এক কার্ডেই বদলেছে বহু হিসাব জীবনযাপনে স্বস্তি অনেক নারীর

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ
Printed Edition

রাজধানীর কড়াইল বস্তি। যেখানে খুবই স্বল্প আয়ের মানুষের বসবাস। অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানীর সংলগ্ন ঘনবসতির এই বস্তি। এখানে বাস করা নারীদের অনেকেই কাজ করেন গৃহকর্মীর। ভোরের সূর্য উঁকি দিতে না দিতেই তারা নেমে পড়েন জীবিকার সন্ধানে। গৃহকর্মীর কাজে চলে যান গুলশান-বনানীর অভিজাত মানুষের বাসায়। পুরুষদের কেউ রিকশা চালান, কেউ ইজিবাইক, বাস শ্রমিক, কেউ সবজি বিক্রেতা, আবার কেউবা ভাঙারির দোকান, চায়ের দোকান অথবা ফুটপাতের হোটেলে কাজ করেন।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত কালজয়ী উপন্যাস ‘পদ্মানদীর মাঝি’র জেলে পল্লীর মতোই যেন এই নগর বস্তিটি। পার্থক্য শুধু জীবিকার ধরনে। সংসারের একজনের আয়ে কড়াইল বস্তিতে ঠিকমতো বেঁচে থাকা খুবই কঠিন। তাদের অবস্থা এতটাই নাজুক যে কখনো কখনো আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা বাসা ভাড়া দেয়ার সামর্থ্যও থাকে না। দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে যেতে হয়, স্বল্প আয়ের টাকায় কি খাবেন, বাসা ভাড়া দেবেন নাকি সন্তানের লেখাপড়াসহ অন্য খরচ মেটাবেন। কিন্তু এখন সেই দুশ্চিন্তার বোঝা কাঁধ থেকে অনেকটা নেমে গেছে। এখন তাদের অনেকেরই বাসা ভাড়া দেয়ার চিন্তা দূর হয়েছে। আবার কারো বাজারের, কারো ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচের চিন্তা কমেছে।

এবারের ঈদুল ফিতরও ছিল তাদের জন্য অন্য রকম আনন্দের। ঈদের আগে পাওয়া ফ্যামিলি কার্ডের আড়াই হাজার টাকা অনেকেই ঈদ উপলক্ষে খরচ করেন। এখন এই মাস থেকে তাদের অনেকেরই ভিন্ন পরিকল্পনা। এখন প্রতি মাসে অনেকে ফ্যামিলি কার্ডের টাকা দিয়ে বাসা ভাড়া দেবেন। কেউ আবার এই টাকায় মাসের বাজার করবেন, কেউ ছেলেমেয়ের লেখাপড়ায় খরচ করবেন। কেউ আবার সন্তানকে ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য দিয়েছেন।

গতকাল কড়াইল বস্তিতে কথা হয় সরকারের দেয়া ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছেন এমন অন্তত ১০ জনের সাথে। তারা জানালেন, এই এক কার্ডেই বদলে গেছে তাদের জীবনের বহু হিসাব। এক কার্ডে নেমে গেছে চিন্তার বড় বোঝা। তারা জানিয়েছেন, বিত্তবানদের কাছে এই আড়াই হাজার টাকা কিছুই না। কিন্তু তাদের কাছে অনেক কিছু। সরাসরি এই নগদ আর্থিক উপহার তাদের জন্য অনেক বেশি স্বস্তির।

উত্তরাঞ্চলের জেলা কুড়িগ্রামের সাবিনা থাকেন কড়াইল বস্তিতে। তিনি গৃহকর্মীর কাজ করেন আর স্বামী রিকশা চালান। দুজনের আয়েও তাদের চলতে হিমশিম খেতে হয়। এর আগে কোনো সরকারের সময়ই কোনো সহযোগিতা পাননি। সাবিনা বলেন, ‘স্বামীর আয় অল্প, তেমন রুজি নাই। ভাড়ার রিকশা চালায়। জমা দেয়া লাগে চার শ ট্যাকা। ঘর ভাড়া দেয়া, পোলাপান তিনটা, পড়ানো, খাওয়া। বড় মেয়ে দ্যাশে পড়ে। চলতে খুব সমস্যা।’

এমন পরিস্থিতিতে একটি ফ্যামিলি কার্ড সংসারের হিসাব বদলে দিয়েছে। তাদের সমস্যার অনেকটা সমাধান হয়েছে। আগে ঘর ভাড়ার যে চিন্তা ছিল, এখন সেই চিন্তা কিছুটা লাঘব হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ঘর ভাড়া দেওনে আছান হইছে। ঘরভাড়া দেয়া যায় আরকি। এত বছর কড়াইলে থাকছি। জীবনে কখনো কোনো কিছু পাইনি। এই প্রথম ফ্যামিলি কার্ডের ট্যাকা পঁচিশ শ পাইলাম।’ তিনি জানান, প্রথম মাসের টাকায় ঈদের বাজার করেছেন। এখন থেকে প্রতি মাসে ফ্যামিলি কার্ডের আড়াই হাজার দিয়ে ঘরভাড়া দেবেন।

কাজ করিয়েও মানুষ ঠিকমতো টাকা দিতে চায় না উল্লেখ করে সাবিনা বলেন, ‘কাজ করেই তো ট্যাকা ন্যাওন লাগে। তাও সময় মতো পাওন যায় না। আর সরকার কাজ না করিয়েও আমাগো এতগুলো টাকা দিচ্ছে। সরকার যতদিন আছে, ততদিন ঘর ভাড়ার জন্যে চিন্তা করতে হবে না। ঢাকা শহরে থাকি ঘরভাড়া তো দেয়াই লাগবে। সেই চিন্তা থেকে তো বাঁচলাম।’

এ সময় সাবিনার পাশে থাকা এই বস্তির আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘কাজ ছাড়া ট্যাকা পাওয়ায় অনেক উপকার হইছে।’ বিউটি নামের এই বাসিন্দা বলেন, ‘আমি ২৫-২৬ বছর কড়াইলে থাকি। হাসিনা সরকারের আমলে একবার কিসের যেন একটা কার্ড পাইছিলাম। দুই তিনবার মাল আনার পর তা বন্ধ করে দেছে। আর কখনো পাই নাই। এবার তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হইছে। ফ্যামিলি কার্ড দিছে। কেউ পাইছে কেউ পায়নি। যদি সবাই পায় এটা একটা আনন্দের। কাজের বিনিময়ে টাকা পাইতে গেলে অনেক কষ্ট, এখনো এই বয়সে কাজ করি মানুষের বাসায়। খাওয়া দাওয়া, ঘরভাড়া.. যদি পঁচিশ শ টাকা হয়, অনেক উপকার হয়। আশা করি যারা না পাইছে, ওনার (প্রধানমন্ত্রী) আশ্বাস অনুযায়ী সবাই পাবে।’ বিউটির বয়স ষাটের কাছে। তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বরগুনায়। তিনি থাকেন বস্তির ঝিলপাড়ের বৌবাজার এলাকায়।

শিক্ষার্থী মিম আক্তার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিবিএ পড়ছেন। গ্রামের বাড়ি বরগুনায়। তার মায়ের নামে ফ্যামেলি কার্ড হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ঈদের আগে এই টাকা পাওয়ায় অনেক উপকার হয়েছে। আমাদের মতো পরিবারের জন্য এটা ভালো একটা অ্যামাউন্ট। বলা যায়, একটা পরিবারের বাজার হয়ে যায়, এক বস্তা চাল হয়ে যায়, কাঁচা বাজার করা যায়। আমি একজন স্টুডেন্ট। স্টুডেন্টদের জন্য এখনো কোনো কার্ড চালু হয়নি। মায়ের নামে হওয়া এই আড়াই হাজার টাকায় আমার ভার্সিটির বেতন, যাতায়াত খরচটা হয়ে যাচ্ছে। এটা আমার পরিবারের জন্য অনেক কিছু। প্রধানমন্ত্রী অঙ্গীকার রক্ষা করেছেন। দায়িত্ব নেয়ার এক মাসেরও কম সময়ে তিনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা।’

কামরুন্নাহারের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ। থাকেন কড়াইল বস্তিতে। তার স্বামী ১২ হাজার টাকা বেতনে একটি হোস্টেলে চাকরি করে। তিনি গৃহিনী, কোনো কাজ করেন না। স্বামীর টাকায় সংসার চালাতে হয়। দুই মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। একটি মাত্র ছেলে। তার আবার মানসিক সমস্যা থাকায় কোনো কাজ করতে পারে না। ফ্যামিলি কার্ডের কথা শুনতেই খুশিতে প্রাণখোলা একগাল হাসি দিয়ে কামরুন্নাহার বলেন, ‘কার্ডটা পাওয়ায় অনেক উপকার হয়েছে। টাকা সংসারে খরচ করছি। কিছু টাকা ছেলের চিকিৎসার কাজে লাগাইছি। তারেক রহমান আমাদের মতো অসহায় গরিব মানুষের জন্য যা করেছেন, এটা খুব খুশির বিষয়, আল্লাহ তারেক রহমানকে আরো এরকম করার তওফিক দান করুক।’

সামিরন বেগম। বাবা মা শখ করে বিয়ে দিয়েছিল। কয়েক বছর পর স্বামী মারা গেছে। এরপর আবার বিয়ে করেন। কিন্তু সেই স্বামী আরেকজনকে বিয়ে করে নোয়াখালী থাকে। সামিরন বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। নিজে আয় করে খাই। ভাঙারি টোয়াই, পয়সা কড়ি চাই মানুষের কাছে। পোলাপানকে খাওয়া ঘরভাড়া দেই। ঈদের সময় ফ্যামিলি কার্ডের টাকা পাইছি। জীবনের কোনো সরকার আংগোরে কিছু দেয় নাই। এই বারে আমি পঁচিশ শ টাহা পাইছি। আল্লাহ আমাগো চালায়।’

কড়াইল বস্তি অনেকটা বিচ্ছিন্ন জগতের মতো। সরু গলিগুলো টিনের চাল আর বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা। অসংখ্য ঘরের মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা সরু পথগুলো যেন কোনো এক জটিল গোলকধাঁধার মতো। মাথার ওপর দিয়ে বৈদ্যুতিক তারের জটলা আর নিচে ব্যস্ত মানুষের আনাগোনা এখানকার চিরচেনা দৃশ্য। বস্তিটির একদিকে গুলশান-বনানীর সুউচ্চ অট্টালিকা আর অন্য দিকে শান্ত লেকের পানি এক অদ্ভুত পাথর্ক্য তৈরি করে। লেকের ওপর দিয়ে চলে যাওয়া বাঁশের সাঁকো আর ছোট ছোট নৌকা এখানকার যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। দিনের বেলা এখানে ছোট ছোট চায়ের দোকান আর বাজারগুলোতে থাকে উপচে পড়া ভিড়, যা এই জনপদের প্রাণচাঞ্চল্য ও জীবনযুদ্ধের কঠোর বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে। ফামিলি কার্ডের এই টাকা পেয়ে অনেকেই নতুন নতুন স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছেন।

সামিরন বেগম বলেন, ফ্যামেলি কার্ডের টাকায় আপাতত তিনি ঘর ভাড়া দিবেন। প্রতি মাসে এই টাকা পেলে কয়েক মাস গেলে তিনি খরচ না করে একটু জায়গা কিনে একটি ঘর করার জন্য টাকা জমাবেন।

বিএনপি সরকার গঠনের পর ভোটের কালির চিহ্ন মুছে যাওয়ার আগেই মাত্র ২১ দিনে ফ্যামেলি কার্ড কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফ্যামেলি কার্ড বগুড়া থেকে উদ্বোধনের কথা শোনা গেলেও পরে গত ১০ মার্চ ঢাকা-১৭ আসনের কড়াইল বস্তিতে উদ্বোধন করা হয়। প্রতি মাসের নির্দিষ্ট সময়ে সুবিধাভোগীদের মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব নম্বরে দুই হাজার ৫০০ টাকা চলে যাবে। শুরুতে ৩৭ হাজার ৫৬৭ নারীর নামে ফ্যামিলি কার্ড হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, এখন পাইলট প্রকল্প শুরু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের চার কোটি পরিবারকেই ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আগামী জুন পর্যন্ত চার মাসের জন্য এই কর্মসূচিতে ৩৮ কোটি সাত লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে প্রথমে ৬৭ হাজার ৮৫৪টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সফটওয়্যারের মাধ্যমে দারিদ্র্য সূচক নির্ধারণ করে এই পরিবারগুলোকে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত হিসেবে চিহ্নিত ৫১ হাজার ৮০৫টি পরিবারের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়। যাচাই শেষে ৪৭ হাজার ৭৭৭টি পরিবারের তথ্য সঠিক পাওয়া যায়। পরবর্তীতে একই ব্যক্তি একাধিক ভাতা নিচ্ছেন কি না, সরকারি চাকরি বা পেনশন সুবিধা পাচ্ছেন কি না- এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্তভাবে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি পরিবারের নারী প্রধানকে কার্ডের সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হয়। যারা পেয়েছেন সবাই ফ্যামিলি কার্ডের উপকার ভোগ করছেন।