- সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে নাম দেবে না বিরোধী দল
- বাজেট অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করবে সরকার
কাওসার আজম
সংবিধান ‘সংস্কার’ ও ‘সংশোধন’ ইস্যুতে দূরত্ব বাড়ছে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে। সরকার সংবিধান সংস্কারের পথে হাঁটছে। এজন্য ইতোমধ্যে ১৭ সদস্যের ‘বিশেষ সংসদীয় কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব করেছে। এই কমিটিতে জামায়াত জোট থেকে পাঁচজনের নাম চাওয়া হয়েছে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ১১ দলীয় ঐক্য সরকারের এই প্রস্তাবকে নাকচ করে দিয়ে বলেছে, সংশোধন নয়, তারা সংবিধান সংস্কারের পক্ষে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে এই ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের বক্তব্যে উত্তপ্ত ছিল অধিবেশন। সংসদ অধিবেশন শেষে তা রাজপথে গড়িয়েছে। সংস্কার ইস্যুতে জনগণের কাছে যেতে চায় বিরোধী দল। তাই আগামী ১৬ মে রাজশাহীতে বিভাগীয় সমাবেশের মাধ্যমে মাঠের রাজনীতিতে নামছে বিরোধী দল। সর্বশেষ আগামী অক্টোবরে ঢাকায় মহাসমাবেশ করারও কথা রয়েছে এই জোটের। তবে, সরকার আশা করছে, আসন্ন বাজেট অধিবেশনে বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নাম আসবে। সেই পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকবে সরকারি দল।
সংবিধান সংস্কারে প্রস্তাবিত বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনে সরকারি দল বিএনপি উদ্যোগ নিলেও প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্রদের কাছ থেকে এখনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। মূলত সংবিধান ‘সংস্কার’ নাকি ‘সংশোধন’-এই বিতর্ক এবং কমিটিতে সমানসংখ্যক সদস্য রাখার দাবিতে আটকে আছে পুরো প্রক্রিয়া। সহসা এ জট কাটার সম্ভাবনাও দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।
সংসদের প্রথম অধিবেশনে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন। ১৭ সদস্যের ওই কমিটিতে সরকারি বেঞ্চ থেকে ১২ জনের নামের তালিকা প্রস্তুত করা হয়। এর মধ্যে বিএনপির সাতজন এবং গণ অধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ও স্বতন্ত্র সদস্যদের মধ্য থেকে বাকি পাঁচজনকে রাখা হয়। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় ঐক্যের কাছে আরো বাকি পাঁচজনের নাম চাওয়া হয়।
গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এই বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিরোধী দল পাঁচজনের নাম দিলেই জুলাই সনদের আলোকে সামনে এগোতে চায় সরকার। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালও বিরোধী দলকে দ্রুত সদস্যদের নাম দেয়ার আহ্বান জানান। তবে সেই আহ্বানে সাড়া দেয়নি জামায়াতে ইসলামী। এদিন দলটির আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান তাৎণিকভাবে কোনো নাম দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে তাদের সাথে সরকারের ‘কনসেপচুয়াল ডিফারেন্স’ বা ধারণাগত পার্থক্য রয়েছে। তার ভাষায়, তারা চেয়েছেন ‘রিফর্ম’ বা সংস্কার, কিন্তু সরকার করছে ‘অ্যামেন্ডমেন্ট’ বা সংশোধন।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, বিএনপি জুলাই সনদের মাহাত্ম্য কলুষিত করেছে এবং এটিকে প্রতারণার দলিলে পরিণত করেছে। তার দাবি, বিএনপি সংস্কারের পথ থেকে সরে গিয়ে এখন কেবল নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের দিকেই মনোযোগ দিচ্ছে।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে মোট ২৫ কার্যদিবসে ৯৪টি বিল পাস হয়েছে, ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে গণভোট অধ্যাদেশসহ ২০টি বাতিল হয়েছে। দুই হাজার ৫০৯টি প্রশ্নের মধ্যে এক হাজার ৭৭৮টির উত্তর দিয়েছেন মন্ত্রীরা। কিন্তু সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু-সংবিধান সংস্কার বা সংশোধনের প্রশ্নে কোনো ঐকমত্য তৈরি হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের টানাপড়েন অনেকটাই অনুমিত ছিল। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের তৈরি জুলাই সনদের খসড়ায় ৩০টি দলের মতামত থাকলেও বিএনপি শুরু থেকেই বেশ কিছু প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা আপত্তি জানিয়েছিল। রাজনৈতিক পর্যবেকদের মতে, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মতায় আসার পর বিএনপি চাইছে সংবিধানের পরিবর্তনগুলো তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন, ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে হোক। অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপিসহ তাদের মিত্ররা বাহাত্তরের সংবিধানকে ‘ফ্যাসিস্ট ও মুজিববাদী’ দলিল আখ্যা দিয়ে এর আমূল সংস্কারের পে অবস্থান নিয়েছে।
বিএনপি নেতারা বলছেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘সংশোধন’ই সাংবিধানিক পথ, কারণ সংবিধানে ‘সংস্কার’ নামে কোনো সাংবিধানিক শব্দ নেই। তবে বিরোধী শিবিরের দাবি, কেবল সংশোধন নয়, রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্বিন্যাসের জন্য মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি নয়া দিগন্তকে বলেন, আইনমন্ত্রী আমাদের কাছে বিশেষ কমিটিতে নাম দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন, কিন্তু, আমরা দেব না। কারণ, আমরা তো সংবিধানের সংস্কার চাচ্ছি, সংশোধন চাচ্ছি না। এটা আমাদের আগেরই সিদ্ধান্ত। এরপর বিরোধীদলীয় নেতা তো বলেছেন যে, আমরা পরে (বিশেষ কমিটিতে নাম দেয়া) জানাবো।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন এমপি বলেন, সরকার এখনো বিরোধী দলের সদস্যদের নামের অপোয় রয়েছে। বিরোধী দল এগিয়ে এলে সরকার সবাইকে নিয়ে একটি প্রাণবন্ত সংসদ গড়তে চায়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার পর্যবেণ করছে এবং যেহেতু সংসদের অধিবেশন চলছে না ও বিরোধী দল এখনো কোনো নাম দেয়নি, তাই আগামী বাজেট অধিবেশন পর্যন্ত অপো করতেই হবে।
জামায়াতে ইসলামীর আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, এ কমিটির সাথে (সংবিধান সংশোধন) তারা নীতিগতভাবে একমত নন। তাই সেখানে সদস্য দেয়ার সুযোগ নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার সবকিছু পাস করিয়ে নিলেও তা টিকবে না। শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল কায়েম করেছিলেন, সেটি টেকেনি; শেখ হাসিনা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছিলেন, সেটিও শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়নি।
১১ দলীয় জোট সূত্রে জানা যায়, সরকার গণভোটকে ‘না’ করে দেয়ার পর বিষয়টি জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে চায় জামায়াতজোট। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে আগামী ১৬ মে রাজশাহী আলিয়া মাদরাসা মাঠে ১১ দলীয় জোটের সমাবেশ রয়েছে। যেখানে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানসহ জোটের শীর্ষনেতারা অংশ নিচ্ছেন। এরপর আগামী ১৩ জুন চট্টগ্রামে, ২০ জুন খুলনায়, ২৭ জুন ময়মনসিংহে, ১১ জুলাই রংপুরে, ১৮ জুলাই বরিশালে এবং ২৫ জুলাই সিলেটে বিভাগীয় সমাবেশ করবে এই জোট। এসব সমাবেশে সিটি করপোরেশন, বিভাগীয় শহর ও জেলাকে সম্পৃক্ত করা হবে। সবশেষে আগামী অক্টোবরে রাজধানী ঢাকায় মহাসমাবেশ করবে বলে জানা যায়।
বিভাগীয় সমাবেশের কর্মসূচির পাশাপাশি জেলা পর্যায়ে লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের সাথে মতবিনিময়ের কর্মসূচি রাখা পালন করবে জামায়াত-এনসিপি জোট।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি রাজনৈতিক মিত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি-জোট ক্ষমতায় আর জামায়াত-জোট বিরোধী দলে। চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি জুলাইকে ঘিরেই হবে। তারা বলছেন, ঈদের পরপরই বসছে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন। শেষ পর্যন্ত বিরোধী দল সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটিতে সদস্য দেবে নাকি রাজপথের আন্দোলনে যাবেÑ সেটিই বড় প্রশ্ন। একই সাথে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধনের পথে হাঁটবে, নাকি বিরোধীদের সাথে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবে, সেটিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।



