দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে পুঁজিবাজারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিতে পুঁজিবাজার শিল্প ও বাণিজ্যে অর্থ জোগানের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) দীর্ঘদিন ধরেই নানা সঙ্কট, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও প্রশাসনিক অনিয়মের কারণে প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ডিএসইর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক বলয়ের প্রভাব বজায় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইন অনুযায়ী যেসব বিভাগ রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স ডিভিশনের অধীনে থাকার কথা ছিল, সেগুলোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ নানা কৌশলে ওই কাঠামোর বাইরে রাখা হয়েছে। এর ফলে বাজার সংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর তথ্য ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে।
ডিএসইর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোর মধ্যে রয়েছে মার্কেট অপারেশনস, ট্রেক অ্যাফেয়ার্স (সাবেক মেম্বারশিপ অ্যাফেয়ার্স), লিস্টিং, করপোরেট ফাইন্যান্স, মনিটরিং ও সার্ভেইল্যান্স বিভাগ। কিন্তু ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম অনুযায়ী মার্কেট অপারেশনস ও ট্রেক অ্যাফেয়ার্স বিভাগ রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স ডিভিশনের অধীনে থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৩ সালে এক্সচেঞ্জেস ডিমিউচুয়ালাইজেশন অ্যাক্ট কার্যকর হওয়ার পর থেকেই প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় এসব বিভাগকে রেগুলেটরি কাঠামোর বাইরে রাখা হয়। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, মার্কেট অপারেশনস বিভাগের নিয়ন্ত্রণ হাতে থাকলে মূল্য সংবেদনশীল তথ্য সহজে নিজেদের আয়ত্তে রাখা যায় এবং তা বিভিন্নভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিএসইর সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমেদের সময় মার্কেট অপারেশনস বিভাগের প্রধান সৈয়দ আবু জাফর শামীমকে সরিয়ে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনিং একাডেমিতে বদলি করা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, তালিকাভুক্ত কোম্পানির মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের আগেই ডিএসইর কিছু কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট শেয়ার কিনে নিতেন এবং পরে তথ্য প্রকাশ করতেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, ট্রেক অ্যাফেয়ার্স বিভাগ নিয়ন্ত্রণে থাকলে ট্রেকহোল্ডার বা সদস্য ব্রোকারেজ হাউসগুলোর সাথে যোগাযোগ ও প্রভাব বিস্তার সহজ হয়। ফলে করপোরেট সুশাসনের পরিবর্তে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থই বেশি প্রাধান্য পায়।
ডিএসই এর কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, ডিএসইতে কোনো ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে গেলে তাকে নানাভাবে চাপের মুখে পড়তে হয়। অতীতে কয়েকজন এমডি দায়িত্ব টিকিয়ে রাখতে পারেননি বলেও তারা দাবি করেন।
তারা বলছেন, ২০১৯ সালে সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএএম মাজেদুর রহমান মার্কেট অপারেশনস বিভাগকে রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স ডিভিশনের অধীনে আনার বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এ একটি চিঠি দেন। তবে পরবর্তীতে বিষয়টি আর এগোয়নি। অভিযোগ রয়েছে, রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স ডিভিশনের প্রধান হিসেবে চিফ রেগুলেটরি অফিসারের (সিআরও) দায়িত্বে দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পরিবর্তে অনুগত ব্যক্তিদের বসানো হয়েছে। একইভাবে লিস্টিং ও সার্ভেইল্যান্সের মতো স্পর্শকাতর বিভাগেও অভিজ্ঞতার চেয়ে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ডিএসইর একাধিক উপমহাব্যবস্থাপক পর্যায়ের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘জাতীয় এই প্রতিষ্ঠানটি কার্যত একটি ব্যক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে। দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন না হওয়ায় হতাশা বাড়ছে।’ তারা বলছেন, ডিএসইতে একদিকে জনবল কমানোর আলোচনা চললেও অন্য দিকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন নিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি সিএফও, সিটিও, জিএম (এইচআর), জিএম (ইন্টারনাল অডিট) ও ফাইন্যান্স বিভাগে একাধিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে কোম্পানি সেক্রেটারি ও সিআরও পদেও নতুন নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে যোগ্য কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না; বরং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অনুগতদেরই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি পূর্ণকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নুজহাত আনোয়ার দায়িত্ব নিলেও বাস্তবে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এখনও আগের প্রভাবশালী বলয়ের হাতেই রয়েছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন বিষয়ে এমডির সাথে যোগাযোগ করলে অনেক সময়ই ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ, বিদেশ সফর কিংবা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রেও যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে মেধাবী কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে এবং অনেকে চাকরি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার চিন্তা করছেন।



