কওমি শিক্ষার সংস্কার নিয়ে সরকারের অবস্থানে ক্ষুব্ধ আলেমরা। বিশেষ করে সাম্প্রতিককালে কওমি মাদরাসা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে শিক্ষকদের মধ্যে। তারা অভিযোগ করেছেন সরকার কওমি শিক্ষার সংস্কার করে সনদসর্বস্ব শিক্ষায় রূপান্তর করতে চায়, যা কওমি শিক্ষার স্বকীয়তা ও বিশেষায়িত শিক্ষাকে ধ্বংসের সবচেয়ে বড় কৌশল।
গত ৩ মে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ডিসি সম্মেলনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সেশন শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন বলেন, কওমি মাদরাসাকে নীতিমালার আওতায় এনে মাদরাসা শিক্ষাকে আরো আধুনিক করার বিষয়ে কাজ চলছে। তিনি জানান, কওমি শিক্ষাকে এসএসসি-দাখিল ও এইচএসসি-আলিমের মতো সাধারণ শিক্ষার সমপর্যায়ে আনতে কওমি মাদরাসা প্রতিনিধিদের সাথে তিন দফা আলোচনা হয়েছে। আমরা চাই না তারা আলাদা থাকুক।
শিক্ষামন্ত্রীর কওমি শিক্ষাকে এভাবে সাধারণ শিক্ষার সাথে সমপর্যায়ে আনার বিরোধিতা করছেন কওমি আলেমরা। বিভিন্ন মাদরাসার কওমি শিক্ষকদের সাথে কথা বললে তারা জানান, কওমি আলেমরা এটা চান না। এভাবে সমপর্যায়ে আনলে কওমির স্বকীয়তা নষ্ট হবে। কওমি শিক্ষার সর্বস্তরের সাথে সাংঘর্ষিক অথবা কওমি শিক্ষার মক্তব থেকে দাওরা পর্যন্ত বাধাগ্রস্ত হয় এ পর্যন্ত গৃহীত কোনো আইন বাতিল এবং ভবিষ্যতে করা যাবে না, এই মর্মে দ্বীনি শিক্ষায় আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া কওমি মাদরাসা বিশেষায়িত শিক্ষার মর্যাদা সুরক্ষার আইনসিদ্ধ করতে ২০১৮ সালের ৪৮নং আইনটির আলোকে জাতীয় শিক্ষার সব কারিকুলাম প্রণয়ন করার দাবি জানিয়েছেন তারা। আলেমরা বলেন, ২০১৮ সালে প্রণীত আল-হাইয়াতুল উলয়া লিল জামিয়াতুল কওমিয়ার অধীনে কওমি মাদরাসাগুলোর দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) জামাতের সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রির সমমান প্রদান করা হয়েছে। তবে প্রাথমিক স্তর অর্থাৎ মক্তব, নাজেরা, হেফজ বিভাগ, কিতাব বিভাগের ইবতেদায়ি (প্রথম শ্রেণী) থেকে ধারাবাহিক মিশকাত জামাত পর্যন্ত শ্রেণীগুলো অন্যকোনো নীতি বা আইন দ্বারা যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়- তা নিশ্চিত করে আইনি সুরক্ষা প্রদান করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে রাজধানীর মানিকনগরের মারকাজুস শাইখ আরশাদ মাদানি মাদরাসার মুহতামিম মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী নয়া দিগন্তকে বলেন, কুরআন-সুন্নাহর কোনো সংস্কার নেই। তবে যুগের উপযোগী করে উপস্থাপনা করা যেতে পারে। এ দায়িত্ব পালন করতে পারেন কেবলমাত্র বড় আলেমরা। সরকার যদি তাদের নিয়ে কোনো কমিটি করে পরামর্শ নেয় তাহলে সেটা কওমি আলেমরা মেনে নেবে। সরকার নিজেরা মনমত সংস্কার করলে আলেমরা এটা মেনে নেবে না।
মাদরাসাতুল আতহার আল ইসলামিয়া ঢাকার পরিচালক মাওলানা আব্দুল্লাহ আল মাসথউদ খান বলেন, শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু এটা সরকারিভাবে হলে তা যথাযথ হবে না। বড় মাদরাসার আলেমদের নিয়ে বিশেষ করে হাইয়াতুল উলিয়া ও বেফাককে সরকার দায়িত্ব দিতে পারে। তারা যদি কোনো সংস্কার আনে সেটা আলেমরা মেনে নেবে। সরকার যদি কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে চায় তাহলে তাতে আরো বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে।
রাজধানীর নিউইস্কাটন দিলু রোড মাদরাসার মুহতামিম শাইখুল হাদিস মুফতি সালাহ উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, কওমি মাদরাসার সংস্কারের বিষয়ে কওমি আলেমরাই ভালো বোঝে। অন্য কেউ এটি সঠিকভাবে বুঝবে না। শীর্ষ ওলামায়ে কেরাম যদি সরকারকে প্রস্তাব দিতো তার ভিত্তিতে যদি সরকার সংস্কার করত তাহলে সেটা আলেমদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতো। অন্যথায় সরকারের পক্ষ থেকে এককভাবে কোনো কিছু করলে সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না।
কওমি মাদরাসা শিক্ষক পরিষদের সভাপতি অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, দীর্ঘদিন মজলুম, জুলুম, অত্যাচারের শিকার একটি দল ক্ষমতায় বসেই মন্ত্রিসভা গঠনেই জাতিকে হতাশ করেছে। এ দেশের তৌহিদি জনতার হৃদয়ে রক্তক্ষরণের কারণ হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীরা বিভিন্ন সভা সমাবেশে বলছেন কওমি শিক্ষার সংস্কার করবেন। কওমি শিক্ষাকে মূলধারার শিক্ষার সাথে একীভূত করবেন। কওমি শিক্ষা সংস্কার করে কারিগরি শিক্ষা যুক্ত করে কওমি শিক্ষা সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করবেন। কওমি শিক্ষার প্রতিটি স্তরে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, উচ্চ শিক্ষা, স্কুল, কলেজ, আলিয়া মাদরাসার মতো সনদের স্বীকৃতি প্রদান করবেন। অর্থাৎ কওমি শিক্ষাকে সনদসর্বস্ব শিক্ষায় রূপান্তর করবেন। যা কওমি শিক্ষার স্বকীয়তা ও বিশেষায়িত শিক্ষাকে ধ্বংসের সবচেয়ে বড় কৌশল। তিনি বলেন, কওমির শিক্ষার্থীরা শুধু সার্টিফিকেটের জন্য পড়াশোনা করে না। তারা জাতিকে ইসলামের জ্ঞান প্রদানের কাজ করে। মিজানুর রহমান চৌধুরী আরো বলেন, সরকার যদি কওমি শিক্ষায় কোনো পরিবর্তন আনতে চান মুষ্টিমেয় কয়েকজন দরবারি, পদলোভী আলেমদের মতামতে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
এ দেশে এখনো অনেক কওমি ঘরানার স্কলার, মুহাক্কিক, বুজুর্গ ওলামায়ে কেরাম আছেন। সরকার স্বীকৃত ৬টি বোর্ড আছে। সংস্কারের ক্ষেত্রে তাদের মতামত নিতে হবে। প্রয়োজনে আন্তর্দেশীয় ওলামা বোর্ড গঠন করে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় দেওবন্দি ওলামায়ে কেরামদের মতামত নিতে হবে।



