দেশ থেকে অর্থ পাচারের পুরনো কৌশল ছিল ভুয়া আমদানি, অতিমূল্যায়িত এলসি (লেটার অব ক্রেডিট), আন্ডার-ইনভয়েসিং কিংবা হুন্ডি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবার বিস্তার এবং অফশোর ব্যাংকিং ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে নতুন নতুন পদ্ধতিতে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ, গোয়েন্দা সংস্থা ও ব্যাংক খাত-সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল ওয়ালেট, মোবাইল ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম এবং অফশোর অ্যাকাউন্টের সমন্বয়ে এমন এক জটিল অর্থ পাচার চক্র গড়ে উঠেছে, যেখানে প্রচলিত এলসি জালিয়াতির প্রয়োজনই পড়ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন ধরনের পাচার প্রক্রিয়াগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কারণ এসব লেনদেনের বড় অংশ হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমে, যা অনেক সময় দেশের প্রচলিত ব্যাংকিং তদারকির বাইরে থেকে যাচ্ছে।
অফশোর ব্যাংকিং: বৈধ সেবার আড়ালে ঝুঁকি
অফশোর ব্যাংকিং মূলত বিদেশী মুদ্রায় আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগ সহজ করার জন্য চালু করা হয়েছিল। রফতানিকারক, বহুজাতিক কোম্পানি কিংবা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি একটি স্বীকৃত আর্থিক কাঠামো। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে এই ব্যবস্থাই অর্থ পাচারের নিরাপদ চ্যানেলে পরিণত হতে পারে। ব্যাংক খাত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, কিছু প্রতিষ্ঠান অফশোর ইউনিটের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে প্রকৃত লেনদেনের তথ্য গোপন করছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেল কোম্পানি খুলে সেখানেই অর্থ স্থানান্তর করা হচ্ছে। পরে সেই অর্থ বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ, সম্পদ ক্রয় কিংবা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়। একজন সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘আগে এলসি খুলে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেখানো হতো। এখন অনেক ক্ষেত্রে কোনো পণ্যই আসছে না। ডিজিটাল ট্রান্সফার, কনসালটেন্সি ফি, সফটওয়্যার সার্ভিস বা ভার্চুয়াল অ্যাসেটের নামে টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে।’
ক্রিপ্টোকারেন্সি এখন নতুন মাধ্যম
বিশ্বব্যাপী ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার বাড়লেও বাংলাদেশে এটি এখনো বৈধ নয়। তার পরও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, পিয়ার-টু-পিয়ার (পিটুপি) ট্রেডিং এবং বিদেশী এক্সচেঞ্জ ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ ক্রিপ্টোতে রূপান্তর করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, পাচারকারীরা প্রথমে স্থানীয়ভাবে মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে। এর পর অনলাইন ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সেই অর্থ দিয়ে বিটকয়েন, টেথার বা অন্যান্য স্টেবলকয়েন কেনা হয়। পরে বিদেশে অবস্থানকারী সহযোগীরা একই ক্রিপ্টো বিক্রি করে ডলার বা অন্য মুদ্রায় নগদায়ন করেন। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো এলসি খোলার প্রয়োজন হয় না, এমনকি প্রচলিত বৈদেশিক লেনদেনের রেকর্ডও অনেক সময় থাকে না। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষে লেনদেন শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক অসংখ্য গোপন গ্রুপে অবৈধ ক্রিপ্টো লেনদেন চলছে। অনেক ফ্রিল্যান্সার বা অনলাইন ব্যবসার আড়ালেও এই নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে থাকা বাংলাদেশীরা দেশে টাকা পাঠানোর পরিবর্তে ক্রিপ্টো ট্রান্সফারের মাধ্যমে সমন্বয় করছে, যা পরে পাচারের রুটে ব্যবহার হচ্ছে।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অপব্যবহার
মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়িয়েছে। তবে একই সাথে এটি অর্থ পাচার ও অবৈধ লেনদেনের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে অসংখ্য ভুয়া এনআইডি, ভাড়াকৃত সিম এবং নামসর্বস্ব অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে হাজার হাজার ক্ষুদ্র লেনদেনের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর করা হচ্ছে। পরে সেই অর্থ বিভিন্ন ডিজিটাল ওয়ালেট বা বিদেশী পেমেন্ট গেটওয়েতে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, ‘একবারে ৫০ কোটি টাকা পাঠানো হলে সেটি ধরা সহজ। কিন্তু যদি ৫০ হাজার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে প্রতি দিন ছোট ছোট অঙ্কে টাকা স্থানান্তর করা হয়, তা হলে তা শনাক্ত করা অনেক জটিল হয়ে যায়।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে কিছু চক্র অনলাইন গেমিং, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং কিংবা ভার্চুয়াল সার্ভিসের নামে অর্থ লেনদেন করছে। এসব ক্ষেত্রে প্রকৃত সেবা বা পণ্যের অস্তিত্ব যাচাই করা কঠিন হওয়ায় পাচারকারীরা সুযোগ নিচ্ছে।
ওভার-ইনভয়েসিং ছাড়াই অর্থ পাচার
অতীতে অর্থ পাচারের সবচেয়ে আলোচিত পদ্ধতি ছিল ওভার-ইনভয়েসিং অর্থাৎ আমদানিকৃত পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্য দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ বিদেশে পাঠানো। কিন্তু এখন অনেক পাচারকারী এই পদ্ধতি এড়িয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের ফলে ‘ইনট্যানজিবল সার্ভিস’ বা অদৃশ্য সেবার মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর সহজ হয়েছে। সফটওয়্যার লাইসেন্স, ক্লাউড সার্ভিস, আইটি কনসালটেন্সি, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বা অনলাইন সাবস্ক্রিপশনের নামে বিদেশে অর্থ পাঠানো হচ্ছে। এসব সেবার প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ কঠিন হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই যাচাই দুর্বল থাকে। একজন ব্যাংকার জানান, ‘একটি সফটওয়্যার সেবার মূল্য ১০ হাজার ডলার না ১ লাখ ডলার- তা যাচাই করা প্রায় অসম্ভব। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত অর্থ বিদেশে পাঠাচ্ছে।’
হুন্ডির সাথে ডিজিটাল নেটওয়ার্কের সংযোগ
প্রচলিত হুন্ডি ব্যবস্থাও এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির সাথে যুক্ত হয়ে আরো শক্তিশালী হয়েছে। আগে যেখানে নগদ অর্থ আদান-প্রদান হতো, এখন সেখানে মোবাইল ব্যাংকিং, ই-ওয়ালেট এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহৃত হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশে থাকা একটি চক্র স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে দেশে টাকা সংগ্রহ করে। পরে সেই অর্থ মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে দেয়া হয় এবং বিভিন্ন ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশে সমন্বয় করা হয়। এতে ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে দ্রুত ও গোপনে অর্থ পাচার সম্ভব হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্বেগ
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ইতোমধ্যে সন্দেহজনক ডিজিটাল লেনদেন পর্যবেক্ষণ জোরদার করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে কেওয়াইসি কঠোর করার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি ভার্চুয়াল অ্যাসেট ও ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন নজরদারিতে আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তাও নেয়া হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর পাচার মোকাবেলায় দেশের সক্ষমতা এখনো সীমিত। উন্নত দেশগুলোর মতো ব্লকচেইন ট্র্যাকিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক লেনদেন বিশ্লেষণ এবং আন্তঃদেশীয় তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা শক্তিশালী না হলে এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অর্থ পাচারের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। এখন আর শুধু ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখলেই হবে না। ডিজিটাল ওয়ালেট, অনলাইন এক্সচেঞ্জ, গেমিং প্ল্যাটফর্ম- সব কিছু নজরদারির আওতায় আনতে হবে।’
অর্থনীতিতে প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধভাবে অর্থ বিদেশে চলে যাওয়ায় দেশে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে। একই সাথে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সঙ্কট, বিনিয়োগ হ্রাস এবং কর রাজস্ব কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে ডলার সঙ্কট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রিজার্ভের চাপে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন কৌশলে অর্থ পাচার অব্যাহত থাকলে সঙ্কট আরো গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না; ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, ডিজিটাল আর্থিক সেবায় কঠোর নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। একই সাথে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া বড় পাচার চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে না।
সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থ পাচার ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিএফআইইউ, দুদক, সিআইডি, এনবিআর এবং টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল সম্পদ বিষয়ে আধুনিক আইন প্রণয়ন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি। তারা মনে করেন, বর্তমানে অর্থ পাচারের যে নতুন ধারা তৈরি হয়েছে, তা শুধু আর্থিক অপরাধ নয়; এটি জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। তাই এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এই ডিজিটাল পাচার নেটওয়ার্ক আরো বিস্তৃত ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।



