আবদুল মান্নান মানিকছড়ি (খাগড়াছড়ি)
সবুজ পাহাড় আর সমতলে ঘেরা খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র মৎস্য হেরিটেজ হালদা নদীর শাখা-প্রশাখা ও কৃষিজমি থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলন এবং টিলা কেটে ফেলার কারণে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়েছে। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান ও লাখ লাখ টাকা জরিমানা করার পরও থামছে না বালু-মাটি খেকোদের অপকর্ম।
সরেজমিন দেখা গেছে, মানিকছড়ি উপজেলা চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলাসংলগ্ন একটি সবুজ টিলা-বেষ্টিত জনপদ। এখানেই হালদা নদীর উৎপত্তিস্থল- যে নদী দেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। কিন্তু গত দুই দশকে এখানকার হালদা খালের শাখা-প্রশাখায় বালু উত্তোলন ও টিলা কেটে চলছে প্রকৃতি ধ্বংসের মহোৎসব।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত দুই মাসে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগে উপজেলা প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১৩টি মামলায় ৯ লাখ টাকা জরিমানা করেছে। এর মধ্যে তিনটি নিয়মিত মামলা দায়ের হয়েছে। তবুও বালু তোলা কিংবা পাহাড় কাটা বন্ধ হয়নি। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে মাটি ও বালু তোলার মহোৎসব চলছে অব্যাহতভাবে।
স্থানীয়রা জানায়, এক সময় যেসব জমিতে ফসল ফলত এখন সেসব জমি বালু উত্তোলনকারীদের হাতে লিজ দেয়া হচ্ছে। তুলাবিল এলাকার এক কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘খালের পাশের জমিতে এখন ফসল হয় না। তাই বালু তোলার জন্য ইজারা দিয়েছি।’ ভাঙ্গামুড়ার আবদুল্লাহ জানান, এলাকার প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে বালু ব্যবসা করে কোটিপতি হয়েছেন। ওই সব বালুখেকোরা শুধু অন্যের দোষ দেখেন। কিন্তু এতে যে নিজেরও ক্ষতি হচ্ছে সেটা বুঝতে চান না। এক ট্রাকচালক জানান, ‘চট্টগ্রাম শহরে হালদা খালের বালুর চাহিদা অনেক। তাই এই খাল থেকে দিনরাত ট্রাক ভর্তি করে বালু নিয়ে যাওয়া হয় নগরীতে।’
প্রশাসন সূত্র আরো জানায়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিনা আফরোজ ভূঁইয়ার নেতৃত্বে গত ৩০ জুলাই থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করে মোট ১৩টি মামলায় ৯ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এসব মামলা করা হয় বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ এর ৪(ছ) ধারা এবং বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এর ৬(খ)/১৫(১) ধারায়।
এর পরও বালুখেকোদের কার্যক্রম থেমে নেই। গত দুই দিনেও উপজেলার তিনটহরী ইউনিয়নের ডলুর রফিকের দোকান এলাকায় সন্ধ্যার পর পাহাড় কেটে মাটি সরানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। বালু খেকোরা এতটাই প্রভাবশালী যে, এ ঘটনায় স্থানীয় কেউ মুখ খুলতেও সাহস পাচ্ছে না। তথ্য পেলেই প্রশাসন অভিযান চালাচ্ছে, তবে অপরাধীরা পালিয়ে যায় বা প্রমাণ গায়েব করে ফেলে।
পরিবেশ কর্মী আবু দাউদ বলেন, অবৈধভাবে বালু তোলা ও পাহাড় কাটার ফলে এ অঞ্চলে ভূমিক্ষয়, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস এবং জলবায়ুর ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, পাহাড় ধসে প্রাণহানি হচ্ছে এবং বনাঞ্চলও ধ্বংসের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তিনি বলেন, ‘প্রশাসনের আরো কঠোর মনিটরিং দরকার। পাশাপাশি বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা ও স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আফরোজ ভূঁইয়া বলেন, ‘দুর্গম এলাকায় পাহাড় কাটা বা অবৈধ বালু উত্তোলনের তথ্য পেলেই আমরা তাৎক্ষণিক অভিযান চালাই। গত বৃহস্পতিবার রাতে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও অভিযুক্তরা পুলিশের উপস্থিতি আগেই টের পেয়ে মেশিন ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি সরিয়ে ফেলে। তবে এ অপরাধে সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম জানা গেছে, তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রকৃতি ধ্বংসের এ প্রবণতা বন্ধে স্থানীয় জনগণের সচেতনতা জরুরি। প্রশাসন একা পারবে না, সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’
পরিবেশবাদীরা বলছেন, এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে হালদা নদীর প্রাণধারা ও মানিকছড়ির প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিপন্ন হয়ে পড়বে। পাহাড় কাটা ও বালু তোলার এই অনিয়ন্ত্রিত দৌরাত্ম্য বন্ধ না হলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও কৃষি উভয়ই হুমকির মুখে পড়বে।



