আলজাজিরা
ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড বিশ্বমঞ্চে দেশটির এক ভিন্ন রূপ উন্মোচন করেছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে বেন-গভির কি কেবলই কট্টরপন্থী একদল ইহুদির প্রতিনিধি, নাকি তিনি বর্তমান ইসরাইলি ব্যবস্থারই প্রকৃত প্রতিচ্ছবি ?
সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেয়া এক বক্তব্যে বেন-গভির সাফ জানান, ইসরাইলের স্বার্থের পরিপন্থী হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তি তিনি সফল হতে দেবেন না। এর পাশাপাশি ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র আন্দোলনকর্মীদের ওপর তার হেনস্তামূলক আচরণের দৃশ্য টেলিভিশনে প্রচারিত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। উগ্র ডানপন্থী দল ‘জিউইশ পাওয়ার পার্টি’র এই নেতাকে এত দিন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোটে একজন ‘বিচ্ছিন্ন’ বা ব্যতিক্রমী চরিত্র হিসেবে দেখানো হতো। এই কৌশলের কারণে ইসরাইলের কট্টরপন্থীদের অভ্যন্তরীণ সমালোচকেরাও সরকারকে সমর্থন দিয়ে যেতে পেরেছেন এবং বৈশ্বিক নিন্দা সত্ত্বেও বিভিন্ন দেশ ও কোম্পানি ইসরাইলের সাথে বাণিজ্য বজায় রাখার সুযোগ পেয়েছে।
তবে ইউরোপীয় আন্দোলনকর্মীদের প্রতি বেন-গভিরের উপহাসের পর যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা এবং ইসরাইলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও এর কড়া সমালোচনা করেছে। আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হওয়ায় নেতানিয়াহু একে ইসরাইলের ‘মূল্যবোধ ও রীতিনীতির পরিপন্থী’ বলে দাবি করেছেন। অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, বেন-গভির জেনেশুনেই রাষ্ট্রের ক্ষতি করছেন এবং তিনি কোনোভাবেই ‘ইসরাইলের প্রতিচ্ছবি নন’।
তবে বাস্তবতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ভিন্ন কথা বলছে। বিশ্লেষক এবং বামপন্থী ‘হাদাশ’ পার্টির নেসেট সদস্য আয়দা তৌমা-স্লিমানের মতে, বেন-গভির একা নন; প্রশাসন, পুলিশ ও কারাকর্তৃপক্ষের একটি বড় অংশের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতাতেই তিনি নিজের চরমপন্থী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। ২০২২ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই তিনি পুলিশ ও কারাগারের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। ফিলিস্তিনি বন্দীদের অনাহারে রাখা, নির্যাতন এবং এমনকি যৌন হেনস্তার মতো নিষ্ঠুরতার পক্ষেও তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দম্ভোক্তি করেছেন।
রাজনৈতিকভাবে বেন-গভির ও তার সহযোগী কট্টরপন্থী নেতা বেজালেল স্মোট্রিচ বর্তমান জোট সরকারকে টিকিয়ে রাখার মূল শক্তি। গাজায় সামরিক অভিযানের তীব্রতা কমানোর যেকোনো ইঙ্গিতেই বেন-গভির সরকার পতনের হুমকি দিয়ে আসছেন। এ ছাড়া, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর তার উদ্যোগে পশ্চিম তীরের ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হাতে যেভাবে ঢালাও অস্ত্র তুলে দেয়া হয়েছে, তাতে ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা বহুলাংশে বেড়েছে।
ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে আনা একটি মৃত্যুদণ্ড বিল পাসের পর শ্যাম্পেন হাতে তার উদযাপনের ভিডিও বিশ্বজুড়ে নিন্দিত হয়েছে। ইসরাইল সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভি বিষয়টিকে আরো গভীরভাবে দেখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক সমাজ কেবল বেন-গভিরের বাচনভঙ্গি ও ভিডিও নিয়ে ব্যস্ত, কিন্তু গাজা, পশ্চিম তীর বা লেবাননে ইসরাইলের মূল নীতি ও বন্দীদের ওপর চলমান নির্যাতন নিয়ে আসল প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও ইসরাইলের অভ্যন্তরে বেন-গভিরের জনসমর্থন বেশ মজবুত। ভোট বিশ্লেষক ডালিয়া শিন্ডলিনের মতে, আদর্শিক দিক থেকে বেন-গভিরের অবস্থান ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির অনেক নেতার চেয়ে খুব একটা আলাদা নয়। তিনি মূলত এমন এক ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদী জনতাবাদী রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করেন, যার সমর্থকেরা বিশ্বাস করে- শক্তি প্রয়োগ এবং ফিলিস্তিনিদের অপদস্থ করার মাধ্যমেই কেবল নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।



