সাক্ষাৎকার : ড. মো: খালেকুজ্জামান

বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা

Printed Edition

আলী জামশেদ বাজিতপুর

খ্যাতনামা পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বদ্বীপ ভূতত্ত্ব ও উপকূলীয় পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. মো: খালেকুজ্জামান বলেছেন, পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে এগোনোর আগে বাংলাদেশের উচিত শক্তিশালী গঙ্গা চুক্তি নিশ্চিত করা। ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে যে গ্যারান্টি কজ ছিল, সেটি ফিরিয়ে আনতে হবে। ভবিষ্যৎ চুক্তি আদর্শগতভাবে পুরো বছরের জন্য হওয়া উচিত এবং এতে নেপালকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শুধু পানি নয়, পলির প্রবাহ নিয়েও চুক্তিতে সুস্পষ্ট ধারা থাকা প্রয়োজন।

তিনি মনে করেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার সব দেশকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। উজানের সিদ্ধান্ত সরাসরি ভাটির জনগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশকে হাইড্রো-ডিপ্লোম্যাসিকে পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি করতে হবে।

ড. মো: খালেকুজ্জামান নয়া দিগন্তের সাথে এক সাাৎকারে এ কথা বলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েল্থ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার এনভায়রনমেন্টাল, জিওগ্রাফিক্যাল অ্যান্ড জিওলজিক্যাল সায়েন্সেস বিভাগের ভূতত্ত্ব ও সমুদ্রবিজ্ঞানের একজন বিশিষ্ট অধ্যাপক ও গবেষক। ‘ড. কে’ নামে পরিচিত এই গবেষক মূলত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বদ্বীপ ভূতত্ত্ব ও উপকূলীয় পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। বিশেষ করে মেঘনা নদী, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকা, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানিবণ্টন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের নদী ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের সঙ্কট নিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন।

নদীর অবাধ প্রবাহ, ন্যায্য পানিবণ্টন ও টেকসই নদী ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে তার অবস্থান বরাবরই স্পষ্ট। মেঘনাসহ বাংলাদেশের ৫৪টি অভিন্ন নদীর েেত্র সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন। ড. খালেকুজ্জামান মনে করেন, উজানে বড় বাঁধ বা ব্যারাজ নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হলে ভাটির অঞ্চলে পানিসঙ্কট, নাব্যতা সঙ্কট ও পরিবেশগত বিপর্যয় তৈরি হতে পারে।

সম্প্রতি প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প, গঙ্গা চুক্তি, পলি প্রবাহ, মেঘনা অববাহিকার ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তা নিয়েও কথা বলেছেন তিনি।

প্রশ্ন : প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

ড. মো: খালেকুজ্জামান : প্রথমেই বলতে চাই, প্রকল্পটির মূল নাম ছিল- গঙ্গা ব্যারাজ। সেটিই বেশি যথাযথ নাম। কারণ দৌলতদিয়া পর্যন্ত নদীটি গঙ্গা নামেই পরিচিত। পদ্মা ব্যারাজ- নামকরণে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে, গঙ্গার পানিতে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যার প্রশ্নটি আড়ালে চলে যাচ্ছে।

একটি বদ্বীপ টিকে থাকার জন্য উপকূলে পলির প্রবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পলি জমেই নতুন ভূমি তৈরি হয় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবেলা করা সম্ভব হয়। ১৯৬০-এর দশকে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২০০ কোটি টন পলি আসত। বর্তমানে তা ৬০-১০০ কোটি টনের মধ্যে নেমে এসেছে। এর প্রধান কারণ উজানে বিভিন্ন অবকাঠামোগত হস্তপে।

ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের পর বিপুল পরিমাণ পলি সেখানে আটকে যাচ্ছে। এখন যদি রাজবাড়ীর পাংশায় আরেকটি ব্যারাজ তৈরি হয়, তাহলে বর্ষায় যে পলি বাংলাদেশে প্রবেশ করে, তার বড় অংশও আটকে যাবে। এতে ভাটির দিকে পলির সরবরাহ আরো কমে যাবে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র তিগ্রস্ত হবে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কার অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য বড় শিা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ফারাক্কা বিপুল পরিমাণ পলি আটকে দিয়ে নদীর পানি বহনের সমতা কমিয়েছে। এতে জলাবদ্ধতা, বন্যা ও ভাঙন বেড়েছে। মালদহ ও মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে হাজার হাজার পরিবার তিগ্রস্ত হয়েছে। তাই একই নদীব্যবস্থায় বাংলাদেশে আরেকটি ব্যারাজ নির্মাণের আগে বিষয়টি গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন।

প্রশ্ন : ২০২৬ সালে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে পদ্মা ব্যারাজ কতটা বাস্তবসম্মত?

ড. মো: খালেকুজ্জামান : আমার মতে, এটি অত্যন্ত অপরিণত ও তাড়াহুড়ো করে নেয়া সিদ্ধান্ত। ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি পায় না। আমরা ২০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছি, চুক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রায় ৫২ শতাংশ সময় বাংলাদেশ ন্যায্য হিস্যা পায়নি। সবচেয়ে সঙ্কটপূর্ণ সময়ে এই বঞ্চনার হার প্রায় ৬৫ শতাংশ।

বর্তমান চুক্তির বড় দুর্বলতা হলো এতে ন্যূনতম পানির নিশ্চয়তা নেই। ফারাক্কায় প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে গেলে পানি দুই ভাগে ভাগ করা হয়। ফলে পানির প্রবাহ কমে গেলে বাংলাদেশই মূল ঘাটতির শিকার হয়।

আমার মতে, পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে এগোনোর আগে বাংলাদেশের উচিত শক্তিশালী গঙ্গা চুক্তি নিশ্চিত করা। ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে যে গ্যারান্টি কজ ছিল, সেটি ফিরিয়ে আনতে হবে। ভবিষ্যৎ চুক্তি আদর্শগতভাবে পুরো বছরের জন্য হওয়া উচিত এবং এতে নেপালকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শুধু পানি নয়, পলির প্রবাহ নিয়েও চুক্তিতে সুস্পষ্ট ধারা থাকা প্রয়োজন।

প্রশ্ন : তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা থেকে কী শিা পাওয়া যায়?

ড. মো: খালেকুজ্জামান : তিস্তার অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, উজান থেকে নিশ্চিত পানিপ্রবাহ ছাড়া কোনো ব্যারাজ কার্যকর হতে পারে না। দণি-পশ্চিমাঞ্চল ইতোমধ্যেই লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও পানিসঙ্কটে ভোগছে। কিন্তু পদ্মা ব্যারাজ সেই সমস্যার কার্যকর সমাধান নয়।

প্রকল্পে প্রায় তিন বিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পদ্মা বছরে প্রায় ৩৫০-৫২৫ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি বহন করে। সেই তুলনায় এই ধারণমতা অত্যন্ত সামান্য।

আরেকটি বড় দাবি হচ্ছে, এই ব্যারাজের মাধ্যমে ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া সম্ভব হবে। কিন্তু আমার হিসাব অনুযায়ী, এত জমিতে সেচ দিতে ৯ থেকে ২৬ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি লাগবে। সেেেত্র ব্যারাজে যে পানি জমা থাকবে, তা দিয়ে সেচ, নৌচলাচল, পরিবেশগত প্রবাহ ও মৎস্যসম্পদ-সব একসাথে রা করা বাস্তবে সম্ভব নয়।

যদি সব পানি আটকে রাখা হয়, তাহলে পাংশা থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত নদীর অংশে ‘ডাবল ফারাক্কা’ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তিস্তার মতো শুকনো নদী খাতের ঝুঁকিও তৈরি হবে। ব্যারাজ পানি তৈরি করতে পারে না।

প্রশ্ন : তাহলে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তার জন্য কী ধরনের কৌশল গ্রহণ করা উচিত?

ড. মো: খালেকুজ্জামান : বাংলাদেশের উচিত জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ কনভেনশনে যোগ দেয়া এবং সংসদে তা অনুমোদন করা। এতে আন্তর্জাতিক নদী নিয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও আইনি অবস্থান শক্তিশালী হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা । গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার সব দেশকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। উজানের সিদ্ধান্ত সরাসরি ভাটির জনগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশকে হাইড্রো-ডিপ্লোম্যাসিকে পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি করতে হবে। পানি ও পলি বাংলাদেশের অধিকার-এটি কোনো দয়া বা অনুদানের বিষয় নয়।

দেশের অভ্যন্তরেও অনেক কাজ করার সুযোগ আছে। খাল, নদী ও জলাভূমি পুনরুদ্ধার করতে হবে। পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া নদীগুলো ড্রেজিং করতে হবে। ড্রেজিংয়ের মাটি উপকূলীয় নিচু জমি উঁচু করতে বা নির্মাণকাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।

দণি-পশ্চিমাঞ্চলের ছোট নদী ও শাখা নদীগুলোর পুনরুদ্ধারে জোর দিতে হবে। অনেক পোল্ডার আট মাস মেয়াদি বাঁধে রূপান্তর করা যেতে পারে, যাতে বছরের একটি অংশে পানি ও পলি ভেতরে প্রবেশ করতে পারে।

নদীকে খণ্ডিত প্রকল্প হিসেবে নয়, পুরো অববাহিকা ও পরিবেশগত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের পানি ও পরিবেশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।