নিজস্ব প্রতিবেদক
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবন, কর্ম ও বহুমুখী রাষ্ট্রনায়কোচিত অবদান নিয়ে আরো বেশি বস্তুনিষ্ঠ ও উচ্চমানের গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সাথে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করে জিয়াউর রহমানই সংবাদশিল্পকে অন্ধকার গলি থেকে মুক্ত আকাশে বের করেছিলেন।
গতকাল রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘গণমাধ্যম ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তারা এসব কথা বলেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজের সভাপতিত্বে এবং ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়ার সঞ্চালনায় স্মরণসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং বিশেষ বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন জহির উদ্দিন স্বপন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘ইতিহাসের প্রতি যে অবিচার ও কৃপণতা করা হয়েছে, তা দূর করতে শহীদ জিয়ার পুরো জীবন, তার চিন্তাভাবনা ও কাজ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।’
তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, মরহুম বিশিষ্ট সাংবাদিক মাহফুজুল্লাহর লেখা বই ছাড়া শহীদ জিয়াকে নিয়ে তেমন কোনো তথ্যসমৃদ্ধ ও গবেষণালব্ধ কাজ চোখে পড়ে না। এই মহান নেতার অবদানকে নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরার জন্য তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের এখন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বড় ধরনের গবেষণা পরিচালনার সুযোগ রয়েছে।
বিশেষ বক্তার বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী এবং ১৬ জুনের সংবাদপত্র বাতিলের কালো আইনের মধ্য দিয়ে দেশের গণমাধ্যম যে অন্ধকার গলিতে ঢুকে পড়েছিল, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্ম না হলে সেখান থেকে গণমাধ্যমকে আবার মুক্ত আকাশে বের করা সম্ভব হতো কি না ইতিহাসে সেই প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে যুগ যুগ ধরে শহীদ জিয়াউর রহমানকে সসম্মানে স্মরণ করতে হবে। তিনি শুধু গণমাধ্যমকে অবকাঠামোগত বা আর্থিক সুবিধাই দেননি; বরং গণমাধ্যম যাতে রাষ্ট্র ও সমাজের পরিচ্ছন্ন আয়না হিসেবে কাজ করতে পারে, সেই স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিলেন।’
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, শহীদ জিয়ার সবচেয়ে বড় অবদান ছিল ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ দর্শনের মাধ্যমে এই ভূখণ্ডের মানুষের নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ভৌগোলিক পরিচয় তথা সত্তা (আইডেন্টিটি) প্রতিষ্ঠা করা।
জিয়াউর রহমানের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা স্মরণ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, ’৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে সব রাজনৈতিক দলকে এক সুতায় গেঁথে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেছিলেন জিয়াউর রহমান। তিনি মুসলিম লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেন। একটি ‘লিবারেল ডেমোক্র্যাসি’ বা উদারপন্থী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেছিলেন।
অনুরূপ সুর মিলিয়ে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, জিয়াউর রহমান বঞ্চিত রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনীতির মাঠে এনে গঠনমূলক তর্কবিতর্কের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তিনি চতুর্থ সংশোধনীর সব বেড়াজাল ভেঙে দিয়ে কবর দেয়া পার্লামেন্টকে নতুন জীবন দিয়েছিলেন।
শহীদ জিয়ার ঐতিহাসিক নেতৃত্বের কথা স্মরণ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে কারো নির্দেশ বা প্ররোচনা ছাড়াই ৩৬ বছর বয়সের একজন বাঙালি মেজর একটি প্রতিষ্ঠিত সামরিক শক্তিসম্পন্ন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। যারা ইতিহাস জানেন, তারা অবগত যে, ২৫ মার্চের সেই রাতে তিনি যুদ্ধ ঘোষণা না করলে জাতি দিকনির্দেশনাহীন থাকত। একইভাবে ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতা যদি তাকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে নিয়ে না আসতো, তবে দেশে শান্তির ছায়া নেমে আসতো না।
’৭৪-এর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপট টেনে মির্জা ফখরুল বলেন, তৎকালীন আন্তর্জাতিক মহলে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে আখ্যায়িত হওয়া একটি ভঙ্গুর অর্থনীতিকে শহীদ জিয়া তার কঠোর পরিশ্রম দিয়ে টেনে তুলেছিলেন।
নিজ জীবনের স্মৃতিচারণ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, দিনাজপুর সফরকালে প্রেসিডেন্ট জিয়া আকস্মিকভাবে গাড়ি থামিয়ে এক অতি সাধারণ ও দরিদ্র মায়ের কুটিরে ঢুকে পানি পান করেছিলেন। রাষ্ট্রনায়ক হয়েও সাধারণ মানুষের সাথে এমন একাত্মতার ফলেই শাহাদতের পর লাখ লাখ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার নামাজে জানাজায় শরিক হয়েছিল। তৎকালীন আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘টাইম ম্যাগাজিন’ও তাদের প্রতিবেদনে শহীদ জিয়ার জনপ্রিয়তার এই অভূতপূর্ব ও আবেগঘন চিত্রটি তুলে ধরেছিল।
কৃষি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের যুগান্তকারী পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, খাল খনন কর্মসূচির পাশাপাশি রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট, অ্যাগ্রিকারচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও সুগারকেন ইনস্টিটিউটের আধুনিকায়নে জিয়াউর রহমানের অবদান অনস্বীকার্য। এ ছাড়া তরুণ সমাজকে দেশপ্রেমী করতে ‘হিজবুল বাহার’ জাহাজে করে বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশ ঘুরিয়ে দেখানোর অনন্য উদ্যোগ তিনিই নিয়েছিলেন।
বিগত শাসনামলে গণমাধ্যমের একাংশের চাটুকারিতার সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, মিডিয়া এখন করপোরেট বা বিজনেস হাউজের প্রতিনিধি হয়ে গেছে। বিগত রেজিমের চাটুকারিতা থেকে মুক্ত হয়ে মুক্ত সাংবাদিকতা ও গণতন্ত্রের পক্ষে সাংবাদিকদের যে লড়াই, তাতে বর্তমান সরকার ও দেশপ্রেমিক জনগণের পূর্ণ সমর্থন থাকবে।
আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি শহিদুল ইসলাম এবং দৈনিক যুগান্তর সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার, ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে এম মহসীন। জাতীয় প্রেস ক্লাব ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা এবং সিনিয়র সাংবাদিকরা এতে অংশ নেন। বক্তারা শহীদ জিয়ার রাষ্ট্রদর্শন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা ও দেশগঠনে তার অবদানের নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এর আগে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া স্মরণে আয়োজিত আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন অতিথিরা।



