বাজেট অধিবেশনে গঠিত হচ্ছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদের জন্য তৎপর সরকারদলীয় এমপিরা

আলোচনায় সাবেক মন্ত্রী-জ্যেষ্ঠ নেতারা

জাতীয় সংসদের আসন্ন বাজেট অধিবেশনেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সংসদের ওভারসাইট কমিটিসহ মোট ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে ইতোমধ্যে পাঁচটি কমিটি গঠন করা হলেও বাকি মন্ত্রণালয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটিগুলো নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা, হিসাব-নিকাশ ও তদবির। বিশেষ করে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ পেতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটের সংসদ সদস্যদের মধ্যে তৎপরতা বেড়েছে। আলোচনা হচ্ছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোটেও। সংসদ সচিবালয় ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী চূড়ান্ত অনুমোদন দিলে বাজেট অধিবেশনেই এসব কমিটি গঠন করা হতে পারে

কাওসার আজম
Printed Edition

জাতীয় সংসদের আসন্ন বাজেট অধিবেশনেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সংসদের ওভারসাইট কমিটিসহ মোট ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে ইতোমধ্যে পাঁচটি কমিটি গঠন করা হলেও বাকি মন্ত্রণালয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটিগুলো নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা, হিসাব-নিকাশ ও তদবির। বিশেষ করে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ পেতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটের সংসদ সদস্যদের মধ্যে তৎপরতা বেড়েছে। আলোচনা হচ্ছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোটেও। সংসদ সচিবালয় ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী চূড়ান্ত অনুমোদন দিলে বাজেট অধিবেশনেই এসব কমিটি গঠন করা হতে পারে।

সরকারি দলের হুইপ অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু নয়া দিগন্তকে জানান, কমিটির বিষয়টি সরাসরি সংসদ নেতা দেখছেন। আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাধারণত যেসব জ্যেষ্ঠ নেতা মন্ত্রিসভায় স্থান পান না কিংবা জাতীয় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব পান না, তাদের সংসদীয় কমিটির সভাপতি করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মর্যাদা দেয়া হয়। যদিও এসব কমিটির কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই, তারপরও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তদারকি, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, নথিপত্র তলব এবং কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষমতা থাকায় সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যত সরকারের ওপর সংসদের ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে দেখা হয়।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরা শপথ নেয়ার পর বর্তমান সংসদে সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৮ জনে। আরো দু’টি আসনের (চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত বিএনপি দলীয়) বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এই পরিস্থিতিতে সব দল ও জোটের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা একটি খসড়া তালিকা প্রস্তুত করছেন, যা পরে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। অনুমোদনের পর তা সংসদে উপস্থাপন করে কণ্ঠভোটে পাস করা হবে।

জানা গেছে, ইতোমধ্যে সংসদীয় কমিটির সম্ভাব্য সভাপতিদের একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করা হয়েছে। বিএনপির প্রাপ্য ৩৫টি সভাপতির পদ বিবেচনায় রেখে সেখানে অতিরিক্ত কয়েকজনের নাম রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য সভাপতির তালিকায় আলোচনায় রয়েছেন- সাবেক মন্ত্রী আব্দুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবর, আমান উল্লাহ আমান, মজিবর রহমান সরওয়ার, জয়নুল আবদিন ফারুক, সাবেক উপদেষ্টা বরকত উল্লাহ বুলু এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াদুদ ভুঁইয়া। এ ছাড়া সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন- শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা, আলী আসগর লবি, হাফিজ ইব্রাহিম, মঈনুল ইসলাম খান শান্ত, এম নাসের রহমান, মাহবুব উদ্দিন খোকন, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, সরওয়ার জামাল নিজাম, লুতফর রহমান কাজল ও সাচিং প্রু জেরীসহ আরো অনেকে।

জানা যায়, সংসদীয় কমিটিতে স্থান পেতেও চলছে ব্যাপক তদবির। বিশেষ করে নতুন ও নারী সংসদ সদস্যদের অনেকেই নিজেদের পছন্দের মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য যোগাযোগ করছেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে যাওয়ার জন্য অনেকেই চেষ্টা করছেন। হুইপ/চিফ হুইপ অফিস থেকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, কোন সংসদ সদস্য কোন কমিটিতে থাকবেন- সেই সিদ্ধান্ত একমাত্র সংসদ নেতাই নেবেন। দায়িত্বপ্রাপ্তরা কেবল দাফতরিক কাজ করছেন।

জানা যায়, সংসদীয় কমিটির সভাপতিদের সুযোগ-সুবিধাও কম নয়। রাজধানীতে প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীরা গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহার করতে না পারলেও সংসদীয় কমিটির সভাপতিরা গাড়িতে জাতীয় সংসদের পতাকা ব্যবহার করতে পারেন। তাদের জন্য থাকে গানম্যান সুবিধাও। জাতীয় সংসদ ভবনে পূর্ণাঙ্গ অফিস সেটআপ, একজন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে একান্ত সচিব, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাচিবিক সহায়তার জন্য অতিরিক্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়। মাসিক আপ্যায়ন ভাতা হিসেবে বরাদ্দ থাকে ২০ হাজার টাকা। বিদেশ সফর ও সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিশেষ অগ্রাধিকারও পান তারা।

কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী সংসদীয় কমিটি প্রয়োজনে যেকোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তাকে তলব করতে পারে। এমনকি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ফাইলপত্রও চাইতে পারে। সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সদস্য হিসেবে উপস্থিত থাকেন এবং তার মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা দেন। ফলে এসব কমিটির সভাপতিরা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে থাকেন।

সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদে স্থায়ী কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সরকারি হিসাব কমিটি ও বিশেষ অধিকার কমিটি গঠন সাংবিধানিকভাবে বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী অন্যান্য মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কমিটি গঠন করা হয়। দ্বাদশ সংসদে মোট ৫০টি কমিটি ছিল, যার মধ্যে ১১টি সংসদ-সংক্রান্ত এবং ৩৯টি মন্ত্রণালয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটি।

সংসদ সচিবালয়ের তথ্যানুযায়ী, প্রতিটি কমিটিতে সভাপতিসহ ১১ জন সদস্য থাকেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী পদাধিকারবলে সদস্য থাকেন। তবে টেকনোক্র্যাট কোটার মন্ত্রী হলে তিনি সদস্য হতে পারেন না। সংসদ নেতার অনুমোদনে চিফ হুইপের প্রস্তাব অনুযায়ী কমিটি গঠন করা হয়।

এ দিকে জুলাই সনদের আলোকে সরকারি হিসাব কমিটি, সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি, অনুমিত হিসাব কমিটি ও প্রিভিলেজ কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলের সদস্যদের দেয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি সংসদে আসন সংখ্যার অনুপাতে অন্যান্য কমিটির সভাপতির পদ বণ্টনের বিষয়েও বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ প্রায় ৩০টি দল একমত হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল অনুযায়ী বিএনপি জোট পেয়েছে ২২২টি আসন। জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ৬৮ এবং জোটগতভাবে ৭৭টি আসন পেয়েছে। এ ছাড়া স্বতন্ত্র সাতজন ও ইসলামী আন্দোলনের একজন সংসদ সদস্য রয়েছেন। এই হিসাব অনুযায়ী সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপি জোট ৩৬, জামায়াত জোট ১৩ এবং স্বতন্ত্ররা একটি আসন পেয়েছে।

সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদে জামায়াত-এনসিপি জোটও প্রস্তুতি নিচ্ছে। আনুপাতিক হারে তারা ১৪টি কমিটির সভাপতি পেতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। জামায়াতের মধ্যে এ টি এম আজহারুল ইসলাম, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, শাহজাহান চৌধুরী, গাজী নজরুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম খান মিলন, নূরুল ইসলাম বুলবুলসহ বেশ কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে। এনসিপি থেকে আখতার হোসেন ও হাসনাত আব্দুল্লাহ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পেতে পারেন।

অন্য দিকে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা ঐক্যবদ্ধ হলে একটি কমিটির সভাপতির পদ পেতে পারেন।