকের এই সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে রোগের ঝুঁকি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় “ভয়াবহ ট্র্যাজেডি”: ডব্লিউএইসও
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইসও) সতর্ক করে বলেছে, গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেমে স্বাস্থ্য ও মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ সঙ্কটে পৌঁছেছে। সংস্থাটি জানায়, গাজায় বর্তমানে কোনো হাসপাতালই পুরোপুরি সচল নেই এবং উত্তর গাজায় কার্যকর হাসপাতাল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় ওষুধের অর্ধেকেরও বেশি মজুদ শেষ হয়ে গেছে এবং হাজারো রোগীর জরুরি চিকিৎসা স্থানান্তর প্রয়োজন। সংস্থাটি আরো জানায়, অতিরিক্ত ভিড়, নোংরা পরিবেশ ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কটের কারণে সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। একই সাথে গর্ভবতী নারী ও নবজাতকদের ঝুঁকি বাড়ছে এবং মানসিক স্বাস্থ্যসঙ্কটও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
পশ্চিম তীরেও সহিংসতা ও চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের আর্থিক সঙ্কটে সরকারি হাসপাতালগুলো মূলত জরুরি সেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এ দিকে চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র ঘাটতির কারণে গাজার হাসপাতালগুলো সঠিকভাবে কাজ করতে পারছে না বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। একই সাথে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর ওপর ইসরাইলি নিষেধাজ্ঞার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সংস্থাটি। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির। এ প্রসঙ্গে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি রাইনহিল্ড ভ্যান ডি উইরড বলেছেন, গাজা উপত্যকার বেশির ভাগ হাসপাতাল এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো কেবল আংশিকভাবে সচল রয়েছে, তবে কোনো হাসপাতালই পুরোপুরি কার্যকর নয়। জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরো বলেন, ‘এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো সচল না থাকার অন্যতম প্রধান কারণ হলো, এগুলো চিকিৎসা সরঞ্জামের মারাত্মক ঘাটতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম অপরিহার্য। এখানে কোনো আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বা প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকা উচিত নয়।’ রাইনহিল্ড ভ্যান ডি উইরড জানান, সমস্যার একটি অংশ হলো ইসরাইল এমন কিছু জিনিসের প্রবেশে বাধা দিচ্ছে যেগুলোকে তারা ‘দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য’ বলে দাবি করছে।
পশ্চিম তীরে এক সপ্তাহে দখলদারদের ৪৯ হামলা
জাতিসঙ্ঘ জানিয়েছে, মাত্র এক সপ্তাহে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি দখলদারদের অন্তত ৪৯টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। জাতিসঙ্ঘের মানবিক সমন্বয় সংস্থা ওসিএইসএর তথ্য তুলে ধরে মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক বলেন, এসব হামলায় ব্যাপক হতাহত ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তিনি জানান, ১২ থেকে ১৮ মে সময়কালে বাড়িঘর, কৃষিজমি, যানবাহন ও একটি মসজিদে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ২২০টির বেশি ফিলিস্তিনি কমিউনিটিতে ৮৭০টির বেশি দখলদার হামলা হয়েছে।
জাতিসঙ্ঘের তথ্য মতে, এসব হামলার কারণে অনেক ফিলিস্তিনি পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। একই সাথে পূর্ব জেরুসালেমসহ পশ্চিম তীরে নতুন অবৈধ বসতি সম্প্রসারণও উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। স্টিফেন দুজারিক বলেন, আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি, কিন্তু ইসরাইলি বিধিনিষেধের কারণে তাদের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।



