নিজস্ব প্রতিবেদক
একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য কবি, সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আল মুজাহিদী আর নেই। গতকাল শুক্রবার বেলা ১টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
তিনি স্ত্রী পলিন পারভীন, ছেলে শাবিব আল মুজাহিদী, মেয়ে মারিয়ামা জাবীন আল মুজাহিদী, নাতি-নাতনীসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার ছেলে একাত্তর টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, কবি আল মুজাহিদী দীর্ঘ দিন থেকে অসুস্থতায় ভুগছিলেন। বুধবার দুপুর সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় তাকে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয়।
চিকিৎসকরা জানান, তার শরীরের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঠিকভাবে কাজ করছিল না। প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে কথা বলতে পারছিলেন না তিনি। গতকাল বাদ এশা কবি আল মুজাহিদীর প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় মসজিদে। আজ সকাল ১০টায় দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় প্রেস ক্লাবে। এরপর সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য লাশ নিয়ে যাওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন ও নামাজে জানাজা শেষে তাকে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হবে।
প্রেম, জীবন ও মৃত্তিকা ছিল আল মুজাহিদীর কবিতার মূল বিষয়। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, অনুবাদ ও শিশু-কিশোর মিলিয়ে তার গ্রন্থসংখ্যা প্রায় ১০০। সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক’ ‘জীবনানন্দ দাশ অ্যাকাডেমি পুরস্কার’, ‘হ্নকবি জসীমউদ্দীন পুরস্কার’, হ্ন‘মাইকেল মধুসূদন অ্যকাডেমি পুরস্কার’, ‘হ্নশেরেবাংলা সংসদ পুরস্কার’, ‘বাসাসপ কাব্যরতœ পদকসহ বহু পুরস্কার পেয়েছেন।
তিনি ১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার নারুচি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনে ছাত্ররাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য ছিলেন। দৈনিক ইত্তেফাকে তিনি তিন দশকের বেশি সময় সাহিত্য সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ সরকার কবি আল মুজাহিদীকে একুশে পদকে ভূষিত করে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শোক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৯৬০-এর দশকের বিশিষ্ট ছাত্রনেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, খ্যাতিমান সাংবাদিক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
গতকাল এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, মুজাহিদী আজীবন গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে দৃঢ় ভূমিকা পালন করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার মৃত্যু আমাদের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
জামায়াত : বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি আল মুজাহিদীর ইন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান এমপি। শোকবাণীতে তিনি বলেন, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের কবি হিসেবে তার সাহিত্যকর্ম ও সৃজনশীল অবদান বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। জাতি কৃতজ্ঞতার সাথে তার অবদান স্মরণ করবে। তিনি বলেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার জীবনের সব নেক আমল ও খেদমত কবুল করুন। তার সব ভুলত্রুটি ও গুনাহ ক্ষমা করে সেগুলোকে নেকিতে পরিণত করুন। তার কবরকে প্রশস্ত করে জান্নাতের নূরে পরিপূর্ণ করে দিন এবং তাকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন।
বিএফইউজে ও ডিইউজে : কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন-ডিইউজে। যৌথ শোকবাণীতে বিএফইউজে সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন ও মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী এবং ডিইউজে- সভাপতি শহিদুল ইসলাম ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম বলেন, কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে সাংবাদিক ও সাহিত্যিাঙ্গন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হারালো, যা পূরণ হওয়ার নয়।
কবিতা বাংলাদেশের শোক
বাংলাদেশের অন্যতম কবি, ষাটের দশকের তুখোড় ছাত্রনেতা, মুক্তিযোদ্ধা, কবিতা বাংলাদেশের সভাপতি কবি আল মুজাহিদীর ইন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন কবিতা বাংলাদেশের সহসভাপতি যথাক্রমে- কবি মোশাররফ হোসেন খান, কবি সোলায়মান আহসান, কবি হাসান আলীম, কবি আশরাফ আল দীন, কবি চৌধুরী গোলাম মাওলা, কবি শরীফ আবদুল গোফরান, কবি নাসির হেলাল, কবি জাকির আবু জাফর; সাধারণ সম্পাদক কবি ও গবেষক রাবি প্রফেসর ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ প্রমুখ।
শোকবার্তায় তারা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সাহিত্য আন্দোলনকে বিশুদ্ধ ধারায় পরিচালিত করতে তিনি ‘কবিতা বাংলাদেশ’ এর সভাপতি হিসেবে দক্ষতার সাথে কাজ করে গেছেন। বাংলা কবিতার আধুনিক ধারায় আল মুজাহিদী এমন একজন কবি, যিনি মাটি, মানুষ ও ইতিহাসকে একত্রে ধারণ করে একটি স্বতন্ত্র কাব্যভুবন নির্মাণ করেছেন। তার কবিতা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও জাতীয় আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত। সমকালীন সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, নৃতত্ত্ব, পুরাণ এবং আত্মদর্শনের নানা উপাদান তার কাব্যভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। এ জন্য তাকে ‘মৃত্তিকার কবি’ বলা হয়।
এডিটরস কাউন্সিলের শোক
প্রখ্যাত কবি ও প্রবীণ সাংবাদিক আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি)।
গতকাল এক যৌথ শোকবার্তায় এডিটরস কাউন্সিলের আহ্বায়ক শফিক রেহমান ও যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
শোকবার্তায় নেতারা বলেন, কবি আল মুজাহিদী একাধারে বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং সাংবাদিকতা জগতের এক দিকপাল ছিলেন। ষাটের দশকের অন্যতম প্রধান এই কবি তার ক্ষুরধার লেখনী ও অনন্য কাব্যশৈলী দিয়ে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। একুশে পদক পাওয়া এই সাংবাদিক তার দীর্ঘ কর্মজীবনে সাহসী ভূমিকার জন্য নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন।
সাহিত্যের পাশাপাশি মুক্ত গণমাধ্যম ও সাহসী সাংবাদিকতার বিকাশে কবি আল মুজাহিদীর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার মৃত্যুতে দেশের সাহিত্য ও সাংবাদিকতা জগতে এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো।
এডিটরস কাউন্সিল মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করছে এবং পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করছে যেন তিনি শোকাহত পরিবারকে এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার শক্তি দান করেন।



