আলজাজিরা
দীর্ঘ প্রায় এক দশক পর এক ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফরে চীন পৌঁছেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় ট্রাম্পকে বহনকারী ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ বেইজিংয়ে অবতরণ করলে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। এর আগে ২০১৭ সালে প্রথম মেয়াদে তিনি চীন সফর করেছিলেন। এবারের সফরে ট্রাম্পের সাথে রয়েছেন অ্যাপলের টিম কুক, টেসলার ইলন মাস্ক এবং ব্ল্যাকরকের ল্যারি ফিঙ্কসহ ডজনখানেক প্রভাবশালী মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী, যা দুই দেশের বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক ঘিরে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এই সফরের শুরুতেই বেইজিং তাদের কঠোর অবস্থানের কথা পুনরুল্লেখ করেছে। চীন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, তাইওয়ান ইস্যু তাদের জন্য প্রধান ‘রেড লাইন’ বা অলঙ্ঘনীয় সীমারেখা। এছাড়া গণতন্ত্র ও মানবাধিকার, চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং দেশটির উন্নয়নের অধিকারকেও বেইজিং অপরিবর্তনীয় সীমারেখা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। চীন দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই তাইওয়ানের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ সরকারকে সমর্থন প্রদান এবং চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাথে ফোনালাপে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই স্পষ্ট করেছেন যে, তাইওয়ান ইস্যুই দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। বর্তমানে ১৪ বিলিয়ন ডলারের স্থগিত মার্কিন অস্ত্রচুক্তি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিং ট্রাম্পকে এই অস্ত্র বিক্রি স্থগিত করতে রাজি করানোর চেষ্টা করবেন। যদি ট্রাম্প এতে সম্মত হন, তবে তা হবে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা মার্কিন নীতির এক বিশাল পরিবর্তন।
গত দেড় বছরে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া বাণিজ্য যুদ্ধও এই বৈঠকের বড় অংশ জুড়ে থাকবে। পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের ফলে আমদানিতে ব্যয় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও গত মে মাসে উত্তেজনা কিছুটা কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তবুও বেশ কিছু রফতানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনো বহাল রয়েছে। বিশেষ করে ইরানি তেল ক্রয় এবং ইরানকে ড্রোন সরঞ্জাম সরবরাহের অভিযোগে বেশ কিছু চীনা কোম্পানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বেইজিং তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-ইসরাইল ও মার্কিন সংঘাতের ছায়া এই বৈঠকে বিশেষ প্রভাব ফেলবে। যদিও চীন সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত নয়, তবে হরমুজ প্রণালী অচল হয়ে পড়ায় দেশটি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বেইজিং শুরু থেকেই যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার আহ্বান জানিয়ে আসছে। যদিও ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন যে, এই যুদ্ধ সমাধানে চীনের সহায়তার তার প্রয়োজন নেই, তবুও শি জিনপিং বিশ্ব অর্থনীতিতে এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে ট্রাম্পকে সতর্ক করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিং একটি ‘পূর্বানুমেয় ও স্থিতিশীল’ সম্পর্কের প্রত্যাশা করছেন, যেখানে ট্রাম্পের অনিশ্চিত নীতিনির্ধারণী কৌশলের মুখে চীনের জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূ-খণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষা করাই হবে বেইজিংয়ের মূল লক্ষ্য। এই বৈঠকের ফলাফল শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কই নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এ দিকে গত মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়টার্সের কাছে দাবি করেছে যে, কোনো দেশকে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের ওপর টোল আরোপ করার সুযোগ না দেয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একমত হয়েছেন। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ এই পানিপথের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টায় দুই দেশ কিছুটা অভিন্ন অবস্থান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর থেকে এমন এক সময়ে এ দাবি করা হয়েছে, যখন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত মাসে (এপ্রিল) এক ফোনালাপে এ বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন।
ওই ফোনালাপের বিষয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স থেকে প্রশ্ন করা হলে বিভাগীয় মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, ‘হরমুজ প্রণালীর মতো আন্তর্জাতিক পানিপথে চলাচলের জন্য কোনো দেশ বা সংগঠনকে টোল আদায় করার সুযোগ না দেয়ার বিষয়ে তারা একমত হয়েছেন।
চীনের দূতাবাস ফোনালাপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া ভাষ্যকে নাকচ করেনি; বরং তারা আশা প্রকাশ করে বলেছে, সব পক্ষ একসাথে কাজ করে প্রণালীটি দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল আবার শুরু করতে পারবে। যুদ্ধের আগে এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হতো। তা ছাড়া চীনের কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত ইরানের টোলের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করা এড়িয়ে গেছেন, যদিও তারা যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের সমালোচনা করেছেন।



