মাটি খেকোদের দৌরাত্ম্যে শত শত একর কৃষিজমিতে গভীর খাদ

Printed Edition

মনিরুজ্জামান সুমন দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা)

চুয়াডাঙ্গার দর্শনা এলাকার চণ্ডীপুর ছডাঙ্গার বিস্তীর্ণ মাঠে পুকুর খননের নামে অব্যাহতভাবে মাটি ও বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বছরের পর বছর ধরে প্রভাবশালী একটি চক্র আধুনিক এক্সকাভেটর (ভেকু) ও ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে কৃষিজমির উর্বর মাটি কেটে বিক্রি করছে। ফলে শত শত একর জুড়ে বিস্তৃত মাঠের বড় একটি অংশ এখন গভীর খাদে পরিণত হয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, মাঠজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে একের পর এক বিশাল গর্ত। কোথাও কোথাও ৩০ থেকে ৪০ ফুটেরও বেশি গভীর খাদ সৃষ্টি হয়েছে। যার একেকটির আয়তন ৮ থেকে ১০ বিঘা জমির সমান। অথচ পুকুর খননের যে উদ্দেশ্যের কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে সেখানে স্থায়ী জলাধার বা মাছ চাষের তেমন কোনো কার্যক্রমের চিহ্ন নেই।

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, একসময় যে মাঠে ধান, ভুট্টা, পেঁপে, লাউসহ বিভিন্ন ফসলের প্রচুর ফলন হতো, সেখানে এখন ভয়ঙ্কর পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গভীর খাদের কারণে আশপাশের কৃষিজমি ধসে পড়ছে এবং বৃষ্টির পানিতে উর্বর মাটি ধুয়ে গর্তে চলে যাচ্ছে। এতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এভাবে মাটি কাটা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই অঞ্চলের বড় একটি অংশ কৃষি উৎপাদনের উপযোগিতা হারাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, কিছু প্রভাবশালী ও অর্থশালী ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের তোয়াক্কা না করে প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ বালু ও মাটি উত্তোলন করে আসছেন। দৃশ্যমান কোনো প্রতিরোধ না হওয়ায় চক্রটি আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের চারপাশের জমি কেটে বড় বড় গর্ত করা হয়েছে। বৃষ্টি হলেই জমির মাটি ধসে ওই গর্তে চলে যায়। কিন্তু প্রভাবশালীদের ভয়ে আমরা প্রতিবাদ করতে পারি না। নাম প্রকাশ হলে নানা ধরনের হয়রানি ও হুমকির শিকার হতে হয়। আরেক কৃষক বলেন, আজ যাদের জমি আছে, কাল হয়তো তা ধসে গিয়ে আর থাকবে না। ধীরে ধীরে মাঠের উর্বর মাটি শেষ হয়ে যাচ্ছে। ছোট কৃষকরা এতে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।

কৃষিজমি রক্ষায় স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে অবৈধ মাটি ও বালু উত্তোলন বন্ধে দ্রুত প্রশাসনিক অভিযান ও কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন। দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন আক্তার এই ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে বলেন, কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটির স্তর তৈরি হতে প্রকৃতির দীর্ঘ সময় লাগে। এই স্তর কেটে ফেলা হলে জমির উর্বরতা মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং ফলন হ্রাস পায়। এছাড়া বৃষ্টির সময় মাটি ক্ষয় বৃদ্ধি পায়, পাশের জমিতে ধস নামার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে জমি অনাবাদি হয়ে পড়ার পাশাপাশি এসব গভীর খাদে শিশু ও গবাদিপশুর পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।

এ বিষয়ে দামুড়হুদা ভারপ্রাপ্ত শাহিন আলম বলেন, শিগগিরই ওই মাঠে অভিযান পরিচালনা করা হবে। সম্প্রতি আমি নিজে সেখানে গিয়েছিলাম। আসলেই জায়গাটির অবস্থা খুবই খারাপ। দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়ম চলে আসছে। আমি নতুন দায়িত্বে এসেছি। এরই মধ্যে একবার পরিদর্শন করেছি। আবারো যাব। যত বড় প্রভাবশালীই হোক না কেন, আর যারাই এর পেছনে জড়িত থাকুক না কেন, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।