- মনিপুরে আ’লীগের দেড় দশকে ৬০২ কোটি টাকা লুট
- ভিকারুননিসায় এপিএস সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন
- আইডিয়ালে পরীক্ষা ফি বাবদ হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে ৩ কোটি টাকা
একসময় সারা দেশের অভিভাবকদের কাছে স্বপ্নের গন্তব্য ছিল ঢাকার তিনটি নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- বেইলি রোডের ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং মিরপুরের মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ। কিন্তু নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণে সেই সুখ্যাতিতে এখন ব্যাপক ভাটা পড়েছে। গত কয়েক দিনে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিষ্ঠান তিনটি নিয়ে একের পর এক নেতিবাচক খবর প্রকাশিত হওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে শিক্ষার মান ও পরিবেশ নিয়ে গভীর সন্দেহ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র এবং শিক্ষক ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকে প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা, নিয়োগ-সংক্রান্ত প্রশ্ন, আর্থিক অনিয়ম এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের নানা তথ্য উঠে এসেছে।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ
মেয়েদের জন্য অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে নিয়োগ-বাণিজ্য ও নানা অনিয়মের অভিযোগে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এবং একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্য, ভর্তি-বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তি- যিনি প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি- তার এপিএস মীর সোলায়মানের প্রভাবেই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, মীর সোলায়মান ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের ভগ্নিপতি সাজ্জাদ হোসেন মোল্লাকে অ্যাডহক কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং পরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগমকে প্রভাবিত করে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। শিক্ষকদের অনেকে জানিয়েছেন, তারা বিভিন্ন সময় নানাভাবে চাপ ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগমের বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তদন্ত চলছে।
নিয়োগ জালিয়াতির অভিযোগও কম গুরুতর নয়। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডি সংক্রান্ত প্রবিধানমালা ২০০৯-এর ৪১(২)(খ)৪ ধারা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১০ জানুয়ারি ২০২৪-এর নীতিমালা অনুযায়ী, নিয়মিত গভর্নিং বডি ছাড়া কোনো অ্যাডহক কমিটি নিয়োগ দিতে পারে না। তবে এই বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে গত ২২ এপ্রিল কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই জান্নাতুল ফেরদৌস শিলা, বাদরুল আলম ও মুস্তারি সুলতানাকে সাথে নিয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম কয়েকজন শিক্ষক নিয়োগ দেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষকরা প্রশ্ন তুললে কর্তৃপক্ষ জানায়, সংশ্লিষ্টদের সিভি আগেই জমা ছিল। এ ছাড়া ‘গেস্ট টিচার’ নামে স্কুলে ৪৫ জন এবং কলেজে ৩ জন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি অ্যাডহক কমিটির এক অভিভাবক প্রতিনিধির স্ত্রীকেও খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার খবর প্রকাশ পেয়েছে।
প্রশাসনিক অস্বচ্ছতার আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় কমিটির মেয়াদ সংক্রান্ত বিষয়ে। ঢাকার বিভাগীয় কমিশনারের প্রতিনিধি হিসেবে ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর প্রথম দফায় প্রতিষ্ঠানটির সভাপতির দায়িত্ব পান মো: ইসমাইল জবিউল্লাহ। পরে ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ তাকে ছয় মাসের জন্য অ্যাডহক কমিটির সভাপতি নিয়োগ দেয় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড, যার মেয়াদ শেষ হয় ২৫ সেপ্টেম্বর। অভিযোগ রয়েছে, মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বোর্ড নতুন কাউকে দায়িত্ব না দিলেও তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করে যান- যা নিয়ম লঙ্ঘনের শামিল বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। পরে ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি আবার ছয় মাসের জন্য তাকে অ্যাডহক কমিটির সভাপতি নিয়োগ দেয়া হয়, যার মেয়াদ শেষ হবে আগামী ১৫ জুলাই।
এসব অনিয়মের বিষয়ে সোমবার সন্ধ্যায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম এই প্রতিবেদককে বলেন, “প্রতিষ্ঠানের কোনো অনিয়মের খবর আমি জানি না। যদি কোনো অনিয়ম হয়েও থাকে তাহলে আমি তখন ছিলামই না। এসব বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। এর বেশি কিছু জানতে চাইলে অফিসে এসে কথা বলবেন।”
মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ
মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের (ডিআইএ) তদন্ত ও অডিটে উঠে এসেছে ২০১০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে মোট ৬০২ কোটি টাকার অনিয়ম ও লুটপাটের চিত্র। এর মধ্যে ৫৫২ কোটি টাকার সরাসরি অনিয়ম ও লুটপাট এবং প্রায় ৫০ কোটি টাকার ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি রয়েছে। ১৪০ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনটি ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে জমা দেয়া হয়েছে।
ডিআইএ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৬ বছরে বিধিবহির্ভূতভাবে শিক্ষক-কর্মচারীদের একাডেমিক উন্নয়ন ভাতা ও নগর ভাতা বাবদ ৮৭ কোটি ৯৪ লাখ ৮৭ হাজার ১৬৪ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ইব্রাহীমপুর শাখা থেকে আদায়কৃত অর্থের মধ্যে ৬৬ লাখ ৫৩ হাজার ৪৭০ টাকা সাধারণ তহবিলে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। ক্যান্টিন ভাড়া বাবদ ৭৯ লাখ ২০ হাজার টাকা আদায় করা হলেও তা তহবিলে জমা দেয়া হয়নি। ২০০৯-১০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত নির্মাণ, মেরামত ও উন্নয়ন খাতে ৪৩৬ কোটি ১২ লাখ ৮ হাজার ৪৪২ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও এর কোনো ভাউচার, ব্যয়ের প্রক্রিয়া বা গভর্নিং বডির অনুমোদনের রেজ্যুলেশন পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রিন্টিং প্রেস থাকা সত্ত্বেও মুদ্রণ খাতে ১১ কোটি ৪৩ লাখ ৭৭ হাজার ৭১২ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে, যা আত্মসাৎ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
কর ফাঁকির বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯-১০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত রাজস্ব খাতে মোট ৩৬ কোটি ৭৫ লাখ ৪২ হাজার ৩৪৬ টাকা ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। এছাড়া সম্পত্তি ভ্যাট খাতে প্রায় ১৪ লাখ, বিশেষ ক্লাসের সম্মানী ও পরিচালনা কমিটির সম্মানীর আয়কর বাবদ দেড় কোটি, অ্যাডহক কমিটির উন্নয়ন কাজ বাবদ দেড় কোটি এবং পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিল বাবদ ১০ কোটি টাকা আয়কর আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।
প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো: সিরাজুল ইসলামের নিয়োগকেও অবৈধ বলা হয়েছে। তার ক্ষেত্রে চাকরির আবেদন, ডিজি প্রতিনিধির মনোনয়নপত্র, নিয়োগ কমিটি গঠনের রেজ্যুলেশন, সুপারিশসংক্রান্ত রেজুলেশন এবং টেবুলেশন শিট- কোনোটিই পাওয়া যায়নি। এ প্রসঙ্গে মো: সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘অনিয়ম-দুর্নীতি সবই হয়েছে আগের আমলে। প্রতিমন্ত্রী কামাল মজুমদার ট্রাস্ট করতে গিয়ে নানা অনিয়ম করেছেন। এখন মন্ত্রণালয় যেভাবে সিদ্ধান্ত নেবে সেভাবেই আমরা চলব।’
উল্লেখ্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকেরও বেশি সময় তৎকালীন শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে ছিল এই প্রতিষ্ঠানটি। তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে ট্রাস্টের অধীনে নিতে চেয়েছিলেন এবং নিজের মেয়েকে গভর্নিং বডির সভাপতি ও ট্রাস্টের চেয়ারম্যান করেছিলেন। শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, গভর্নিং বডির নির্বাচন ও পরিচালন কাঠামোর স্বচ্ছতা নিয়েও অভিভাবকদের একটি অংশ মানববন্ধন করেছেন এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের নিরীক্ষা শাখায় কয়েক দফায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের আর্থিক অনিয়ম নিয়েও অভিভাবকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সেশন চার্জের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিরুদ্ধে অনেক অভিভাবক লিখিত ও মৌখিকভাবে কর্তৃপক্ষকে জানালেও কোনো প্রতিকার পাননি। উল্লেখ্য, মাউশির বিরুদ্ধে দায়ের করা এক রিটে আদালত রায় দিয়েছিলেন, পুনঃভর্তির ক্ষেত্রে নতুন করে কোনো সেশন চার্জ আদায় করা যাবে না। তবে সেই আদেশ এই প্রতিষ্ঠানটিও মানছে না।
এ ছাড়া নবম ও দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের প্রথম সাময়িক পরীক্ষার ফি বাবদ জনপ্রতি এক হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। মতিঝিল শাখায় মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩০ হাজার। সেই হিসেবে কেবল পরীক্ষার ফি বাবদ প্রায় তিন কোটি টাকা আদায় হচ্ছে, যা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। একই সাথে অ্যাডহক কমিটির মেয়াদ, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তদন্তের উদ্যোগ নেয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ শিক্ষক-দ্বন্দ্ব শিক্ষার পরিবেশকে প্রভাবিত করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে- এমনকি শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের অংশ হিসেবে অভিযোগ তৈরির ঘটনাও সামনে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রওশন জাহান এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘পরীক্ষার ফি আমরা এক টাকাও বাড়াইনি। আগের বছরগুলোতে যে টাকা পরীক্ষার ফি হিসেবে আদায় করতাম, এবারো ঠিক সেই টাকাই নেয়া হচ্ছে। অথচ কাগজের দাম আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।’ অন্যান্য অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি নতুন হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছি। আগের কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়ে থাকলে তার দায় ও জবাব আমি দিতে পারব না।’



