বেসরকারি সার্ভিস রুলস প্রণয়নে কোর-কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত

১৫ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত মতামত দেবে মন্ত্রণালয়গুলো

শামছুল ইসলাম
Printed Edition

বেসরকারি চাকরিজীবীদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে একটি যুগোপযোগী ‘বেসরকারি সার্ভিস রুলস’ প্রণয়নের লক্ষ্যে কোর-কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি বাংলাদেশ সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সভায় এ সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো: এহছানুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিধি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং এফবিসিসিআইয়ের প্রতিনিধিরা সদস্য হিসেবে থাকবেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা ও বিভাগীয় প্রধান সদস্য-সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।

সভায় বলা হয়, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বেসরকারি চাকরিজীবীরা যাতে প্রাপ্য ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন সেজন্য বেসরকারি সার্ভিস রুলস প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে চাকরিজীবীদের ন্যূনতম বেতন, বেতন বৃদ্ধি, ভাতা, বোনাস, চাকরিতে যোগদান, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, চাকরির স্থায়ীকরণ, ছুটি, নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ, আচরণবিধি, দুর্নীতির তদন্ত, শৃঙ্খলা, আইনি সুরক্ষা, বিরোধ নিষ্পত্তি, শিশু শ্রম, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, ক্ষতিপূরণ আদায়, চাকরি হতে অপসারণ ইত্যাদি বিষয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন।

সভায় শ্রম অধিদফতরের মহাপরিচালক মো: আবদুছ সামাদ আল আজাদ জানান, বিদ্যমান শ্রম আইন অনুযায়ী মজুরি বা অর্থের বিনিময়ে নিযুক্ত দক্ষ, অদক্ষ, কায়িক, কারিগরি, ব্যবসা উন্নয়নমূলক অথবা করণিক কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শ্রমিক হিসেবে গণ্য হন এবং তারা ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬’-এর আওতাভুক্ত। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সার্ভিস রুলস বিদ্যমান রয়েছে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান নিজস্ব সার্ভিস রুলস প্রণয়ন করতে চায় তাহলে বিদ্যমান আইনি কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে সংশ্লিষ্ট সংস্থা নিজস্ব সার্ভিস রুলস প্রণয়ন করতে পারে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) মহাসচিব (ভারপ্রাপ্ত) ড. এ কে এম আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী বলেন, বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি সুসংহত সার্ভিস রুলস সময়ের দাবি। বিদ্যমান শ্রম আইন বেসরকারি সব সেক্টরে প্রয়োগ করা যায় না। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান আইন মোতাবেক চাকরির শর্তাবলি, নিয়োগ, পদোন্নতি, বেতন কাঠামোসহ অন্যান্য বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকায় কর্মচারীদের প্রাপ্য ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা আদায় করা কঠিন। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) অতিরিক্ত মহাসচিব মো: সাইদুল ইসলাম বলেন, বিদ্যমান বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব চাকরির রুলসে চাকরিজীবীদের সুযোগ-সুবিধা শ্রম আইনে উল্লিখিত সুযোগ-সুবিধার তুলনায় কম হতে পারবে না। বেসরকারি খাতের প্রতিটি সেক্টরের কাজের ধরন, প্রকৃতি ও সক্ষমতা ভিন্নতর হওয়ায় সব সেক্টরের জন্য একটি অভিন্ন বিধিমালা বাস্তবায়ন করা জটিল হবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (বিআইএম) মহাপরিচালক মো: সলিম উল্লাহ সভায় ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, চীন, মালয়েশিয়া এবং ভিয়েতনামের শ্রম আইনের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। বর্ণিত দেশগুলোর শ্রম সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালার সাথে বাংলাদেশের শ্রম আইনের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে বিদ্যমান শ্রম আইনের কোনো অসঙ্গতি বা সীমাবদ্ধতা থাকলে তা চিহ্নিত করে একটি যুগোপযোগী, মানসম্পন্ন ও গ্রহণযোগ্য বেসরকারি সার্ভিস রুলস প্রণয়ন করা সম্ভব হবে।

যুব উন্নয়ন অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. গাজী মো: সাইফুজ্জামান বলেন, বেসরকারি চাকরিজীবীদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাংলাদেশ শ্রম আইন পর্যাপ্ত নয় বিধায় একটি পৃথক সার্ভিস রুলস প্রণয়ন করা অপরিহার্য। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো: জহিরুল ইসলাম বলেন, দেশের প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়/বিভাগের অধীনে কোনো না কোনো বেসরকারি সেক্টর রয়েছে। তাই বিধি প্রণয়নের বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় এককভাবে সম্পন্ন করবে নাকি সমন্বিত উদ্যোগে তা করা হবে, এটি স্পষ্ট করা দরকার।

সমাজসেবা অধিদফতরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শাহ মোহাম্মদ মাহবুব বলেন, বেসরকারি সংস্থাগুলোর চাকরিজীবীদের সুযোগ-সুবিধা না দিলে তাদের প্রাপ্য অধিকার ক্ষুণœ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শিশু শ্রম নিরসন এবং প্রতিবন্ধীদের সুযোগ-সুবিধা প্রদানে বেসরকারি সেক্টর অনেক ক্ষেত্রে অনীহা প্রকাশ করে। কর্মরত শ্রমিকের অসুস্থতাজনিত কারণে শারীরিক বা মানসিক অক্ষমতায় অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুতি, প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত করা ইত্যাদি নানা ঘটনা ঘটে। বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি জটিলতা নিরসনে একটি সমন্বিত বেসরকারি সার্ভিস রুলস প্রণয়ন করা আবশ্যক বলে মনে করেন তিনি।

নিম্নতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান (সিনিয়র জেলা জজ) মামুনুর রশিদ বলেন, দেশের সামগ্রিক কর্মসংস্থানের একটি বিশাল অংশ বেসরকারি খাতের অন্তর্ভুুক্ত। অনেক বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানে কাঠামো ও পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে শ্রমিক-কর্মচারীরা তাদের আইনগত অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন। বিশেষ করে নিয়োগ, পদোন্নতি, বেতন কাঠামো নির্ধারণ, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, ছুটি, শৃঙ্খলা এবং বিরোধ নিষ্পত্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত)’ এবং ‘বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫’-এর বিধানগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালার মৌলিক ধারা ও শর্তগুলো অক্ষুণœ রেখে একটি অভিন্ন ‘বেসরকারি সার্ভিস রুলস’ প্রণয়ন করা যেতে পারে, যা বেসরকারির খাতের শৃঙ্খলা ও কর্মীদের ন্যায্য অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মিজ শায়লা শার্মিন জামান বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সব ক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সঠিকভাবে মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রদান করা হয় না। পর্যাপ্ত ডে-কেয়ার সেন্টার ও ব্রেস্ট ফিডিং কর্নারের সুবিধা থাকে না।

এফবিসিসিআইয়ের মহাসচিব মো: আলমগীর বলেন, বেসরকারি খাতের সব প্রতিষ্ঠান বা শিল্পের ধরন একরকম নয়। বিদ্যমান ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬’ এবং ‘বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫’ এর কাঠামোর মধ্যে থেকে সংশ্লিষ্ট সেক্টরগুলোর সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে একটি পৃথক বিধিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে। বেসরকারি খাতের শ্রমজীবীদের সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা না থাকা এবং এ ক্ষেত্রে সংস্থা/প্রতিষ্ঠান প্রধানদের অসহযোগিতা অন্যতম সমস্যা বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্মসচিব মো: আসাদুজ্জামান বলেন, বিদ্যমান ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬’ এবং ‘বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫’-এর সাথে প্রস্তাবিত ‘বেসরকারি সার্ভিস রুলস’ সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত।

সভায় তিনটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রথমত, বিদ্যমান শ্রম আইন ও বিধিমালায় কোনো সংশোধন বা সংযোজন প্রয়োজন কি না, তা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে পত্র দেয়া হবে। দ্বিতীয়ত, প্রস্তাবিত সার্ভিস রুলস প্রণয়নে কোর-কমিটি গঠন করা হবে। তৃতীয়ত, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত মতামত কমিটির কাছে জমা দেবে।