চারিদিকে তখন সুনসান নীরবতা। কেমন যেন একটা গা ছমছমে ভাব লক্ষ্য করলাম সেখানে। এর মধ্যে হঠাৎ বোটকা একটা গন্ধ নাকে এসে লাগলো। আমাদের গাইড রনি ভাই ফিসফিস করে বললেন, সামনেই বাঘের ঘর। মুহূর্তেই শরীরে আশ্চর্য এক শিহরণ উপলব্ধি করলাম। এরপর বাম দিকে মোড় নিতেই চোখ পড়ল অতিকায় এক রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দিকে। মোটা মোটা অগণিত লোহার শিক বাঘ আর আমাদের মধ্যে একটা জুতসই অন্তরাল সৃষ্টি করেছে। সত্যি বলতে কী, এরকম বন্দী অবস্থায় থাকার পরও রাজামশাইয়ের রাজকীয় চাহনি আমাকে রীতিমতো সম্মোহিত করে তুলল। অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, আমার দিকেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে। এভাবে কতক্ষণ সময় অতিবাহিত হয়েছে সেটা অবশ্য ঠিক বলতে পারব না, তবে ঘোর কাটল ক্যামেরাম্যান আল-আমিন ভাইয়ের ফিসফিসানিতে।
চমৎকার একটা শট ক্যামেরাবন্দী করার জন্য তিনি আমাদেরকে তাগিদ দিচ্ছিলেন। তার কথা শুনে আমরা সবাই যার যার জায়গা থেকে কিছুটা সরে দাঁড়ালাম। অতঃপর পজিশন মতো ক্যামেরা রেখে আল-আমিন ভাই তার কাক্সিক্ষত শটটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিয়ে নিতে চেষ্টা করলেন। এতক্ষণ ‘মহারাজা’ একপ্রকার নিষ্ক্রিয় অবস্থাতেই ছিল বলা যায়; কিন্তু হঠাৎ তার মধ্যে একটা চাঞ্চল্যের ভাব দেখতে পেলাম। অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে এই রহস্যের সমাধান করলেন রনি ভাই। তিনি জানালেন, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বাঘের জন্য খাবার চলে আসবে। কথাটা শোনামাত্র ক্যামেরাম্যান আল-আমিন ভাই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বললেন, তাহলে তো ভালোই হয়, মহারাজার খাওয়ার দৃশ্য এই ফাঁকে ক্যামেরাবন্দী করা যাবে নিশ্চয়ই। এরপর কালবিলম্ব না করে সিঁড়ি বেয়ে সীমানা পাঁচিলের ওপরে আমরা সবাই অবস্থান নিতে লাগলাম। এদিকে, কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই গগনবিদারী গর্জনের শব্দ শুনে আমার বুকের ভেতরটা ধুক করে উঠল। উত্তেজনায় ক্রমাগত ‘ঢাক’ পেটানোর মতো শব্দ যেন শুনতে পাচ্ছিলাম নিজের ভেতর।
কিছুটা ধাতস্থ হয়ে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করলাম। কিন্তু রনি ভাইয়ের ইশারা পেয়ে মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিতে হলো। সবার দৃষ্টি তখন একেবারে সামনের দিকটাতে। মনে হলো একটা ‘হলুদ রঙের’ অবয়ব বিদ্যুৎ ঝলকের মতো চোখের সামনে দিয়ে বুঝি চলে গেল। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নিজের প্রকা শরীরটা নিয়ে হাজির হলেন ‘রাজামশাই’। দুর্ভেদ্য এক ঝোপের ভেতর এতক্ষণ গা ঢাকা দিয়েছিলেন। তাজা গোশতের লোভ সামলাতে না পেরে হয়তোবা আড়মোড়া ভাঙতে বাধ্য হয়েছেন শেষমেশ।
বাঘ বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঘ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র আড়াই ঘণ্টা কর্মতৎপর থাকে। বাকি সময়টা গাছের ছায়ায় শুয়ে-বসে শক্তি সংরক্ষণ করে। কম তাপমাত্রায় দেহের ক্ষয় কম হয় বলে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সময়টা বাঘ শিকারের পিছু লাগায় ব্যয় করে। বাঘের চোয়াল-দু’টি ভয়ঙ্কর শক্তিশালী। আর এই শক্তির আধার হচ্ছে ক্যানাইন দাঁত। উপর নিচের চোয়ালে যার সংখ্যা ২টি করে মোট ৪টি। প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় এই দাঁত লম্বায় প্রায় ১০ সেমি. বা ৪ ইঞ্চি। এদের প্রাথমিক কাজ হচ্ছে শিকারের নির্দিষ্ট স্থানে প্রচণ্ড শক্তিতে কামড়ে ধরা। বাঘের কামড়ের জোর প্রায় এক হাজার পঞ্চাশ পিএসআই। বাঘের কিন্তু চিবোনোর দাঁত নেই, তাই এরা গোশত গিলে ফেলে। বাঘ একবারে ৪০ কেজির মতো গোশত খেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক বাঘের দৈনিক ৭ থেকে ১০ কেজি গোশত দরকার। কেউ কেউ বলে থাকেন, বাঘ নাকি অন্যের শিকার করা প্রাণী ছোঁয় না, কথাটা মূলত একদমই ঠিক নয়। বাঘ শুধু অন্যের শিকার করা প্রাণীর গোশতই খায় না, উপরন্তু বনের মুর্দাফরাশ বা মেথরের কাজও এরা করে থাকে। শিকার ধরার জন্য কিংবা মানুষের আক্রমণে বাঘ অনেক সময় গাছে উঠে পড়ে। বাঘ সাধারণত মানুষের ওপর আক্রমণ করে না। তবে বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ বা আঘাতপ্রাপ্ত হলে যখন দ্রুতগামী বন্যজন্তু শিকারে অক্ষম হয়ে পড়ে তখনই মূলত সে নরখাদকে পরিণত হয়। আর একবার মানুষের রক্তের স্বাদ পেলে তখন মানুষ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণী শিকার করে না বাঘ।
মানুষখেকো বাঘ, সাধারণ বাঘের চেয়ে অত্যধিক চালাক বা ধূর্ত হয়। তারা শিকারিকে অনেক সময় বিভিন্ন টেকনিকে ফাঁদে ফেলতে চেষ্টা করে। তার মধ্যে একটি হলো- ‘সার্কেল’ তৈরি করা। যেমন, শিকারি যদি বাঘের পেছনে আসতে থাকে এবং বাঘ সেটা টের পেয়ে গেলে সেও তখন চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। মূলত, ঝানু শিকারি না হলে বিষয়টা বুঝতেই পারে না। বাঘ একসময় এভাবে ঘুরতে ঘুরতে শিকারির পেছনে এসে পড়ে অতর্কিতে আক্রমণ করতে চেষ্টা করে। সুন্দরবনের বাঘ কখনো কখনো মানুষখেকোতে পরিণত হয়। এ সম্পর্কে অবশ্য বেশ কিছু হাইপোথিসিস রয়েছে। বলা হচ্ছে, সুন্দরবনের বাঘ যেহেতু লোনা পানি পান করে, সে কারণে তাদের রক্তচাপ বেশি থাকে; যকৃৎ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মেজাজ খিঁচড়ে থাকে যার পরিণতি ‘মানুষ হত্যা’।
লেখক : এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



