ক্রীড়া প্রতিবেদক
আরো একটি শতরান, সবার ওপরে মুশফিকুর রহীম।
শট খেলে বলের দিকে এক ঝলক তাকিয়েই মুশফিক বুঝে গেলেন, বাউন্ডারি হচ্ছে। বল সীমানা ছোঁয়ার আগেই শুরু হলো তার উদযাপন। দু’হাত ছড়িয়ে চিৎকার করলেন। বোলার মোহাম্মাদ আব্বাসের মুখের ওপর গিয়ে হুঙ্কার ছুড়লেন। ব্যাট তুলে ধরার বদলে প্রবল আক্রোশে উঁচিয়ে ধরলেন হেলমেট। সেজদা দিয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন তো ছিলই। সব মিলিয়ে দীর্ঘক্ষণ চলল উদযাপন।
এ রকম বুনো উদযাপন আগেও দু-একবার করেছেন মুশফিক। তবে এবার তার খ্যাপাটে উদযাপনের পেছনে গল্পও আছে। সেঞ্চুরির আগে তার সাথে বেশ এক চোট লেগে গিয়েছিল পাকিস্তানি অধিনায়ক শান মাসুদের। সেটির সূত্র ধরে মুখোমুখি হয়ে পড়েন তাইজুল ইসলাম ও সাউদ শাকিল। এসবই নিশ্চয়ই তাতিয়ে দিয়েছিল মুশফিককে।
টেস্ট ক্রিকেটে এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরতার নাম মুশফিকুর রহীম। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাকি দুই ফরম্যাট থেকে সরে দাঁড়ালেও লাল বলের ক্রিকেটে নিজের গুরুত্ব যেন আরো ভালোভাবেই প্রমাণ করে চলেছেন তিনি। সিলেট টেস্টে গতকাল দ্বিতীয় টেস্টের তৃতীয় দিনে দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি করে দলকে শক্ত অবস্থানে নেয়ার পাশাপাশি গড়েছেন একাধিক রেকর্ড। সবাইকে ছাড়িয়ে ১৬ হাজার রানের মালিকও তিনি।
এই রান, সেঞ্চুরি, পরিসংখ্যান আর রেকর্ডের খতিয়ান, এগুলো স্রেফ কিছু সংখ্যা নয়। এসবে মিশে আছে তার অনেক ঘাম, শ্রম, ত্যাগ, নিবেদন আর প্রতিজ্ঞা। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর মাঠের ভেতরে-বাইরে শৃঙ্খলার ছকে সাজানো জীবন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাটুনি, ছুটির সাথে আড়ি, ক্লান্তির সাথে লড়াই, প্রত্যাশার সাথে তাল মিলিয়ে চলা আর উঁচুতে ওঠার তাড়না। নিজেকে খাঁটি করতে কত কিছুতে ছাড় দিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। পরিশ্রম যদি সৌভাগ্যের প্রতিশ্রুতি হয় তাহলে মুশফিক জীবন্ত উদাহরণ।
দ্বিতীয় ইনিংসে পরিণত ব্যাটিংয়ে ১৭৮ বলে শতক পূর্ণ করেন মুশফিক। ইনিংসজুড়ে ছিল তার স্বভাবসুলভ ধৈর্য ও নিয়ন্ত্রিত শটের প্রদর্শনী। ৯টি চার ও একটি ছক্কায় সাজানো এই ইনিংস বাংলাদেশকে বড় সংগ্রহের পথে এগিয়ে নেয়। টেস্টের তৃতীয় দিনে ওই সময় ৮৫ ওভার শেষে টাইগারদের সংগ্রহ ছয় উইকেটে ৩২৫ রান। পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের লিড ৩৭১ রান। ইনিংস শেষে ২৩৩ বলে ১২ চার ও এক ছয়ে মুশফিকের ১৩৭।
এই সেঞ্চুরির মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছেন মুশফিক। দেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তিন সংস্করণ মিলিয়ে ১৬ হাজার রান পূর্ণ করেছেন তিনি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের ফল হিসেবেই এসেছে এই অর্জন। একই সাথে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির মালিকও এখন মুশফিক। মুমিনুল হককে ছাড়িয়ে তার সেঞ্চুরির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪-তে। মোহাম্মদ আব্বাসের বলে বাউন্ডারি মেরে শতক পূর্ণ করার মুহূর্তটি তাই হয়ে থাকে বিশেষ স্মরণীয়।
এই ইনিংস খেলার পথে বাংলাদেশের প্রথম ও বিশ্বের ৩৪তম ব্যাটার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ১৬ হাজার পূর্ণ করেন মুশফিক। ৪৭৮ ম্যাচের ৫৩৫ ইনিংসে মুশির রান এখন- ১৬ হাজার ৫৮। ক্যারিয়ারে ২২টি সেঞ্চুরির সাথে ৮৪টি অর্ধশতকও আছে তার। ব্যাটিং গড়-৩৪.৪৮। এর মধ্যে ১০২ টেস্টের ১৮৮ ইনিংসে ৬,৭৬৩ রান, ২৭৪ ওয়ানডেতে ২৫৬ ইনিংস ব্যাট করে সাত হাজার ৭৯৫ রান এবং ১০২ টি-২০-এর ৯৩ ইনিংসে এক হাজার ৫০০ রান করেছেন মুশফিক।
মুশফিকের পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিন ফরম্যাট মিলিয়ে বাংলাদেশের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান আছে তামিম ইকবালের। ২০০৭-২০২৩ সাল পর্যন্ত ৩৯১ ম্যাচের ৪৫২ ইনিংসে ২৫ সেঞ্চুরি ও ৯৪ হাফ-সেঞ্চুরিতে ১৫,২৪৯ রান করেছেন তিনি। তামিমের ব্যাটিং গড়- ৩৫.২১। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিন ফরম্যাট মিলিয়ে সর্বোচ্চ রানের বিশ্ব রেকর্ড ভারতের শচিন টেন্ডুলকারের। ৬৬৪ ম্যাচের ৭৮২ ইনিংসে ৩৪,৩৫৭ রান করেছেন টেন্ডুলকার। এরপর রয়েছেন বিরাট কোহলি ও কুমার সাঙ্গাকারা।
দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি টেস্ট সেঞ্চুরি
নাম সেঞ্চুরি
মুশফিক ১৪
মুমিনুল ১৩
তামিম ১০
শান্ত ৯
লিটন ৬



