বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, একদিকে কিছু খাতে স্থিতিশীলতা ও পুনরুদ্ধারের আভাস মিললেও অন্যদিকে ব্যাংকিং খাত ও বিনিয়োগ পরিবেশে গভীর চাপ বিদ্যমান। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের সর্বশেষ তথ্যের আলোকে এলসি কার্যক্রম, মুদ্রাস্ফীতি, খেলাপি ঋণ এবং কৃষি-শিল্প ঋণপ্রবাহে এই মিশ্র চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
অন্যদিকে বৈদেশিক খাত, রিজার্ভ, মুদ্রা সরবরাহ এবং আর্থিক বাজারের সূচকগুলো একটি জটিল কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। অর্থনীতির এই অংশে স্থিতিশীলতা ও চাপ- উভয়ের সহাবস্থান স্পষ্ট।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, একদিকে কিছু খাতে স্থিতিশীলতা ও পুনরুদ্ধারের আভাস মিললেও অন্যদিকে ব্যাংকিং খাত ও বিনিয়োগ পরিবেশে গভীর চাপ বিদ্যমান। সর্বশেষ তথ্যের আলোকে এলসি কার্যক্রম, মুদ্রাস্ফীতি, খেলাপি ঋণ এবং কৃষি-শিল্প ঋণপ্রবাহে এই মিশ্র চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
আমদানি প্রবাহে মিশ্র ধারা
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০.৪৩ বিলিয়ন ডলার। তবে খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ২৫.৪২ শতাংশ পতন ঘটেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি শিল্প বিনিয়োগে স্থবিরতার ইঙ্গিত দেয়। একই সাথে ভোগ্যপণ্য ও অন্তর্বর্তী পণ্যের আমদানিতেও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। বিপরীতে শিল্প কাঁচামাল আমদানিতে ৮.৩৭ শতাংশ এবং পেট্রোলিয়াম আমদানিতে ৬.৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির উৎপাদনমুখী কার্যক্রম চালু থাকার ইঙ্গিত বহন করে। বিশেষ করে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি নিষ্পত্তিতে ১৮.৬২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রফতানিমুখী শিল্পের স্থিতিশীলতা নির্দেশ করে।
২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বারো মাসের গড় মুদ্রাস্ফীতি কমে ৮.৬০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা জুন ২০২৫-এ ছিল ১০.০৩ শতাংশ। তবে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মুদ্রাস্ফীতি এখনো ৮.৭১ শতাংশ থাকায় মূল্যস্তরে অস্থিরতা পুরোপুরি কাটেনি। যদিও এটি আগের বছরের তুলনায় কিছুটা সহনীয়, তবুও ভোক্তাপর্যায়ে চাপ অব্যাহত রয়েছে।
খেলাপি ঋণে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি
ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ২০.২০ শতাংশ থেকে বেড়ে জুন ২০২৫-এ ৩৪.৪০ শতাংশে পৌঁছানো এই হার ডিসেম্বর ২০২৫-এ কিছুটা কমে ৩০.৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। নিট খেলাপি ঋণের হার ১৩.৯৩ শতাংশ- যা ব্যাংকগুলোর প্রকৃত ঝুঁকির গভীরতা নির্দেশ করে। এই প্রবণতা ঋণ বিতরণে সতর্কতা বাড়াচ্ছে এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
বৈদেশিক খাত, রিজার্ভ, মুদ্রা সরবরাহ এবং আর্থিক বাজারের সূচকগুলো একটি জটিল কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সপ্তাহের নির্বাচিত সূচকের তথ্য অনুযায়ী অর্থনীতির এই অংশে স্থিতিশীলতা ও চাপ- উভয়ের সহাবস্থান স্পষ্ট।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণ হয়েছে ৩০,৫৯৯ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৭৮.৪৬ শতাংশ। আগের বছরের তুলনায় এতে ২৩.০৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একই সময়ে ঋণ আদায়ও ১৫.৪০ শতাংশ বেড়ে ৩১,৬৬৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই প্রবণতা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ প্রবাহ ও উৎপাদনকার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে এসএমই ঋণ বিতরণ হয়েছে ৭০,১৭০ কোটি টাকা, তবে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা শ্লথ। শিল্প মেয়াদি ঋণ বিতরণ হয়েছে ৩১,২৪৭ কোটি টাকা, আর বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪,২৩,৫৮৬ কোটি টাকা, যা ১১.৪৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। কিন্তু বিনিয়োগের গতি কাক্সিক্ষত মাত্রায় পৌঁছায়নি।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হার
২০২৬ সালের এপ্রিল শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (বিপিএম৬ পদ্ধতিতে) প্রায় ২৬-৩০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে অবস্থান করছে, যা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা নি¤œমুখী হলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিয়েছে। রিজার্ভের এই স্তর আমদানি ব্যয় মেটাতে সীমিত স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে চাপের ঝুঁকি রয়ে গেছে।
অন্যদিকে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে টাকা-ডলার বিনিময় হার ক্রমাগত চাপের মধ্যে রয়েছে, যা আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির ওপর প্রভাব ফেলছে।
রেমিট্যান্স ও বাণিজ্য খাত
২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২৬.৮৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে- এটি বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে বড় ধরনের সহায়তা দিয়েছে।
আমদানির ক্ষেত্রে (সিঅ্যান্ডএফ) ৬৮.৩৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে, যেখানে প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ২.৪৪ শতাংশ। অন্যদিকে রফতানি আয় ৪৩.৯৭ বিলিয়ন ডলার, যা ৭.৭২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
তবে বাণিজ্য ঘাটতি ও চলতি হিসাবের ভারসাম্য এখনো নেতিবাচক। অর্থবছর২৫-এ কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স ঘাটতি রয়েছে, যদিও আগের তুলনায় তা কিছুটা কমেছে।
শেয়ারবাজারে নি¤œমুখী প্রবণতা
দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স জুন ২০২৪-এর তুলনায় ৭.৭০ শতাংশ কমেছে এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সিএএসপিআই সূচক ৮.৩৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এটি আর্থিক খাতে আস্থার সঙ্কট এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার প্রতিফলন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩,৭০,৮৭৪ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছে, যেখানে প্রবৃদ্ধি মাত্র ২.২৩ শতাংশ - যা সরকারের ব্যয় নির্বাহে সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে সঞ্চয়পত্রে নিট বিক্রি ঋণাত্মক (-৬,০৬৩ কোটি টাকা), যা সাধারণ মানুষের বিকল্প বিনিয়োগ প্রবণতা বা নগদ সঙ্কটের ইঙ্গিত দেয়।
মুদ্রা সরবরাহ ও ঋণপ্রবাহ
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রিজার্ভ মানি (আরএম) ও ব্রড মানি (এম২) যথাক্রমে ১৩.৩৫ শতাংশ ও ১০.৫২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে (বছরওয়ারি ভিত্তিতে)।
মোট অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহ ১১.৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ৩৩.৫৭ শতাংশ বেড়েছে- যা সরকারি ঋণনির্ভরতার প্রবণতা নির্দেশ করে। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.০৩ শতাংশ, যা বিনিয়োগের ধীরগতিকে প্রতিফলিত করে।
সার্বিক মূল্যায়ন
এই বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে ‘সঙ্কুচিত প্রবৃদ্ধি ও সীমিত স্থিতিশীলতা’-এর পর্যায়ে রয়েছে। রেমিট্যান্সপ্রবাহ ও রফতানি আয়ে ইতিবাচক ধারা থাকলেও রিজার্ভের চাপ, শেয়ারবাজারের পতন এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক খাতের ভারসাম্য রক্ষা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ এখন অত্যন্ত জরুরি।
জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে নি¤œমুখী প্রবণতা
জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারায় ধারাবাহিক পতন লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের ৭.১০ শতাংশ থেকে কমে ২০২৩-২৪-এ ৪.২২ শতাংশ এবং সর্বশেষ সংশোধিত প্রাক্কলনে ২০২৪-২৫-এ ৩.৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাহিদা ও বিনিয়োগ সঙ্কোচনের প্রতিফলন।
সার্বিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল পর্যায়ে অবস্থান করছে। একদিকে মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও খেলাপি ঋণ ও বিনিয়োগ স্থবিরতা ব্যাংকিং খাতকে চাপে রাখছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে পতন দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য সতর্কসঙ্কেত। তবে কৃষিঋণ ও শিল্প কাঁচামাল আমদানির ইতিবাচক ধারা অর্থনীতিকে পুরোপুরি স্থবির হতে দিচ্ছে না। এই প্রেক্ষাপটে আর্থিক খাত সংস্কার, ঋণশৃঙ্খলা জোরদার এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।



