আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জমে উঠেছে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসন ঢাকা-১৮ (উত্তরা, দক্ষিণখান, উত্তরখান, খিলক্ষেত ও তুরাগ)। নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। এই আসনে গতানুগতিক রাজনীতির বাইরে গিয়ে তরুণ ও স্বচ্ছ ভাবমর্যাদার প্রার্থী হিসেবে ভোটারদের নজর কেড়েছেন আরিফুর ইসলাম আদিব। আধুনিক ঢাকা গড়ার প্রত্যয় এবং দীর্ঘ দিনের নাগরিক দুর্ভোগ নিরসনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে তিনি চষে বেড়াচ্ছেন নির্বাচনী মাঠ। প্রচারণা ঘিরে হামলা, বাধা ও ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ থাকলেও তার দাবি- জনতার জোয়ারের কাছে এসব কিছুই টিকবে না। আরিফুর বলছেন, এই নির্বাচন কেবল একটি আসনের লড়াই নয়; বরং নাগরিক মর্যাদা ও সাহসের পক্ষে জনতার রায়ের পরীক্ষা।
দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি নির্বাচনী ভাবনা, প্রচারণার অভিজ্ঞতা এবং ঢাকা-১৮ নিয়ে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
নয়া দিগন্ত : নির্বাচনী প্রচারণার একেবারে শেষ মুহূর্ত চলছে। কেমন সাড়া পাচ্ছেন সাধারণ ভোটারদের কাছ থেকে?
আরিফুর ইসলাম আদিব : আলহামদুলিল্লাহ, অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি। বিশেষ করে নারী ও তরুণ ভোটার এবং সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে একধরনের জাগরণ দেখতে পাচ্ছি। মানুষ আর পুরাতন ও অকার্যকর প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করতে চায় না। তারা পরিবর্তন চায়, তারা চায় এমন একজন প্রতিনিধি যে তাদের ভাষায় কথা বলবে, তাদের বিপদে পাশে থাকবে। উত্তরা ও এর আশপাশের এলাকার মানুষ দীর্ঘকাল ধরে জিম্মি দশা থেকে মুক্তি চায়। আমি যখন তাদের দুয়ারে যাচ্ছি, তারা আমাকে সন্তান বা ভাই হিসেবে গ্রহণ করছেন। আশা করি, এই আসনে শাপলা কলির জোয়ার হবে।
নয়া দিগন্ত : ঢাকা-১৮ আসনটি ভিআইপি এলাকা হিসেবে পরিচিত হলেও নাগরিক দুর্ভোগ এখানে নিত্যসঙ্গী। নির্বাচিত হলে কোন সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার দেবেন?
আরিফুর ইসলাম আদিব : দেখুন, উত্তরার মূল সেকশনগুলো কিছুটা গোছানো মনে হলেও দক্ষিণখান, উত্তরখান বা খিলক্ষেতের ভেতরের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। আমার প্রথম অগ্রাধিকার হবে ‘জলাবদ্ধতা নিরসন ও ড্রেনেজ-ব্যবস্থার আধুনিকায়ন’। সামান্য বৃষ্টিতেই এখানকার অনেক এলাকা তলিয়ে যায়, যা মেনে নেয়া যায় না। দ্বিতীয়ত, ‘চাঁদাবাজমুক্ত ব্যবসাবাণিজ্য’ নিশ্চিত করা। আমি আমার প্রচারণায় বারবার বলেছি, ব্যবসায়ীরা যদি শান্তিতে ব্যবসা করতে না পারেন, তাহলে এলাকার উন্নয়ন সম্ভব নয়। ফুটপাথ থেকে শুরু করে বড় মার্কেট কোথাও কোনো চাঁদাবাজি চলতে দেয়া হবে না। তৃতীয়ত, ‘স্মার্ট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট’। বিমানবন্দর সড়ক থেকে শুরু করে ভেতরের সংযোগ সড়কগুলোতে যানজট নিরসনে আমরা আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ও বিকল্প রাস্তা ব্যবহারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব।
নয়া দিগন্ত : প্রচারণার মাঠে বাধার সম্মুখীন হওয়ার কোনো অভিযোগ আছে কি? সাম্প্রতিক সময়ে আমরা কিছু উত্তেজনার খবরও সংবাদমাধ্যমে দেখেছি। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?
আরিফুর ইসলাম আদিব : নির্বাচন মানেই প্রতিযোগিতা; কিন্তু সেটি যখন প্রতিহিংসায় রূপ নেয়, তখন তা দুঃখজনক। আমাদের প্রচারণায় বেশ কয়েকবার বাধা দেয়া হয়েছে, হামলা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় আমার পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। আমার নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। বিশেষ করে আমার প্রতিপক্ষ পুরনো রাজনৈতিক শক্তির অনেকেই তরুণদের এই উত্থানকে সহজভাবে নিতে পারছেন না। তাই তারা এই ন্যক্কার জনক পথ বেছে নিয়েছেন। তবে আমি বা আমার কর্মীরা এতে বিচলিত নই। সাধারণ জনগণ আমাদের ঢাল হিসেবে আছে। আমরা সঙ্ঘাত চাই না। জনগণ তাদের ব্যালটের মাধ্যমে এর যোগ্য জবাব দেবে। প্রশাসনকে আমরা বিষয়গুলো জানিয়ে আসছি; কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে সেভাবে তেমন কোনো অ্যাকশন দেখিনি। তারপরেও আশা করছি, সামনে তারা সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়তা করবেন।
নয়া দিগন্ত : তরুণ ভোটাররাই এবার নির্বাচনের ‘গেম চেঞ্জার’ হতে পারে। তাদের জন্য আপনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কী?
আরিফুর ইসলাম আদিব : আমি নিজে একজন তরুণ। আমি বুঝি বর্তমান প্রজন্মের হতাশা এবং স্বপ্নগুলো কোথায়। আমার ইশতেহারে ‘ইয়ুথ এমপাওয়ারমেন্ট’ বা তরুণদের ক্ষমতায়ন একটি বড় অংশজুড়ে আছে।
ফ্রিল্যান্সিং হাব : ঢাকা-১৮ আসনে আমরা সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে একাধিক আধুনিক ‘আইটি ইনকিউবেটর’ বা ফ্রিল্যান্সিং হাব তৈরি করব ।
খেলাধুলা ও সংস্কৃতি : কিশোর গ্যাং কালচার দূর করতে হলে খেলার মাঠ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের বিকল্প নেই। বেদখল হওয়া মাঠগুলো উদ্ধার করে তরুণদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। কর্মসংস্থান : স্থানীয় শিল্প ও বাণিজ্যে স্থানীয় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
নয়া দিগন্ত : আপনি বলছেন পরিবর্তনের কথা; কিন্তু ভোটাররা অতীতেও অনেক প্রতিশ্রুতি শুনেছেন। আপনাকে কেন তারা বিশ্বাস করবেন?
আরিফুর ইসলাম আদিব : কারণ আমি নেতা হতে আসিনি, আমি সেবক হতে এসেছি। এলাকার অনেক ভোটার থেকে শুনেছি অতীতে যারা নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের অনেকেই নির্বাচনের পর এলাকায় চেহারাও দেখাননি। তারা ছিলেন কাচঘেরা গাড়ির বাসিন্দা। আর আমি এই ধুলোবালির পথের মানুষ। আমার সততাই আমার শক্তি। কেউ বলতে পারবে না আমি কারো এক টাকা মেরে খেয়েছি বা কারো জমি দখল করেছি। মানুষ এখন আর কথায় নয়, কাজে বিশ্বাস করে। আমার অতীত কর্মকাণ্ডই আমার গ্যারান্টি। আমি ভোটারদের বলছি, আপনারা আমাকে পাঁচ বছরের জন্য লিজ দিচ্ছেন না; বরং আপনাদের আমানত রক্ষার দায়িত্ব দিচ্ছেন। নারী ও তরুণ ভোটার থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি। সেই আমানত আমি জীবনের বিনিময়ে হলেও রক্ষা করব।
নয়া দিগন্ত : ভোটারদের উদ্দেশে আপনার শেষ বার্তা কী?
আরিফুর ইসলাম আদিব : আমার বার্তা খুব পরিষ্কার- আপনার একটি ভোট আগামী পাঁচ বছরের জন্য আপনার এলাকার ভাগ্য নির্ধারণ করবে। আবেগের বশবর্তী হয়ে বা ভয় পেয়ে ভোট দেবেন না। যাকে দিয়ে আপনার এলাকার উন্নয়ন সম্ভব, যিনি সুখে-দুঃখে আপনার পাশে থাকবেন, তাকেই বেছে নিন। আমি আপনাদের সন্তান, আমাকে সেবা করার সুযোগ দিন। আমি কথা দিচ্ছি, ঢাকা-১৮ আসনকে একটি মডেল জনপদ হিসেবে গড়ে তুলব ইনশা আল্লাহ। ঢাকা-১৮ আসন এবারের নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই আসনে ডিএনসিসি ওয়ার্ড ১, ১৭ এবং ৪৩-৫৪ এবং উত্তরা, তুরাগ, খিলক্ষেত, উত্তরখান ও দক্ষিণখান থানার এলাকা আছে। এটি রাজধানীর উত্তর ও বিমানবন্দর এলাকার বড় জনবহুল অংশ। সর্বশেষ ভোটার তালিকা অনুযায়ী ঢাকা-১৮-এ মোট ভোটার আছে প্রায় ছয় লাখ পাঁচ হাজার ৪০০ জন।
নির্বাচনী হাওয়ায় ঢাকা-১৮ আসনে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। এক দিকে বড় দলের হেভিওয়েট প্রার্থীরা, অন্য দিকে আরিফুর ইসলাম আদিবের মতো তরুণ মুখ- লড়াইটা এবার বেশ জমজমাট। ভোটাররা বলছেন, তারা এবার মার্কা দেখে নয়; বরং প্রার্থীর যোগ্যতা ও বিগত দিনের কর্মকাণ্ড বিচার করেই রায় দেবেন। আগামী নির্বাচনে ব্যালট বাক্সে এই পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।


