দ্বিগুণ টাকা দিয়েও শাহজালাল ওভারসিজের প্রতারণার শিকার ১১১ হাজী

ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি

খালিদ সাইফুল্লাহ
Printed Edition

প্রায় দ্বিগুণ টাকা দিয়েও এবার হজ করতে গিয়ে পদে পদে প্রতারণার শিকার হয়েছেন ১১১ জন হাজী। তারা হজ প্যাকেজে ঘোষিত প্রতিশ্রুতি পূরণ না করে প্রতারণা, অনিয়ম ও চরম অব্যবস্থাপনার অভিযোগ করেছেন শাহজালাল ওভারসিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে। প্রতারণার শিকার এই হাজীদের অভিযোগ, ভিআইপি প্যাকেজ হিসেবে তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ১৪-১৫ লাখ টাকা করে নেয়া হয়েছিল। সৌদি আরবে থ্রি স্টার মানের হোটেলে তাদের রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে তা করা হয়নি। খাবার সরবরাহ ও যাতায়াতের যানবাহনের ক্ষেত্রেও করা হয়েছে হয়রানি ও প্রতারণা। এ জন্য তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন হাজীরা।

জানা যায়, এবারের অনুষ্ঠিত হজে গুলশানের নাভানা টাওয়ারে অবস্থিত বেসরকারি হজ এজেন্সি শাহজালাল ওভারসিজের (লাইসেন্স নং-১১৭৮) মাধ্যমে পবিত্র হজ পালনে যান মোট ২২২ জন হাজী। এর মধ্যে ১১১ জন ভিআইপি প্যাকেজে যান। শাহ আমানত হজ কাফেলা (লাইসেন্স নং-০১৭৮) ছিল তাদের লিড এজেন্সি। তবে হজে সমন্বয়কারী এজেন্সি হিসেবে নিজেদের হাজীদের দেখভালের দায়িত্ব নিজেরাই পালন করে শাহজালাল ওভারসিজ। এ জন্য তাদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ লুৎফুল হক নাইম নিজেই হজ গাইডের দায়িত্ব নেন। গত ২৬ মে পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হয়। হাজীদের শেষ ফিরতি ফ্লাইট ছিল ৩০ জুন।

হাজীরা অভিযোগ করেন, মক্কায় তাদের রাখার কথা ছিল হিল্টন হোটেলে; কিন্তু বাস্তবে সেখানে না রেখে রাখা হয় আজিজিয়া হোটেলে। এই হোটেলের খাবারের মান ভালো থাকলেও তা না দিয়ে শাহজালাল ওভারসিজ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করে ভিআইপি এসব হাজীদের। অনেকে ওই খাবার না খেয়ে বাইরে থেকে নিজ টাকায় খাবার কিনে খান। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আজিজিয়া হোটেলে প্রতিটি রুমের বাথরুম ছিল ব্যবহারের অনুপযোগী। মদিনায় যেতে পরিবহন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও ছিল প্রতারণা ও অব্যবস্থাপনা। নির্ধারিত সময়ের সাত ঘণ্টা পরে আসে পরিবহন। তবে নিম্নমানের পরিবহন হওয়ায় অনেকে বাড়তি টাকা খরচ করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মদিনায় পৌঁছান। ভুক্তভোগী এসব হাজী সম্প্রতি হজ-উত্তর এক বৈঠকে মিলিত হয়ে নিজেদের প্রতারণার চিত্র তুলে ধরেন। বৈঠকটি সমন্বয় করেন ভুক্তভোগী ও ধানমন্ডি ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হাবিব উল্লাহ বাবুল। বৈঠকে হাজীরা অভিযোগ করেন, মক্কা, আজিজিয়া ও মদিনায় তিন জায়গাতেই প্রতারণার শিকার হন তারা। একজন হাজী বলেন, মক্কাতে মক্কা টাওয়ারে তাদেরকে সুপার ইকোনমি প্যাকেজের আওতায় লাঞ্চ ও ডিনার সরবরাহ করা হয়েছে, যা ছিল নিম্নমানের।

ওই বৈঠকে থাকা আরেকজন হাজী বলেন, গত ১৩ মে সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে জেদ্দা এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পর ১১১ জন হজযাত্রীকে ওই রাতে কোনো খাবার সরবরাহ করা হয়নি। পরদিন সকালে আল বাইকের নাগেটস, চিকেন ফ্রাই ঠাণ্ডা অবস্থায় হজযাত্রীদের দেয়া হয়। দীর্ঘ আট ঘণ্টা খালি পেটে এসব নাশতা খেয়ে কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েন।

হাজীরা অভিযোগ করেন, মক্কা টাওয়ারে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৯ রাতের পরিবর্তে আট রাত রাখা হয়। প্যাকেজে অল্প পরিসরে হলেও ঐতিহাসিক মুসলিম নিদর্শন এবং রাসূলুল্লাহ সা:-এর যুগের মসজিদ ঘুরিয়ে দেখানোর কথা স্পষ্ট উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে শাহজালাল ওভারসিজ হাজীদের নামমাত্র দুই-একটি স্থান ঘুরিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে। অথচ অন্যান্য এজেন্সি ভিআইপি এবং সাধারণ প্যাকেজের হাজীদের মক্কার চার পাশের সব পবিত্র ও সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থানগুলো অত্যন্ত যতœ সহকারে দেখিয়েছে এবং সেখানে নামাজের সুব্যবস্থা করা হয়। অথচ শাহজালাল ওভারসিজের হাজীরা চরম বৈষম্য ও অবহেলার শিকার হন। বৈঠকে তারা বলেন, মক্কা-মদিনার ঐতিহাসিক স্থানগুলো দর্শন কেবল সাধারণ কোনো ঘুরে বেড়ানো নয়; বরং এটি একজন হাজীর ধর্মীয় আবেগ এবং মক্কা সফরের পূর্ণতার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এজেন্সির খামখেয়ালিপনা ও দায়িত্বহীনতার কারণে হাজীরা এই পবিত্র ও স্মৃতিময় অভিজ্ঞতা অর্জন করা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

ভুক্তভোগী হাজীদের অভিযোগ, ১০ ও ১১ জিলহজ মিনার তাঁবুতে রাত যাপন করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা, কোনো কোনো মাজহাবের মতে এটি ওয়াজিব; কিন্তু শাহজালাল ওভারসিজ হাজীদেরকে ১০ তারিখ মিনার তাঁবুতে না রেখে ইচ্ছাকৃতভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ পালনে অসহযোগিতা করেছে। ঈদের দিন বা পরদিন অনেক এজেন্সি তাদের হাজীদের কোরবানির গোশত দিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করেছিল। অথচ শাহজালাল ওভারসিজ কোরবানির গোশত তো দূরের কথা, ঈদের দিন সকালে কোনো নাশতার ব্যবস্থাও করেনি। আজিজিয়া থেকে মদিনাগামী একটি বাদে কোনো বাসে দুপুরের খাবারের টাকাও দেয়া হয়নি। ভিআইপি প্যাকেজের যাত্রীদের বাসে উঠিয়ে দিয়ে শাহজালাল ওভারসিজের মালিকপক্ষ লাক্সারি জিএমসি এসইউভি নিয়ে মক্কা থেকে মদিনায় রওনা দেন। আর মদিনা থেকে হাজীদের না জানিয়ে মালিকপক্ষ বাংলাদেশে চলে আসেন। ক্ষতিগ্রস্ত হাজীরা শাহজালাল ওভারসিজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

শাহজালাল ওভারসিজের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ লুৎফুল হক নাইমকে ফোন করলে তিনি বিদেশে চিকিৎসার জন্য রয়েছেন জানিয়ে অভিযোগ প্রসঙ্গে কোনো জবাব দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।