ইতিহাসের চূড়ায় এমবাপ্পে

Printed Edition
ইতিহাসের চূড়ায় এমবাপ্পে
ইতিহাসের চূড়ায় এমবাপ্পে

ক্রীড়া প্রতিবেদক

রাশিয়ায় ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ফ্রান্স। সেবার গোল্ডেন বুট জয় করেছিলেন ৬ গোল করে ইংল্যান্ডের হ্যারি কেন। কিন্তু সেই আসরে মোট ৪টি গোল করে মাত্র ১৯ বছর বয়সে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সুবাদে টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের (বেস্ট ইয়ং প্লেয়ার) পুরস্কার জিতেছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। এরপর এশিয়ার দেশ কাতারে ২০২২ সালে ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় ৩-৩ গোলে ড্র থাকার পর টাইব্রেকারে হেরেছিল ফ্রান্স। এই আসরে মোট ৮ গোল করে গোল্ডেন বুট নিজের করে নিয়েছিলেন ফরাসি ফরোয়ার্ড। তিন দেশের যৌথ আয়োজনে শেষ হওয়া বিশ্বকাপে শিরোপাস্বাদ না পেলেও ইতোমধ্যে ১০ গোল নিয়ে গোল্ডেন বুট জয়ের তালিকায় সবার ওপরে অবস্থান করছেন এমবাপ্পে।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে একের পর এক গোল করে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম আরো উজ্জ্বল করে তুলেছেন ফরাসি অধিনায়ক। দল শিরোপা জিততে না পারলেও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে তিনি ছাপিয়ে গেছেন অতীতের সব কিংবদন্তিকে। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে উঠে এসেছেন এই ফরাসি তারকা।

বিশ্বকাপের আগে থেকেই এমবাপ্পে ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়ে তিনি জাতীয় দলের জার্সিতেও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখেন। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে নকআউট- প্রতিটি ধাপেই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ভোগান্তিতে ফেলেছে তার গতি, নিখুঁত ফিনিশিং ও অসাধারণ পজিশনিং।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফ্রান্সের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটি ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। থ্রি লায়ন্সদের কাছে ৬-৪ ব্যবধানে লেস ব্লুজরা হেরে গেলেও এমবাপ্পে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান। দ্বিতীয়ার্ধে তার জোড়া গোল ফ্রান্সকে ম্যাচে ফেরানোর আশা জাগিয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত জয় আসেনি, তবু ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকে ম্যাচটি হয়ে থাকবে স্মরণীয়।

মিয়ামির হার্ডরক স্টেডিয়ামে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের প্রথমার্ধে চার গোল হজম করে বিরতিতে যায় ফ্রান্স। দ্বিতীয়ার্ধে ফিরেই জালে বল পাঠিয়ে লিওনেল মেসির দখলে থাকা রেকর্ড স্পর্শ করেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। পরে আরেকটি গোল করে ফ্রান্স অধিনায়ক উঠলেন নতুন উচ্চতায়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড এখন ফরাসি ফরোয়ার্ডের। আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসি করা ২১ গোলকে ছাড়িয়ে গেলেন তিনি (২২)। বিশ্বকাপে এমবাপ্পে ২২ গোল ঠিক ২২ ম্যাচে। মেসি ২১ গোল করেছেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩৩ ম্যাচ খেলে।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুই গোলের সুবাদে চলতি আসরে ১০বার জালের দেখা পেলেন এমবাপ্পে। এখানেও তিনি উঠলেন চূড়ায়। আট গোল করে দুইয়ে ৩৯ বছর বয়সী মেসি। এই গোলসংখ্যা গোল্ডেন বুট জয়ের দৌড়ে সবার ওপরে নিয়ে গেছে ফরাসি ফরোয়ার্ডকে। ফাইনালের আগে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি হলেও এখন পর্যন্ত শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন এমবাপ্পেই। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই এমন কীর্তি ফুটবল ইতিহাসে বিরল।

ফাইনালের মধ্য দিয়ে ইতোমধ্যেই পর্দা নেমেছে বিশ্বকাপের ২৩তম আসরে। শিরোপা নির্ধারণী স্পেনের বিপক্ষে দুই বা ততোধিক গোল যদি পান মেসি, তাহলে গোল্ডেন বুট ও বিশ্বকাপের আসরে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডের মালিক হয়ে যাবেন ইন্টার মিয়ামির অধিনায়ক।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে ব্যক্তিগত রেকর্ড নিয়ে খুব বেশি উচ্ছ্বাস দেখাননি এমবাপ্পে। বরং তিনি বলেন, যেকোনো ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলের হয়ে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা এবং শিরোপার জন্য লড়াই করাই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই মন্তব্যে ফুটে উঠেছে তার দলকেন্দ্রিক মানসিকতা।

ফ্রান্সের এবারের বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়েছে সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে। এরপর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পরাজয় মেনে নিতে হয়েছে। ফলে শিরোপার স্বপ্ন পূরণ না হলেও এমবাপ্পের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স কিছুটা হলেও সান্ত¡না দিয়েছে ফরাসি সমর্থকদের।

ফুটবলবিশ্বে এখন আলোচনা- এমবাপ্পে কোথায় গিয়ে থামবেন? মাত্র ২৭ বছর বয়সেই তিনি বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। সামনে আরো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট এবং সম্ভাব্য আরো একটি বা দু’টি বিশ্বকাপ রয়েছে। তাই তার রেকর্ড ভাঙা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তার গোল করার ক্ষুধা, ধারাবাহিকতা এবং বড় মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করার ক্ষমতা ইতোমধ্যেই ফুটবল ইতিহাসের কিংবদন্তিদের কাতারে পৌঁছে দিয়েছে তাকে।

চতুর্থ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের এক আসরে গোলের দুই অঙ্ক স্পর্শ করলেন এমবাপ্পে। ১৯৭০ সালে ১০ গোল করা জার্মান গ্রেট গার্ড মুলারের পাশে বসলেন তিনি। অবশ্য এক আসরে সর্বোচ্চ গোলদাতার দ্বিতীয় স্থানে আছেন হাঙ্গেরির শানডোর কোচিশ। তিনি ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে মোট ১১টি গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার (গোল্ডেন বুট) সম্মান অর্জন করেছিলেন। এই তালিকায় সবার ওপরে অবস্থান করে এখনো রেকর্ডটিকে নিজের করে রেখেছেন ফ্রান্সের জাস্ট ফঁন্টেইন। ১৯৫৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে মাত্র ৬ ম্যাচ খেলে ব্যক্তিগতভাবে সর্বোচ্চ ১৩টি গোল করেছিলেন ফঁন্টেইন।