ফের সঙ্ঘাতে জড়াতে চায় না উভয় পক্ষই

যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতা স্মারকের কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

যুদ্ধ বন্ধ ও বিস্তারিত পরমাণু আলোচনার রূপরেখা সংক্রান্ত একটি এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে ইরানের সাথে চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে ধারণা করছে হোয়াইট হাউজ। দুই মার্কিন কর্মকর্তাও বিষয়টি সম্বন্ধে অবগত আরো দু’টি সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস বুধবার এ খবর দিয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু শর্তের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছ থেকে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিক্রিয়া পাওয়ারও আশা করছে বলে জানিয়েছে অ্যাক্সিওস। দুই পক্ষ এখনো এ স্মারকের ব্যাপারে একমত হয়নি, তবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ওয়াশিংটন ও তেহরান চুক্তির এতটা কাছাকাছিও আর কখনো আসেনি বলে ভাষ্য সংবাদমাধ্যমটির।

চুক্তিতে যেসব শর্ত রয়েছে, তার মধ্যে থাকতে পারে- যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও আটকে রাখা দুই হাজার কোটি ডলার ছাড়ের বিনিময়ে ইরান তার পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত রাখবে। এর পাশাপাশি ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে দেবে, যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দরগুলোর ওপর দেয়া তার অবরোধ তুলে নেবে, বলছে অ্যাক্সিওস।

১৪ দফাবিশিষ্ট ওই সমঝোতা স্মারক নিয়ে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও জারেড কুশনারের সাথে একাধিক ইরানি কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনা চলছে বলেও প্রতিবেদনে বলেছে তারা।

উভয়পক্ষ রাজি হলে ওই এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমেই মধ্যপ্রাচ্যে চলা যুদ্ধের ইতি ঘোষিত হবে, হরমুজ খুলে দেয়া হবে, শুরু হবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিতকরণ ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চুক্তি নিয়ে আলোচনার নির্ধারিত ৩০ দিনের সময়সীমা।

এই ৩০ দিনের মধ্যেই একে একে হরমুজে অবাধে নৌচলাচল শুরু হবে এবং মার্কিন নৌ-অবরোধও তুলে নেয়া হবে; তবে আলোচনা নস্যাৎ হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্র ফের নৌ-অবরোধ কিংবা সামরিক পদক্ষেপের পথে হাঁটতে পারবে, বলেছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা।

অ্যাক্সিওসের এ খবরের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স। তারা হোয়াইট হাউজ ও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে এ খবরের ব্যাপারে মন্তব্য চাইলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পায়নি। তবে অ্যাক্সিওসের এ খবরের পর মার্কিন শেয়ারবাজারে ব্যাপক চাঙ্গাভাব দেখা গেছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সব মার্কিন স্থাপনায় তেহরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ে জবাব দেয়। তাদের এ থযুদ্ধ টানা ৪০ দিন চলার পর ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে।

এ বিরতির মধ্যেই ইরান হরমুজ না খোলায় যুক্তরাষ্ট্র সব ইরানি বন্দরের ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করে। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথটি খুলতে সম্প্রতি তিনি নৌ-অভিযান ‘প্রোজেক্ট ফ্রিডমও’ শুরু করেছিলেন। যদিও তিন দিন পরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট তা স্থগিত ঘোষণা করেন। এরপর বুধবার ইরান জানায়, ‘ন্যায্য শান্তি চুক্তি’ হলে তারা তা মেনে নেবে।

ট্রাম্পের ‘প্রোজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর পারস্য উপসাগরে আটকা পড়া জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালীর বাইরে নিয়ে আসার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। ট্রাম্প মঙ্গলবার তার সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণাটি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।

তিনি জানিয়েছেন, পাকিস্তান ও অন্য দেশগুলোর ‘অনুরোধের ভিত্তিতে’ সিদ্ধান্তটি নেয়া হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘ঘটনাটি হচ্ছে সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত একটি চুক্তির দিকে বিরাট অগ্রগতি হয়েছে। আমরা পারস্পরিকভাবে সম্মত হয়েছি যে অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে ও কার্যকরভাবে বজায় থাকলেও প্রোজেক্ট ফ্রিডম (হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল) সাময়িক সময়ের জন্য স্থগিত থাকবে এটি দেখার জন্য যে চুক্তিটি চূড়ান্ত করে স্বাক্ষর করা যায় কি না।’

ট্রাম্পের এ ভাষ্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি বলে জানিয়েছে আলজাজিরা। এর আগে হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রোজেক্ট ফ্রিডম’ অভিযানকে কেন্দ্র করে ইরানের সাথে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, তারা হরমুজ প্রণালীতে বেশ কয়েকটি ইরানি নৌকার পাশাপাশি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানায়, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা দ্বিতীয় দিনের মতো ইরান থেকে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মোকাবেলা করছে। হরমুজ প্রণালীতে থাকা আরেকটি বাণিজ্যিক জাহাজ জানিয়েছে, ‘অজ্ঞাত একটি প্রোজেক্টাইল’ তাদের জাহাজে আঘাত হেনেছে।

ইরানের ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) প্রণালীটির একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে। এতে আরো বিস্তৃত এলাকায় ইরানের নিয়ন্ত্রণ দেখানো হয়েছে। মঙ্গলবার আইআরজিসি হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের জন্য জাহাজগুলোকে তাদের নির্ধারিত করিডোরগুলো অনুসরণ করতে অথবা ‘নিশ্চিত প্রতিক্রিয়ার’ মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করেছে।

ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার আক্রমণাত্মক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ সম্পূর্ণ করেছে আর ‘প্রথমে আমাদের গুলি করা না হলে কোনো গোলাগুলি হবে না।’

কিন্তু হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করার জন্য ইরানকে অবশ্যই একটি ‘মূল্য দিতে হবে’। রুবিও বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী ইরানের অন্তর্ভুক্ত না। এটি বন্ধ করে রাখার, সেখানে মাইন পোঁতার ও জাহাজে আক্রমণ চালানোর কোনো অধিকার নেই তাদের।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীতে নতুন করে সহিংসতা শুরু হলেও তাতে চার সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘিত হয়নি। পেন্টাগনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘মার্কিন সেনাদের ইরানের নৌসীমায় প্রবেশ করার দরকার হবে না। এটা প্রয়োজনীয় না। আমরা লড়াই করতে চাই না। কিন্তু ইরানকে নিরপরাধ দেশগুলো ও তাদের পণ্যগুলোকে আন্তর্জাতিক পানিপথ থেকে অবরুদ্ধ করে রাখার অনুমোদন দেয়া যাবে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘এখন যুদ্ধবিরতি নিশ্চিতভাবেই কার্যকর আছে, কিন্তু আমরা অত্যন্ত নিবিড়, নিবিড়ভাবে নজর রাখতে যাচ্ছি।’

এদিকে অস্ট্রেলিয়ার ডিকিন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শাহরাম আকবরজাদেহ মনে করেন, ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত করা যুদ্ধের সরাসরি সমাপ্তি না হলেও এটি ‘শেষের শুরু’ হতে পারে। তার মতে, ইরান যুদ্ধের অবসান চাইছে এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি কূটনীতির স্পষ্ট বার্তা দেয়, তবে ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনা কম। তবে আকবরজাদেহ সতর্ক করে বলেন, এর আগেও এমন সুযোগ নষ্ট হয়েছে। ইসরাইলের কঠোর অবস্থান বা ট্রাম্পের কৌশলগত ভুল ব্যাখ্যার কারণে সম্ভাব্য সমঝোতা নস্যাৎ হয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন উভয় পক্ষই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরতে চায় না এবং কূটনৈতিক সমাধান খুঁজছে। কিন্তু বড় বাধা হলো, কেউই নিজেদের পরাজিত হিসেবে উপস্থাপন করতে চায় না। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপে এই আলোচনাগুলো জটিল হয়ে উঠছে। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক বুরচু ওজচেলিকের মতে, ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ইরানের নেতৃত্ব পারমাণবিক ইস্যুতে কী সিদ্ধান্ত নেয় তার ওপর। দিন দিন দেশটির অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে। কারণ, হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার ফলে ইরানের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, যুদ্ধ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়নি। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, দীর্ঘ সঙ্ঘাতের পর হয়তো একটি কূটনৈতিক সমাধানের দিকেই এগোচ্ছে পরিস্থিতি।

২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ইরানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। অন্যদিকে লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসনের ফলে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, নিহত হয়েছে সহস্রাধিক লোক। সামনে নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ মিডটার্ম নির্বাচন। তার আগে তেলের মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্পের এই মিশন স্থগিতের খবরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ১ দশমিক ৭ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ১০৮ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। হোয়াইট হাউজ অবশ্য আলোচনার প্রকৃত অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।