নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে ভোক্তাবান্ধব হিসেবে আখ্যায়িত করেছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। তবে বাজেটে ঘোষিত বিভিন্ন কর ছাড়, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে কি না, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে সঠিক বাস্তবায়ন ও কার্যকর তদারকির ওপর বলে মনে করছে সংগঠনটি।
গতকাল বাজেট-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন এ মন্তব্য করেন। ক্যাবের তথ্য কর্মকর্তা আনোয়ার পারভেজ গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটির এ অবস্থান তুলে ধরেন।
প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর কর হ্রাস, তামাকজাত পণ্যে কর বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম আমদানিতে কর ছাড় এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ। এসব উদ্যোগ এক দিকে যেমন জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সহায়ক হতে পারে, অন্য দিকে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায়ও ভূমিকা রাখবে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, কর ছাড় বা প্রণোদনার সুবিধা সবসময় ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছায় না। ফলে বাজেটে ঘোষিত সুবিধাগুলোর বাস্তব প্রতিফলন নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
এস এম নাজের হোসাইন বলেন, অতীতে বিভিন্ন পণ্যে কর কমানো হলেও বাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। বরং কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কর সুবিধার সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করেছে। ফলে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির মতো ঘটনা ঘটেছে। এ পরিস্থিতি এড়াতে বাজার ব্যবস্থাপনা ও তদারকি জোরদার করার পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা সরকারি নীতির বাইরে গিয়ে কোনো অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন কি না- তা কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে।
তিনি কনটেন্ট নির্মাতা ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কর সুবিধার উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেন। তারমতে, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখন ডিজিটাল অর্থনীতির সাথে যুক্ত। কর কাঠামো সহজ ও বাস্তবমুখী করা হলে তারা আরো বেশি আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে উৎসাহিত হবে। একই সাথে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ ও প্যাকেজভিত্তিক কর ব্যবস্থা চালু করা গেলে রাজস্ব আদায়ের পরিধিও বাড়বে। অনেক মানুষ কর দিতে আগ্রহী হলেও জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে কর ব্যবস্থার বাইরে থেকে যান বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাজেটে ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব নাগরিকদের জন্য ট্রেন, মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর ছাড় ও বিশেষ সুবিধার প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে ক্যাব। সংগঠনটির মতে, এ ধরনের উদ্যোগ সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করবে এবং প্রবীণ নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক হবে। তবে বাস্তবে এসব সুবিধা যাতে হয়রানি ছাড়া ভোগ করা যায়, সে জন্য প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর অব্যাহতি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের নিবন্ধন ও নবায়নে কর হ্রাসের উদ্যোগেরও প্রশংসা করেছে ক্যাব। সংগঠনটির মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সৌরশক্তির বিস্তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে স্বাগত জানিয়ে ক্যাব বলেছে, বরাদ্দ বাড়ানো অবশ্যই ইতিবাচক; তবে বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, সেটিই মূল বিষয়। অতীতে অনেক ক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও সেবার মানে প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাকে আরো সহজ, স্বচ্ছ ও ভোক্তাবান্ধব করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছে সংগঠনটি। ক্যাব মনে করে, কর প্রশাসনে জটিলতা ও হয়রানি কমানো গেলে রাজস্ব আদায় বাড়ার পাশাপাশি করদাতাদের আস্থাও বাড়বে।
একই সাথে বাজেট বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে ক্যাব। সংগঠনটির মতে, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে দলীয় বা গোষ্ঠীগত প্রভাব থাকলে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বাজেট নিয়ে কিছু হতাশার কথাও তুলে ধরেছে ভোক্তাদের এই সংগঠন। ক্যাবের মতে, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্যক্রম আরো শক্তিশালী করতে বাড়তি বরাদ্দ প্রয়োজন ছিল। এ ছাড়া আয়করমুক্ত সীমা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত না বাড়ানো, নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি সম্প্রসারণ না করা এবং শহুরে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর আবাসন ও গণপরিবহন খাতে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেয়ার বিষয়েও হতাশা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।
ক্যাব আশা প্রকাশ করেছে, বাজেটে ঘোষিত জনকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে সাধারণ ভোক্তা, কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। একই সাথে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি বাড়বে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি আরো শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে।


