নিজস্ব প্রতিবেদক
ঈদ ঘিরে সারা দেশে প্রায় দেড় হাজারের বেশি পর্যটন স্পট প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শতাধিক স্পটে পর্যটকদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পর্যটকরা যাতে নির্বিঘেœ ঘুরতে পারেন সে জন্য মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় দেড় হাজার ট্যুরিস্ট পুলিশ। বিশেষ করে অধিক সমাগমের স্থান কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সিলেট, পার্বত্য এলাকা ও হাওড়াঞ্চলে নীরাপত্তা তুলনামূলক বেশি জোরদার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার অভ্যন্তরীণ পর্যটক প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। তাই ঈদের ছুটিতে এবার স্মরণকালের পর্যটক সমাগমের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আওহাওয়া অফিস বলছে, এবার ঈদে ঝড়বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এতে পর্যটক সমাগম কিছুটা বিঘিœত হতে পারে।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সম্পাদক মো: নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, এবার গত বছরের চেয়ে পর্যটক দেড়গুণ বেশি সমাগম হতে পারে। ঈদুল ফিতরের চেয়ে এবার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ব্যবসা বৃদ্ধি পাবে। এতে ব্যবসা হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ জানিয়েছে, দেশে এক হাজার ৬৭৫টি পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে যেসব স্পটে লোকসমাগম বেশি হয়, সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এমন ৩৩ জেলার ১০৭ পর্যটন স্পটে পর্যটকের নিরাপত্তায় থাকবে প্রায় দেড় হাজার ট্যুরিস্ট পুলিশ। ইতোমধ্যে ট্যুরিস্ট পুলিশ সদর দফতর থেকে সব রিজিয়ন অফিসে ২০ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অপরাধীরা যেন কোনো ধরনের নাশকতা বা চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতি করতে না পারে সে জন্য পর্যটন এলাকায় দিনে ও রাতে পুলিশ প্যাট্রলিং জোরদার নিশ্চিত করা হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কক্সবাজারে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ইউনিফর্ম পরিহিত পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে নজরদারি ও গোয়েন্দা টিম মাঠে কাজ করছে। প্রতিটি টিম পালাক্রমে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করবে।
কক্সবাজার হোটেল মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে কক্সবাজারের ৫০০টির বেশি হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়েছে। তাদের ধারণা ঈদের ছুটিতে প্রতিদিন অন্তত লক্ষাধিক পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থান করবেন। এতে পর্যটন খাতে ব্যবসার প্রসার ঘটবে এবং ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভালো রাজস্ব অর্জন করা সম্ভব হবে।
সিলেট হোটেল অ্যান্ড গেস্ট হাউজ ওনার্স গ্রুপের সাবেক সভাপতি সুমাত নূরী চৌধুরী জুয়েল জানান, ঈদের দীর্ঘ ছুটিকে সামনে রেখে পর্যটকদের বরণে প্রস্তুত সিলেট। দীর্ঘদিন স্থবির থাকা পর্যটন খাত আবারো চাঙ্গা হওয়ার পাশাপাশি এবার শতকোটি টাকার ব্যবসার আশাও করছেন তারা। একই সাথে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জাফলং, সাদা পাথর, বিছনাকান্দি, রাতারগুল, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও সুনামগঞ্জের টাংগুয়ার হাওরে ব্যাপক লোকসমাগম ঘটবে বলে তাদের ধারণা। এতে শতকোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনাও দেখছেন তারা।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মোতালেব শরীফ বলেন, এবার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি পর্যটক আসবে বলে তাদের প্রত্যাশা। তিনি বলেন, ঈদের সাত থেকে আট দিনের ছুটিতে কুয়াকাটায় উপচে পড়া ভিড় হতে পারে। ইতোমধ্যে ভালো মানের হোটেলগুলোতে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ অগ্রিম বুকিং হয়েছে।
বান্দরবান রেসিডেন্সিয়াল হোটেল ও রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, ঈদকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। সামনে আরাে কয়েক দিনে বুকিং আরো বাড়বে। তিনি বলেন, বান্দরবানে হোটেল ও রিসোর্ট মিলিয়ে প্রায় ৮০টির মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে একসাথে প্রায় পাঁচ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা আছে।
ঈদের টানা ছুটিকে সামনে রেখে পর্যটকদের বরণে প্রস্তুত হয়েছে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার বিভিন্ন নয়নাভিরাম পাহাড় লেকে ঘেরা পর্যটন স্পট। এবার ঈদে একটানা সাত দিন ছুটি থাকায় পর্যটন শহর হিসেবে খ্যাত কাপ্তাইয়ে হাজারো পর্যটকের আগমন ঘটবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।
অন্য দিকে রাঙ্গামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ইউনিট ব্যবস্থাপক (উপব্যবস্থাপক) আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, ঈদের ছুটিতে পর্যটদের বরণে কোনো প্রস্তুতির কমতি রাখা হয়নি। সব কিছু ঢেলে সাজানো হয়েছে। পর্যটকরা যাতে সুন্দর পরিবেশে ঘুরে বেড়াতে পারে তার জন্য সব ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক সভাপতি শিবলুল আজম কোরেশী নয়া দিগন্তকে বলেন, এবার অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা বেশি হবে। কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সিলেটসহ অন্যান্য জনপ্রিয় স্পটে পর্যটকের উপস্থিতি বাড়বে। তবে বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতা কম। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট শিডিউলে অনিশ্চয়তা থাকায় বিদেশী পর্যটক বাংলাদেশে আসছেন না, দেশের মানুষও কম যাচ্ছেন বিদেশে। এবার হাজার কোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এর মধ্যে শঙ্কাও রয়েছে। যদি আবহাওয়া ভালো না হয় হবে তার বড় নেতিবাচক প্রভাব পর্যটনে পড়বে। অন্য দিকে জ্বালানি সঙ্কটে প্রাইভেট অনেক গাড়ি চলবে না ফলে পর্যটকদের একটি বড় অংশ এখানে কমবে।



