বাড়তি খরচের চাপে ফেনীর বোরো চাষিরা

বাম্পার ফলনেও কৃষকের মুখে হাসি নেই

শাহাদাত হোসাইন, ফেনী অফিস
Printed Edition
পাকা বোরো ক্ষেত পরিদর্শনে কৃষি কর্মকর্তা : নয়া দিগন্ত
পাকা বোরো ক্ষেত পরিদর্শনে কৃষি কর্মকর্তা : নয়া দিগন্ত

ফেনীতে চলতি মৌসুমে বোরো ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। সময় মতো বৃষ্টিপাত এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ কম থাকায় এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি উৎপাদন হয়েছে। তবে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাম্পার ফলনের মধ্যেও স্বস্তি নেই কৃষকের মুখে। লাভের আশা তো দূরের কথা, অনেকেই এখন খরচ তুলতে পারবেন কি না সেই আশঙ্কা করছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, জেলার ছয় উপজেলায় চলতি মৌসুমে ৩১ হাজার ৪০৮ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আবাদ হয়েছে ৩১ হাজার ৪১৭ হেক্টরে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৮ হাজার ৭০৩ হেক্টর, ছাগলনাইয়ায় ৫ হাজার ৭৪৫, দাগনভূঞায় ৬ হাজার ৪৮৫, ফুলগাজীতে ৪ হাজার ৭১৯, পরশুরামে ৩ হাজার ২৫৫ এবং সোনাগাজীতে ২ হাজার ৫২০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে।

এগুলোর মধ্যে হাইব্রিড জাতের ধান আবাদ হয়েছে ৫ হাজার ৭৫৬ হেক্টর এবং উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান ২৫ হাজার ৬৭১ হেক্টরে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার পর্যন্ত প্রায় ৮৫ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। এপ্রিলের শেষ দিকে শুরু হওয়া বোরো কর্তন এ মাসের শেষ দিকে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

উৎপাদনের ক্ষেত্রেও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে ফলন। হাইব্রিড জাতের ধানে হেক্টরপ্রতি ৪ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও উৎপাদন হয়েছে ৪ দশমিক ৭৮ মেট্রিক টন। একইভাবে উচ্চ ফলনশীল জাতের ধানে ৩ দশমিক ৭৬ মেট্রিক টনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৩ দশমিক ৭৭ মেট্রিক টন।

সরেজমিন কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমের শেষ দিকে ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ খরচ বেড়ে যায়। পাশাপাশি শ্রমিক সঙ্কট ও বাড়তি মজুরিও তাদের চাপে ফেলেছে। সরকারি হিসাবে কেজিপ্রতি ধান উৎপাদন খরচ ২৫ টাকা ৩৩ পয়সা ধরা হলেও কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ব্যয় ৩০ টাকারও বেশি। তাদের মতে, সরকারি হিসাবে শ্রমিক মজুরি ৭৫০ টাকা ধরা হলেও মাঠে অনেক ক্ষেত্রে এর দ্বিগুণ পর্যন্ত দিতে হয়েছে।

পরশুরাম উপজেলার অনন্তপুর গ্রামের কৃষক মো: নয়ন বলেন, শ্রমিক সঙ্কটের কারণে ধান কাটতে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। তাদের এলাকায় জনপ্রতি শ্রমিক মজুরি দিতে হয়েছে প্রায় এক হাজার ৫০০ টাকা। একই চিত্র দাগনভূঞার বিভিন্ন এলাকাতেও। সেখানে এক হাজার টাকার নিচে শ্রমিক পাওয়া যায় না বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।

তবে সদর উপজেলার মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, সব এলাকায় একই পরিস্থিতি ছিল না। লেমুয়া ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শিপন চৌধুরী বলেন, তার এলাকায় শ্রমিক মজুরি খুব বেশি বাড়েনি। এ ছাড়া ডিজেলের দাম বৃদ্ধিরও বড় প্রভাব পড়েনি এখানে। কারণ, ধান পরিপক্ব হওয়ার পর বৃষ্টিপাত হওয়ায় অতিরিক্ত সেচের প্রয়োজন হয়নি। ওই এলাকায় ইতোমধ্যে ৯৫ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো: আতিক উল্যাহ বলেন, অনুকূল আবহাওয়া, সুষম সার ব্যবহার এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ বাস্তবায়নের ফলে এবার বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ বাড়ার বিষয়টি মাথায় রেখে কৃষকদের অধিক ফলনশীল জাতের চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তিনি জানান, এবার জেলায় ব্রি-১০৮ জাতের ধানে সবচেয়ে বেশি ফলন পাওয়া গেছে। হেক্টরপ্রতি প্রায় ৩ দশমিক ৮ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে আরো বেশি।