ইফতেখার হোসেন তুহিন হাতিয়া (নোয়াখালী)
প্রকৃতির এক অপরূপ সমাহারের সাথে সমৃদ্ধময় জীববৈচিত্র্যের এক অবারিত অঞ্চল বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা এই নিঝুমদ্বীপ। নামের মতোই নিস্তব্ধ, শান্ত আর অপরূপ সৌন্দর্যে ভরপুর এই দ্বীপটি একাধারে যেন ‘সুন্দরবন আর কক্সবাজারের’ সমন্বয়। ম্যানগ্রোভ বনের সবুজ গালিচা, চিত্রা হরিণের দল, বিস্তীর্ণ সমুদ্রসৈকত আর হাজারো পাখির কলকাকলি- পর্যটনের সব উপাদান থাকার পরও দীর্ঘ দুই দশক ধরে উপেক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে এই দ্বীপ ও দ্বীপের মধ্যে গড়ে তোলা জাতীয় উদ্যান। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাবে সম্ভাবনার এই দ্বীপ আজও পর্যটকবান্ধব হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে রাজস্ব হারাচ্ছে দেশের পর্যটন খাত। আর হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন এলাকাবাসী ও প্রকৃতিপ্রেমীরা।
নোয়াখালীর হাতিয়া দ্বীপের প্রায় ১২০০ মিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় অবস্থিত নিঝুমদ্বীপ। ১৯৪০ সালের দিকে জেগে ওঠা এই চরের নামকরণ হয়েছিল ‘বাল্লার চর’। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় মৎস্যজীবীরা এখানে আসতে শুরু করেন। ১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটলেও এক নারী আশ্রয় নিয়েছিলেন কেওড়া বাগানে; তিনি পরবর্তীকালে ‘কেরপা বুড়ী’ নামে পরিচিত হন। বন বিভাগের উদ্যোগে এখানে ম্যানগ্রোভ বন সৃজনের কাজ শুরু হলে দ্বীপটি ধীরে ধীরে দ্বিতীয় সুন্দরবনে রূপ পায়। ১৯৭৫ সালে স্থানীয় সংসদ সদস্য আমিরুল ইসলাম কালাম এই দ্বীপের নামকরণ করেন ‘নিঝুমদ্বীপ’। একই সময়ে বন বিভাগ এখানে কয়েক জোড়া চিত্রা হরিণ ছেড়ে দেয়, যা বর্তমানে হরিণের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের অপূর্ব সমাহারে ভরপুর নিঝুমদ্বীপের ২৫ হাজার একর বনভূমি ২০০১ সালে জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরে জাহাজমারা সদর বিট, চরকালাম বিট ও চররৌশন বিট মিলিয়ে ৪০ হাজার ৩৯০ একর বনভূমি সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়। এর পর থেকেই দ্বীপটিতে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার নানা পরিকল্পনা ও আশ্বাস এলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি।
নিঝুমদ্বীপ যেন প্রকৃতির এক অপরূপ ক্যানভাস। ম্যানগ্রোভ বনের সবুজ দেয়াল, তার ফাঁকে ফাঁকে চিত্রা হরিণের দল ছুটে বেড়ানো, আর সমুদ্রসৈকতে ঢেউয়ের খেলা- যেকোনো পর্যটককেই মোহিত করে। সকালে সূর্যোদয় আর বিকেলে সূর্যাস্তের দৃশ্য এখানে অসাধারণ। বনের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা ছড়া আর খালে নৌকায় ঘুরে দেখা যায় অন্য এক জগত। স্থানীয় জেলেদের মাছ ধরার নৌকা যেন ছবির মতো জলতরঙ্গে ভেসে বেড়ায়।
শীতকালে যেন এখানে পাখির মেলা বসে। সাইবেরিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসে পরিযায়ী পাখি। রাজহাঁস, নীলশির, সরালি, বাটান, পানকৌড়ি, গাংচিল, মাছরাঙা, সাদা বকের ঝাঁক- এসব পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা দ্বীপ। দেশ-বিদেশের পাখিপ্রেমীদের কাছে দ্বীপটি বড় আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
নোয়াখালী জেলা ইতোমধ্যে ‘নিঝুমদ্বীপের দেশ’ হিসেবে পরিচিতি পেলেও বাস্তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো হচ্ছে না। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন নিঝুমদ্বীপে পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করলেও তা এখনো কাগজেই রয়ে গেছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, পর্যটন করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসন নানা আশ্বাস দিলেও সে সবের কোনো বাস্তবায়ন চোখে পড়েনি।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান, নিঝুমদ্বীপের মানুষের জীবনধারা ও স্থানীয় অর্থনীতির সাথে পর্যটনকে সম্পৃক্ত করে গড়ে তোলা জরুরি। এখানকার ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্প, খেজুরের রস ও গুড়, প্রাকৃতিক মধু সংগ্রহ, মাছ ধরা, পাখি দেখা ও হরিণ দেখার মতো বিষয়গুলো পর্যটকদের কাছে অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে। এসব দিক মাথায় রেখে পর্যটন করপোরেশনের উচিত পরিকল্পিত উদ্যোগ নিয়ে স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরি করা।
দ্বীপটির প্রথম নির্বাচিত প্রতিনিধি তাজুল ইসলাম জানান, ‘নিঝুমদ্বীপ এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির সোপান হতে পারত। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা বহুবার এসে বলেছেন পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলবেন। কিন্তু দুই দশকেও পর্যটন করপোরেশনের কোনো ছোঁয়া লাগেনি এখানে।’ তিনি আরো বলেন, ‘অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থা, ভালো মানের হোটেল বা রিসোর্ট না থাকা এবং নানা সুযোগ-সুবিধার অভাবে পর্যটকদের ইচ্ছা থাকলেও তারা আসতে পারেন না।
ঢাকা থেকে লঞ্চে সকালে হাতিয়ায় পৌঁছানো গেলেও নিঝুমদ্বীপে যাওয়া এখনো কষ্টসাধ্য। হাতিয়া ও নিঝুমদ্বীপের মাঝে মোক্তারিয়া চ্যানেল পাড়ি দিতে হয় ট্রলারে, যা অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ। এই সমস্যা সমাধানে হাতিয়া ও নিঝুমদ্বীপের মধ্যে ‘কেবল কার’ স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন অনেকে। এতে দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য অক্ষুণœ রেখে সহজে পর্যটকদের আনা-নেয়া সম্ভব হবে। একটি কেবল কার সংযোগ স্থাপন পুরো দ্বীপের পর্যটনের দুয়ার খুলে দিতে পারে বলে মনে করেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
হাতিয়া জাহাজমারা রেঞ্জের সহকারী বনসংরক্ষণ কর্মকর্তা এ কে এম আরিফুজ্জামান জানান, অপার সম্ভাবনা থাকার পরও নিঝুমদ্বীপে পর্যটকদের জন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা গড়ে ওঠেনি। জাতীয় উদ্যান ঘোষণার পর সরকার দ্বীপটিকে ইউনিয়ন পরিষদ ঘোষণা করে এবং বনভূমি বন্দোবস্ত দেয়া হয়। আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার কারণে নিঝুমদ্বীপের জীববৈচিত্র্য এখনও হুমকির মুখে। তিনি বলেন, সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্বমানের পর্যটন সম্ভাবনাময় স্থান এই নিঝুমদ্বীপ।
প্রকৃতির এমন অপরূপ লীলাভূমিকে আর অবহেলা না করে দ্রুত পরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় দুই দশকের এই উপেক্ষা আরো দীর্ঘায়িত হবে, হারিয়ে যাবে সম্ভাবনার অফুরান দ্বার।



