পুরনো অভিজ্ঞতা, নতুন শঙ্কা

কারা পাবে প্রণোদনার ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল?

দেশের বন্ধ ও সঙ্কটাপন্ন শিল্প-কারখানা পুনরায় চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ২০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন বা প্রি-ফাইন্যান্স স্কিম চালু করেছে। সরকারের প্রত্যাশা, এই তহবিলের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং রফতানি খাত নতুন গতি পাবে। তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে- কোভিড-১৯ মহামারির সময় ঘোষিত বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজের মতো এই তহবিলও কি শেষ পর্যন্ত কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাবে?

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

দেশের বন্ধ ও সঙ্কটাপন্ন শিল্প-কারখানা পুনরায় চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ২০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন বা প্রি-ফাইন্যান্স স্কিম চালু করেছে। সরকারের প্রত্যাশা, এই তহবিলের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং রফতানি খাত নতুন গতি পাবে। তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে- কোভিড-১৯ মহামারির সময় ঘোষিত বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজের মতো এই তহবিলও কি শেষ পর্যন্ত কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাবে?

করোনাকালে অর্থনীতি সচল রাখতে সরকার প্রায় এক লাখ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, রফতানিকারক এবং শ্রমিকদের সহায়তা করা। কিন্তু পরে দেখা যায়, প্রণোদনার বড় একটি অংশ দেশের কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী এবং ব্যাংকিং খাতে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের কাছে চলে গেছে। অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় জামানত, ব্যাংকের অনীহা এবং জটিল প্রক্রিয়ার কারণে সেই সুবিধা পাননি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সেই সময় বিতরণ করা অনেক ঋণ এখনো পুরোপুরি আদায় হয়নি। কিছু প্রতিষ্ঠান প্রণোদনার অর্থ উৎপাদন বৃদ্ধির পরিবর্তে পুরনো দায় পরিশোধ কিংবা অন্য খাতে ব্যবহার করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় সহায়তার প্রকৃত উদ্দেশ্য অনেক ক্ষেত্রে অর্জিত হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, যেসব শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠান আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে কিংবা কার্যকর মূলধনের অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না, তারা এই তহবিল থেকে ঋণ নিতে পারবে। বিশেষ করে রফতানিমুখী শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

নীতিমালায় আরো উল্লেখ করা হয়েছে, খেলাপি ঋণগ্রহীতা, অর্থ পাচার বা জালিয়াতির সাথে জড়িত প্রতিষ্ঠান এবং পূর্বে ঋণ অপব্যবহারের অভিযোগ থাকা ব্যবসায়ীরা এই সুবিধা পাবেন না। ব্যাংকগুলোকে আবেদনকারীদের প্রকৃত প্রয়োজন যাচাই করে ঋণ বিতরণ করতে হবে। ঋণের অর্থ শ্রমিকদের বেতন, কাঁচামাল সংগ্রহ, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল এবং উৎপাদন ব্যয়ের মতো খাতে ব্যবহার করতে হবে। তবে, কাগজে-কলমে এসব শর্ত যথেষ্ট কঠোর মনে হলেও বাস্তবতা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবের কারণে বড় ঋণ অনুমোদিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত উদ্যোক্তার চেয়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বেশি সুবিধা পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশের অনেক বড় শিল্পগোষ্ঠী আর্থিক সঙ্কটে রয়েছে। তাদের অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে নতুন এই তহবিলকে তারা নিজেদের তারল্য সঙ্কট কাটানোর সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। ব্যাংকগুলোরও বড় গ্রাহকদের প্রতি নির্ভরশীলতা থাকায় অনেক সময় প্রকৃত যাচাই ছাড়াই ঋণ অনুমোদনের ঝুঁকি তৈরি হয়। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে যে, অতীতের মতো এবারো তারা পিছিয়ে পড়বেন। দেশের মোট কর্মসংস্থানের বড় অংশ সৃষ্টি করে এসএমই খাত; কিন্তু ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তারাই সবচেয়ে বেশি বাধার মুখে পড়ে। অতিরিক্ত জামানত, দীর্ঘসূত্রতা এবং শাখা পর্যায়ের জটিলতা অনেক উদ্যোক্তাকে ব্যাংক থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।

বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য এই স্কিমে নজরদারির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, ঋণপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় ও আয় সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে। ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে কারখানা পরিদর্শন করতে হবে এবং অর্থের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এমনকি প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কার্যক্রমে ব্যাংকের প্রতিনিধি নিয়োগের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না; তার কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপ উপেক্ষা করে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করতে হবে। ঋণ বিতরণ ও ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা গেলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরো বাড়বে।

খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নতুন তহবিলের সফলতা নির্ভর করবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরিং সক্ষমতার ওপর। যদি যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ বিতরণ করা হয়, তাহলে অতীতের মতোই কিছু গোষ্ঠী বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে যাবে এবং প্রকৃত উদ্যোক্তারা আবারো বঞ্চিত হবেন। এতে বন্ধ শিল্প চালুর লক্ষ্য ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের বোঝা আরো বাড়বে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বিনিয়োগ সঙ্কট, উচ্চ সুদহার এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপের মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ২০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে অতীতের বিতর্কিত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার যদি কঠোর তদারকি, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে এই অর্থও কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- এই তহবিল কি সত্যিই বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবনের হাতিয়ার হবে, নাকি আবারো রাষ্ট্রীয় সহায়তার বড় অংশ চলে যাবে পুরনো বা নতুন কোনো মাফিয়া ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর দখলে? এর উত্তর নির্ভর করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর নজরদারি এবং সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।