সানমেরিনোকে হারিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস

Printed Edition

ক্রীড়া প্রতিবেদক

  • বাংলাদেশ ২-১ সানমেরিনো
  • ( তপু ২) : ( জিয়াকপেটি)

স্টাডিও অলিম্পিয়াকো ডি সেরাভাল্লে। সান মেরিনোর এই স্টেডিয়ামের ধারনক্ষমতা মাত্র ৬৬৬৪ জন। ইউরোপের বুকে থাকা একটি দেশের ফিফা প্রীতিম্যাচের স্টেডিয়ামের দর্শক ধারনক্ষমতা এত কম। সেই স্টেডিয়ামের অধিকাংশ দর্শকই আবার বাংলাদেশী। যারা এসেছিল মূলত সানমেরিনোর চার দিকে ঘিরে থাকা ইতালি থেকে। ম্যাচে সানমেরিনো খেলছিল সাদা জার্সি পরে। আর জামাল ভূঁইয়া-হামজা চৌধুরীদের গায়ে ছিল লাল জার্সি। তাই প্রথম দর্শনে যে কেউ-ই বিভ্রান্ত হচ্ছিলেন, সানমেরিনোর এতো দর্শক। আসলে তা নয়। ওই দর্শকরা বাংলাদেশের। সাদা জার্সি পরেই গ্যালারিতে আসেন ম্যাচের শুরু থেকেই তাদের গগন বিদারী চিৎকার। আর ম্যাচ শেষেতো তারা ঈদের আনন্দই করেছে। কারন প্রথমবার ইউরোপের মাঠে কোনো ইউরোপিয়ান দেশের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়। পরশু রাতে ইউরোপের বুকে লাল-সবুজ পতাকা হাতে বাংলাদেশীদের এই উল্লাসের উপলক্ষ এনে দিয়েছেন ডিফেন্ডার তপু বর্মণ। দুই অর্ধে তার করা জোড়া গোলেই সানমেরিনোকে ২-১ গোলে হারাল টমাস ডুলির দল। এই জয়ের ফলে বাংলাদেশ যেমন প্রথম ইউরোপ জয় করল, তেমনি জার্মান বংশোদ্ভূত মার্কিন কোচ টমাস ডুলির চাকরিটাও হয়তো চূড়ান্ত হয়ে গেল। জাতীয় দলের হয়ে ডিফেন্ডার হিসেবে ৮ গোল করলেন তপু। সেই সাথে ইউরোপের মাটিতে প্রথম গোল করা বাংলাদেশী ফুটবলারও তিনি।

ফিফা র‌্যাংকিংয়ে ২১১তে অবস্থান সানমেরিনোর। আর বাংলাদেশ আছে ১৮১তে। র‌্যাংকিংই বলে দিচ্ছিল ফুটবলে আসলে কতোটা পিছিয়ে ইতালী ঘেরা দলটি। তবে তাদের কিছু খেলোয়াড়ের স্কিল লাল-সবুজ জার্সিধারীদের চেয়েও ভালো। অবশ্য ৪-৩-৩ ফরমেশনে খেলা সফরকারীরা ময়দানী লড়াইয়ে এগিয়ে ছিল। জামাল ভূঁইয়াকে নেতৃত্ব দিয়েই দল মাঠে নামান কোচ ডুলি। কানাডা প্রবাসী শমিত শোম , যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী জায়ান আহমেদ এবং ইতালি প্রবাসী ফাহামিদুল ইসলামকে একাদশের বাইরে রেখে দল নামান কোচ। গোলের পরিস্কার সুযোগ পাওয়া, সঠিক পাস সব সাইডেই এগিয়ে ছিল সফরকারীরা। সেই সূত্র ধরেই ১৯ মিনিটে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া। ডান দিক থেকে করা শেখ মোরসালিনের ক্রসে দারুণ ড্রপ হেডে বিপক্ষ গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন স্টপার ব্যাক তপু বর্মণ। জাতীয় দলের হয়ে এটি ছিল বসুন্ধরা কিংসের এই খেলোয়াড়ের সপ্তম গোল।

অবশ্য বাংলাদেশ এই লিড বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেনি। ৩১ মিনিটেই ম্যাচে সমতা। ফিলিপ্পো বেরার্ডির পাস থেকে বল জালে পাঠান নিকোলাস জিয়াকপেটি। ডান দিকে শরীর ফেলেও বল রুখতে পারেননি বাংলাদেশ কিপার মিতুল মারমা। তবে এরপর রাঙ্গামাটির এই কিপার যেভাবে একের পর এক সানমেরিনোর গোল প্রচেষ্টা রুখে দিয়েছেন তা অবশ্যই প্রশংসার। যে কারণে বাংলাদেশ দল ম্যাচে থাকার শক্তিটা পেয়েছে। লাল-সবুজরা ৩৭ মিনিটে ফের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। তবে সাদ উদ্দিন বিপক্ষ কিপারকে একা পেয়েও গোল করতে ব্যর্থ হলে এগিয়ে যাওয়া হয়নি।

বিরতির পর কোচ টমার ডুলি একে একে খেলোয়াড় বদল করতে থাকেন। এই পরিবর্তন বাংলাদেশ দলের খেলায় গতি বাড়ায়। ঈসা ফয়সালের বদলে জায়ান আহমেদ, জামালের জায়গায় শমিত শোম, সোহেল রানার বদলে জায়গায় জুনিয়র সোহেল রানাকে নামান। এই জুনিয়র সোহেল রানা নামার পরপরই হামজা চৌধুরীর পাস থেকে ফাঁকা পোস্টে বল ঠেলতে পারেননি। তিনি বলে পা লাগাতেই পারেননি। এরপর ফয়সাল আহমেদ ফাহিম ফাঁকায় থেকেও কাছের পোস্টে বল ঠেলতে পারেননি। বল দ্বিতীয় পোস্টে ঠেললে তা পোস্টে লেগে প্রতিহত হয়।

এরপর ৮৬ মিনিটে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ফ্রি-কিক নেন বাংলাদেশের ফুটবলের বড় তারকা হামজা চৌধরী। সেই বল বক্সে হালকা ক্লিয়ার হলে তা গিয়ে পড়ে বদলি হিসেবে নামা বিশ্বনাথ ঘোষ বাইসাইকেল কিক নেন। এর আগেই হেড নিতে গিয়ে পড়ে যান। এরপর তিনি যখন উঠতে যাচ্ছিলেন তখনই বিশ^নাথের কিকটি আসে তার কাছে। ফলে সেই বল তপুর মাথায় লেগে গতি পাল্টিয়ে বোকা বানায় সানমেরিনোর গোলরক্ষককে। এতে শুরু হয় গ্যালারিতে বাংলাদেশীদের জয়ের প্রস্তুতি।

তবে ইনজুরি টাইমে এতক্ষণ ভালো খেলা গোলরক্ষক মিতুল মারমা যে ভুলটি করেন তা জয়ই কেড়ে নিতে যাচ্ছিল। বল তার হাত ও পায়ের ফাঁক গলে গোললাইন অতিক্রম করতে যাচ্ছিল। এরপর অবশ্য তিনিই সেই বল গোললাইনের উপর থেকে থামান। যদিও সানমেরিনোর খেলোয়াড়রা গোলের দাবিই করেছিলেন। ম্যাচ শেষে সানমেরিনো এই গোল ছিল বলেই দাবি করেছিল। তাদের দাবি ভিডিও অ্যাসিস্টেন্স রেফারি থাকলে এই গোল হিসেবেই স্বীকৃত হতো। তাদের মতে, রেজাল্টটা ডাকাতি করা হয়েছে। মনে হচ্ছে ফিফা চালাচ্ছে বাংলাদেশ।

ম্যাচে বাংলাদেশ দলের গোল মিস গুলো কষ্ট দিয়েছে কোচ ডুলিকে। তাই তিনি ম্যাচ শেষে জানান, আমার গোলের জন্য অনেকগুলো সুযোগের অপেক্ষায় থাকি। সে সাথে ফাস্ট টাচও ঠিক হয় না। রিসিভিংও সঠির হয় না। সে সাথে মানসিকায় পরিবর্তন আনতে হবে। পরিবর্তন আনবো কোচিং স্টাইলেও।