ঈদুল ফিতর সমাগত

Printed Edition

লিয়াকত আলী

আজ মাহে রমজানুল মোবারকের ২৯ তারিখ। আগামীকাল অথবা পরের দিন ঈদুল ফিতর। বিগত দিনগুলোর মুহাসাবার আহ্বান এবং সাম্য ও সম্প্রীতির অমিয় বার্তা নিয়ে আসে পবিত্র ঈদুল ফিতর। যারা মাহে রমজানকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পেরেছেন, তাদের জন্য এই ঈদ সত্যিই খুশির উপলক্ষ। পক্ষান্তরে, যে বা যারা এই সুবর্ণ সুযোগের সদ্ব্যবহারে ব্যর্থ হয়েছে, তার বা তাদের জন্য আনন্দের কোনো বার্তা নেই।

রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার সাহাবায়ে কেরামকে বলেন, তোমরা মিম্বরের কাছে এসো। এরপর তিনি তিনবার ‘আমিন’ বললেন। সাহাবিরা প্রশ্ন করলেন, ব্যাপার কী? তিনি বললেন, আমি জিবরাইলের দোয়ায় আমিন বলেছি। এরপর তিনি বললেন :

১. ওই ব্যক্তির নাক ধূলিমলিন হোক অর্থাৎ সে ব্যর্থ ও অকৃতকার্য হোক, যার জীবনে রমজান এলো। কিন্তু সে এটির মূল্য দিলো না এবং আল্লাহর ক্ষমা লাভের উপযুক্ত হলো না। ২. আমার নাম উচ্চারণ করা হলো। অথচ সে আমার ওপর দুরূদ পাঠ করল না। ৩. যে ব্যক্তি তার মা-বাবা উভয়কে কিংবা যে কোনো একজনকে পেয়েও তাদের খেদমত করে জান্নাত লাভ করতে পারল না।

রমজান এমন সুবর্ণ সুযোগ যে, চেষ্টা করলে এক রমজান মাসই সারা জীবনের গুনাহ মাফের জন্য যথেষ্ট। যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখবে এবং বিশ্বাস রাখবে যে, আল্লাহ তায়ালার সব প্রতিশ্রুতি সত্য এবং তিনি সব নেককাজের জন্য উত্তম বদলা দেবেন, তার জীবনের সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। রাসূলে আকরাম সা: ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে রোজা রাখবে, তার অতীত জীবনের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।

মাহে রমজানুল মোবারকে একজন মুসলমানকে নিজের সাধারণ জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত ও আনুগত্যে এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনের ওপর বিশেষ জোর দিতে হয়। আল্লাহর ইবাদতে সাধনার সাথে কিছু বিধিনিষেধসহকারে পালন করতে হয় দিন রাতের কর্মসূচি। তার পর ফলস্বরূপ মহান প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। এ সন্তুষ্টির একটি তাৎক্ষণিক আলামত ঈদুল ফিতরের পুরস্কার। এই ঈদকে বলা হয় ঈদুল ফিতর।

এ দিনটি আগমন করে আনন্দ ও ইবাদত এবং স্বস্তি ও গ্রহণযোগ্যতা উভয়কে সাথে নিয়ে। এ দিনে থাকে পার্থিব ও পরকালীন উভয় দিক দিয়ে আনন্দের সামগ্রী। এক দিকে সে লাভ করে নিজের বৈধ পছন্দ ও চাহিদানুযায়ী জীবনযাপনের স্বাধীনতা। অন্য দিকে পুরো এক মাস আনুগত্য, বাধ্যতা ও ইবাদতের পুরস্কারের সিদ্ধান্ত হয় এবং তাকে রোজার পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এই হিসাবে ঈদের রাতকে লাইলাতুল জায়েজা বা পুরস্কারের রাত নামে আখ্যায়িত করা হয়। রমজানের রোজা যে ব্যক্তি যথানিয়মে পালন করে, রমজান তাকে এমন পবিত্রতা দান করে, যা তার সারা বছরের জন্য বরকত ও রহমতের পাথেয় হয় এবং বছর ঘুরে আবার এই বরকতময় মাস আসে। তখন কল্যাণ ও মহিমার এ কর্মসূচি আবার পালনের সুযোগ হয়।

রমজানের সিয়াম পালনের প্রথম পুরস্কার ঈদুল ফিতরের আনন্দ এবং প্রকৃত পুরস্কার মহান প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জন ও তার পক্ষ থেকে বিশেষ প্রতিদান। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনায় নিয়োজিত থাকার পর তাতে সমাপ্তি ঘটানো ও দিনের বেলায় পানাহারের স্বাভাবিক নিয়মে ফিরে যাওয়া উপলক্ষে আনন্দ উপভোগের ব্যবস্থা দিয়েছে ইসলামী শরিয়ত। এটা শুধু অনুমতি নয়, বরং অনেকটা বাধ্যতামূলক নির্দেশ। কেননা শাওয়ালের প্রথম দিনে রোজা রাখাই নিষিদ্ধ। দুই ঈদের দিনে পানাহার করা ও আল্লাহর নিয়ামতের স্বাদ গ্রহণ করা অবশ্য পালনীয় করার তাৎপর্য অনেক।

প্রতিটি জাতিগোষ্ঠী নির্দিষ্ট দিনে আনন্দ করে থাকে। ইসলামে ঈদের খুশি শুধু ধনীরা পাবে তা নয়, বরং গরিব-অসহায়রাও ঈদের খুশি ভোগ করবে। তাই ঈদুল ফিতরের সময় ধনীদের ওপর সাদাকাতুল ফিতর আবশ্যক করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালার অপার রহমত ও অনুগ্রহের অধিকারী হওয়ার এবং পাপরাশি থেকে পাকসাফ হয়ে ঈদের আনন্দ ভোগের সুসংবাদ ঘোষণা হতে থাকে রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে।

ঈদের দিনটি আমাদের জন্য আনন্দের দিন। মনের সব কালিমা দূর করে, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে, মান-অভিমান বিসর্জন দিয়ে সবাই হাতে হাত মেলানো, বুকে বুক মেলানো, গলায় গলা মেলানো অর্থাৎ সবার দেহ-মন এক হওয়ার আনন্দ হলো ঈদের আনন্দ; নিজের মনের হিংসা, ঘৃণা, লোভ, অহঙ্কার, অহমিকা, আত্মম্ভরিতা, আত্মশ্লাঘা, ক্রোধ, বিদ্বেষসহ যাবতীয় কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজেকে মুক্ত করার আনন্দ। সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতির আনন্দ। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তার সুসংবাদের অধিকারী করুন। প্রকৃত খুশি ও উভয় জগতের কল্যাণ আমাদের নসিব করুন। সবাইকে ঈদ মোবারক।