কোটা সংস্কারের প্রজ্ঞাপন জারী, সীমিত ইন্টারনেট অব্যাহত গ্রেফতার

Printed Edition

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাত, কারফিউ ও দেশব্যাপী যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মধ্যে ২৩ জুলাই ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। সরকার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের আলোকে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের প্রজ্ঞাপন জারি করে। একই দিনে সীমিত পরিসরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু হয় এবং কারফিউ কয়েক ঘণ্টার জন্য শিথিল করা হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এ দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা নতুন চার দফা দাবি জানিয়ে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন।

২৩ জুলাই সরকার সরকারি চাকরির নবম থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগে নতুন কোটা কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে ৯৩ শতাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে এবং ৭ শতাংশ পদ বিভিন্ন কোটার জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়। সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন করপোরেশনের নিয়োগেও এ বিধান কার্যকর করার কথা বলা হয়। আগের দিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদনের পর এ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, সরকার সর্বোচ্চ আদালতের রায়ই বাস্তবায়ন করেছে এবং এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। একই সাথে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হলে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দেন।

সংবাদ সম্মেলনে জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী এবং তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত উপস্থিত ছিলেন। তারা সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আশ্বাস দেন। শিক্ষামন্ত্রী জানান, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল খুলে দেয়া সম্ভব নয়।

অন্য দিকে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা সরকারের পদক্ষেপকে অপর্যাপ্ত বলে অভিহিত করেন। নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও মাহিন সরকারের উপস্থিতিতে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, কোটা সংস্কারের প্রজ্ঞাপন আন্দোলনের মূল সঙ্কটের সমাধান নয়। আন্দোলন চলাকালে প্রাণহানি ও সহিংসতার দায় সরকারকেই নিতে হবে বলে দাবি করেন তারা।

সমন্বয়করা চার দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো সারাদেশ থেকে কারফিউ প্রত্যাহার, পূর্ণাঙ্গভাবে ইন্টারনেট চালু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক হল খুলে দিয়ে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করা এবং আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও সমন্বয়কদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এসব দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমাও বেঁধে দেয়া হয়।

এ দিকে সহিংসতার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চিরুনি অভিযান আরো জোরদার হয়। পুলিশ ও র‌্যাবের তথ্যানুযায়ী, এক দিনেই প্রায় এক হাজার ১০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকা থেকেই গ্রেফতার হন অন্তত ৫১৭ জন। ১৭ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে গ্রেফতারের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে যায়। রাজধানীতে সংঘর্ষ, হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আরো ৩৮টি মামলা দায়ের করা হয়।

র‌্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, সহিংসতা ও নাশকতার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

তবে মানবাধিকার সংগঠন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, শুধু সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিরাই নন, আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী, তাদের স্বজন এবং বিরোধী দলের নেতাকর্মীদেরও গ্রেফতার ও হয়রানি করা হচ্ছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেন, কাল্পনিক অভিযোগে বিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হচ্ছে।

কারফিউ বহাল থাকলেও ২৩ জুলাই দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক ঘণ্টার জন্য তা শিথিল করা হয়। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে বেলা ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এবং চট্টগ্রামে বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মানুষ বাইরে চলাচলের সুযোগ পান। খুলনায় দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল ছিল। কক্সবাজার, কুমিল্লা, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুর ও পাবনাসহ আরো কয়েকটি জেলাতেও সীমিত সময়ের জন্য বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়।

সরকার একই সাথে পরদিন সীমিত পরিসরে সরকারি অফিস চালু এবং রফতানিমুখী তৈরী পোশাক কারখানার কার্যক্রম শুরু করার সিদ্ধান্ত জানায়।

দিনটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল সীমিত আকারে ইন্টারনেট সেবা আবার চালু হওয়া। টানা ছয় দিন কার্যত বন্ধ থাকার পর রাত ৮টার দিকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু করা হয়। প্রাথমিকভাবে জরুরি সেবা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংযোগ দেয়া হয়। তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক জানান, ধাপে ধাপে ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি স্বাভাবিক করা হবে।

২৩ জুলাই ছিল এক দিকে সঙ্কট নিরসনের উদ্যোগ, অন্য দিকে অনিশ্চয়তার ধারাবাহিকতার দিন। সরকার কোটা সংস্কারের প্রজ্ঞাপন জারি করে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি বাস্তবায়ন করলেও নতুন চার দফা দাবি, চলমান গ্রেফতার অভিযান, কারফিউ এবং সীমিত যোগাযোগ ব্যবস্থা স্পষ্ট করে যে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সঙ্কট তখনো কাটেনি। পরবর্তী দিনগুলোর ঘটনাপ্রবাহের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল মূলত এ দিনের সিদ্ধান্ত ও প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়েই।