পার্বত্য চট্টগ্রামে কৃষির রূপান্তর-৩

মসলা চাষে বিপ্লব : কৃষির নতুন দিগন্তে বাংলাদেশ

Printed Edition

শাহ আলম নূর ও কাওসার আজম বান্দরবান থেকে ফিরে

পাহাড় মানেই যেন ছিল ফলমূল কিংবা শাকসবজির চাষ, কিছু জায়গায় চা, কফি কিংবা জুম চাষ। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন পাহাড়ের হাওয়ায় ভেসে আসছে আদা, হলুদ, এলাচ, দারুচিনি আর তেজপাতার গন্ধ। বাংলাদেশে মসলার বার্ষিক চাহিদা ৫৯ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি। এর একটা বড় অংশ আমদানি করতে হয় প্রতি বছর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে। অথচ দেশেরই পার্বত্য অঞ্চলে রয়েছে বিশাল সম্ভাবনার এক ভাণ্ডার। সেই ভাণ্ডারের দিকেই এখন ঝুঁকছেন পার্বত্য জেলার কৃষকরা।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলো ঘুরে দেখা যায় সবুজ পাহাড়ে চিরচেনা কৃষির চিত্র বদলে যাচ্ছে দ্রুত। এখন আর শুধু ফলমূল বা ধান চাষেই সীমাবদ্ধ নন কৃষকরা। মাটির গন্ধ, জলবায়ুর উপযোগিতা এবং বাজারে উচ্চমূল্যের কারণে এখন তারা ঝুঁকছেন মসলা চাষের। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাহাড়ে আদা, হলুদ, এলাচ, দারুচিনি, জিরা, তেজপাতা, কালিজিরাসহ নানা রকমের মসলার বাণিজ্যিক চাষ ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন বাংলাদেশের পাহাড়ি জনপদে ছড়িয়ে পড়েছে মসলার সুবাস। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলার উঁচুনিচু ঢালে এখন শুধুই ফল বা ধান নয়, চাষ হচ্ছে আদা, হলুদ, এলাচ, দারুচিনি, জিরা, তেজপাতার মতো উচ্চমূল্যের মসলা। কৃষকরা বলছেন এই ফসলগুলো পাহাড়ি মাটিতে ভালো হয়, ফলনও হয় বেশি। এই মসলা চাষ শুধু স্থানীয় চাহিদা মেটাচ্ছে না, ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বড় ক্ষেত্রও হয়ে উঠতে পারে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন এক সময় পাহাড়ি জনজীবন ছিল একেবারেই জুম চাষনির্ভর। বছরে একবার ফলন, পরে অনিশ্চয়তা। এখন সেই গল্প পাল্টে যাচ্ছে। আধুনিক কৃষি ও প্রকল্প-সহায়তায় পাহাড়ে কাজুবাদাম, কফি, মাশরুম, এমনকি মসলা চাষও বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয়েছে। জুম চাষের বিকল্প হিসেবে দারুচিনি, গোলমরিচ, তেজপাতা, বিলাতি ধনিয়া ইত্যাদি মসলার চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক রাসেল আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, এখন আমরা হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি। তারা বুঝতে পারছেন জমি ও শ্রম একই থাকলেও মসলায় লাভ বেশি।

বান্দরবান সদরের জামছড়ি ইউনিয়নের কৃষক রতন তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, আগে ধান আর কলা চাষ করতাম। এখন সাড়ে তিন একরে আদা, এলাচ আর হলুদের চাষ করছি।

স্থানীয় কৃষি অফিস বলছে, জেলার ৪,৫০০ হেক্টর জমিতে এখন হলুদের চাষ হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা। আদা উৎপাদিত হচ্ছে ৩,০০০ হেক্টরে, যার মূল্য প্রায় ৪০ কোটি টাকা। এলাচ, দারুচিনি ও অন্যান্য মসলার উৎপাদনও ক্রমবর্ধমান। পাহাড়ে মসলা চাষ কেবলমাত্র একটি কৃষি কার্যক্রম নয়; এটি একটি রূপান্তরের নাম। যেখানে অনুন্নত এলাকার মানুষ নিজের শ্রমে গড়ে তুলছে সম্ভাবনার শিল্প। সঠিক পরিকল্পনা, প্রণোদনা ও প্রযুক্তি থাকলে পাহাড় একদিন শুধু দেশকে নয়, সারা বিশ্বকে মসলার ঘ্রাণে মাতিয়ে তুলবে।

বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক এম এম শাহ্ নেয়াজ নয়া দিগন্তকে বলেন পার্বত্য এলাকার মাটি ও জলবায়ু উচ্চমূল্যের মসলা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। ২০২১ সালের পর থেকে এলাচ ও দারুচিনি পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করা হয় এবং ফলাফল বেশ চমৎকার। পার্বত্য চট্টগ্রামে মসলা চাষ এখন আর শুধু বিকল্প চাষ নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বনের হাতিয়ার। স্থানীয় কৃষকদের উৎসাহ, নারীর অংশগ্রহণ এবং সরকারের সহায়তা মিলিয়ে একটি সম্ভাবনাময় খাত গড়ে উঠছে, যা একদিন দেশের বৈদেশিক আয়েও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার মসলা আমদানি করে থাকে। এর মধ্যে এলাচ, দারুচিনি, জিরা ও গোলমরিচের আমদানিই সবচেয়ে বেশি। তবে ২০২৪ সালের মধ্যে পাহাড়ি তিন জেলায় যে পরিমাণ এলাচ ও হলুদ উৎপাদিত হয়েছে, তা দিয়ে অন্তত ৩০ শতাংশ আমদানিনির্ভরতা হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত এক বছরে মসলা আমদানি বাবদ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ প্রতি বছর যেসব দেশ থেকে মসলা আমদানি করে তার মধ্যে ভারত, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও চীন প্রধান। যদি পাহাড়ি মসলা চাষ পরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারিত করা যায়, তাহলে ৩০-৪০ শতাংশ আমদানি কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন কৃষি গবেষকরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ‘কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের পরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেন এই অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ু কফি ও কাজুবাদামের জন্য আদর্শ। প্রকল্পের শুরুতে দেশে কাজুবাদাম চাষ হতো মাত্র ১,৮০০ হেক্টরে এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪,২০০ হেক্টরে। কফির ক্ষেত্রেও একই চিত্র; মাত্র ৬৫ হেক্টর থেকে বেড়ে তা এখন ১,৮০০ হেক্টরে ছড়িয়ে পড়েছে।

নারীর অংশগ্রহণে সামাজিক রূপান্তর : মসলা চাষে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক বাস্তবতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বান্দরবানের রুমা উপজেলার কৃষক রেশমা চাকমা জানান, আগে শুধু বাড়ির কাজে ব্যস্ত ছিলাম। এখন নারীরা মাঠে কাজ করে, প্রক্রিয়াজাত করে, বিক্রিও করে। নিজস্ব আয় তৈরি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, পাহাড়ি মসলা চাষে ৪০ শতাংশ শ্রমশক্তি নারী। ফলে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন এবং পরিবারে তাদের অবস্থান দৃঢ় হচ্ছে।

বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থা : চাষিরা বলছেন, উৎপাদন বাড়লেও বাজার ব্যবস্থায় কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পাহাড়ি এলাকার অনেক গ্রামে এখনো পরিবহন ব্যবস্থা দুর্বল। ফলে মসলা সঠিক দামে বিক্রি করা সম্ভব হয় না। রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলার ব্যবসায়ী মাইন উদ্দিন বলেন, আমরা এলাচ ও হলুদ কিনে চট্টগ্রামে পাঠাই, কিন্তু রাস্তা খারাপ থাকায় অনেক সময় পণ্য নষ্ট হয়। বাজার ব্যবস্থায় সরকারি সহায়তা দরকার। তবে আশার কথা হলো, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটিতে ইতোমধ্যে মসলা শুকানোর ইউনিট ও সংরক্ষণাগার নির্মাণ শুরু হয়েছে।

রফতানির সম্ভাবনা : বাংলাদেশে উৎপাদিত অর্গানিক আদা, দারুচিনি ও হলুদের চাহিদা রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে। কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মধ্যে ১০০ কোটি টাকার মসলা রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মসলা রফতানিতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য প্রশিক্ষিত জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও মান পরীক্ষার ল্যাব প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী বাজার সংযোগ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রফতানি অবকাঠামো তৈরি করা যায়, তবে ‘পাহাড়ি মসলা’ হতে পারে বাংলাদেশের নতুন ব্র্যান্ড পরিচয়, যা বিশ্বের বাজারে ছড়াবে ঘ্রাণ আর সম্ভাবনার বার্তা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে যেখানে পার্বত্য এলাকায় মসলা চাষের জমির পরিমাণ ছিল ১,২০০ হেক্টর, ২০২৫ সালে এসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,৭৫০ হেক্টরে। এই সময়ের মধ্যে আদা চাষের পরিমাণ বেড়েছে দ্বিগুণ, হলুদ ৬৫ শতাংশ।

বান্দরবান হর্টিকালচার সেন্টারের উপ পরিচালক লিটন দেবনাথ নয়া দিগন্তকে বলেন, মসলা চাষের মাধ্যমে আমরা স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা দুই-ই অর্জন করতে পারি। তবে দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন বজায় রাখতে হলে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাত ও রফতানি তিনটি স্তরে সমন্বয় দরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন পার্বত্য জেলাগুলোতে এই পরিবর্তনের পেছনে যেমন রয়েছে সরকারি-বেসরকারি নীতিগত সহায়তা, তেমনি কৃষকের পরিশ্রম ও উদ্ভাবনী চেষ্টার বড় ভূমিকা রয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ু এমনিতেই মসলাজাতীয় ফসলের জন্য উপযোগী হওয়ায় তুলনামূলকভাবে কম খরচে উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকার মসলা আমদানি করে। যদি পার্বত্য এলাকাগুলোতে পরিকল্পিতভাবে মসলা চাষ করা হয়, তবে আমদানির চাপ কমে আসবে বলে তারা মনে করেন।