বিশেষ সংবাদদাতা
দেশের অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে গতি ফিরছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন বাড়ছে, কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের আমদানিও ঊর্ধ্বমুখী। এর প্রভাব পড়েছে আমদানি ব্যয়ের ওপর। সেই ধারাবাহিকতায় মার্চ-এপ্রিল সময়ের আমদানি বিল বাবদ এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) কাছে ১ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে শিল্প খাতে উৎপাদন কার্যক্রম কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় কাঁচামাল, জ্বালানি, ভোগ্যপণ্য ও মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বেড়েছে। ফলে আকুর মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া আমদানি দায়ও বেড়েছে। যদিও এটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত, তবে একই সাথে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপও বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত দেশের মোট বা গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩৫ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব অনুযায়ী নিট রিজার্ভ ছিল ৩০ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। আকুর বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ আরো কিছুটা কমে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে সমন্বয় শেষে রিজার্ভের প্রকৃত অবস্থান জানা যাবে।
গত কয়েক দফাতেই আকুর দায় পরিশোধের অঙ্ক এক বিলিয়ন ডলারের বেশি থাকছে। এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ের আমদানি বিল বাবদ ১৩৬ কোটি ৮৭ লাখ ডলার পরিশোধ করেছিল বাংলাদেশ। ২০২৫ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর সময়ে এ দায় ছিল প্রায় ১৫৩ কোটি ডলার। একই বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সময়ে পরিশোধ করা হয় ১৬১ কোটি ডলার। এরও আগে জুলাই-আগস্ট সময়ে প্রায় ১৫০ কোটি ডলার এবং মে-জুন সময়ে রেকর্ড ২০২ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। অর্থাৎ, প্রতি দুই মাস অন্তর গড়ে সোয়া এক বিলিয়ন ডলারের বেশি দায় পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা দেশের আমদানি ব্যয়ের উচ্চ প্রবণতাকেই নির্দেশ করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই আমদানি ব্যয় বাড়ে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্য খাতে কাঁচামাল আমদানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা অনেক বেশি। ফলে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি ফিরলে আমদানির চাপও বাড়ে। তবে রফতানি আয় ও প্রবাসী আয় বাড়লে এই চাপ কিছুটা সামাল দেয়া সম্ভব হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ধারাও কিছুটা ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। এ ছাড়া রফতানি আয়ও ধীরে ধীরে বাড়ছে। তবু ডলারের চাহিদা বেশি থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সতর্ক অবস্থানে থাকতে হচ্ছে। ব্যাংক খাতে ডলারের তারল্য বাড়লেও আমদানি দায় পরিশোধে এখনো চাপ রয়েছে। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন বা আকু হলো সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের লেনদেন নিষ্পত্তির একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। জাতিসঙ্ঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের উদ্যোগে ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সদর দফতর ইরানের রাজধানী তেহরানে।
বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার ও মালদ্বীপ-এই ৯টি দেশ আকুর সদস্য। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য লেনদেনের দায় প্রতি দুই মাস অন্তর সমন্বয় করা হয়। এর মাধ্যমে ডলারের ব্যবহার কিছুটা কমানো এবং আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য সহজ করাই আকুর মূল উদ্দেশ্য। তবে বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সঙ্কটের কারণে ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে আকু থেকে বেরিয়ে যায় শ্রীলঙ্কা। দেশটির অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময় বৈদেশিক দায় পরিশোধে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আকুর দায় এখন রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, বর্তমান রিজার্ভ পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রয়েছে। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, আমদানি কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলে শিল্প উৎপাদন ও বাজার সরবরাহ পরিস্থিতিও স্থিতিশীল থাকবে। তবে একই সাথে রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো না গেলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরো বাড়তে পারে। তাই অর্থনীতিকে সচল রাখতে একদিকে যেমন আমদানি প্রবাহ ধরে রাখতে হবে, অন্য দিকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎসও আরো শক্তিশালী করতে হবে।



