সাক্ষাৎকার : মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম

ইসলামী ব্যাংককে রক্ষা করা মানে বাংলাদেশের অর্থনীতি রক্ষা করা

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বিশিষ্ট ব্যাংকার মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের সূচনালগ্ন থেকে শুরু করে এর বিকাশ, সাফল্যের শীর্ষারোহণ এবং পরবর্তী সময়ে মালিকানা পরিবর্তনসহ প্রতিটি অধ্যায় খুব কাছ থেকে দেখেছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ব্যাংকটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ (ডিএমডি) পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও রয়েছে তার বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতা; তিনি নাইজেরিয়ার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইসলামিক ব্যাংক ‘জাইজ ব্যাংক পিএলসি’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সৃষ্টি হওয়া নানামুখী সঙ্কট ও এর উত্তরণের উপায় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন নয়া দিগন্তের সাথে। তার মতে, দেশের শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামী ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে সরকারের অত্যন্ত দূরদর্শী ও পরিণামদর্শী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। সাক্ষাৎকারটির বিস্তারিত নিচে তুলে ধরা হলো।

সঙ্কট, স্থিতিশীলতা ও জাতীয় অর্থনীতি

নয়া দিগন্ত : আপনি এই ব্যাংকের একদম শুরুর সময় থেকে যুক্ত ছিলেন, শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দেশের বাইরেও ইসলামী ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠা করেছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসলামী ব্যাংকের সঙ্কটকে আপনি কিভাবে দেখছেন? এই ব্যাংকের স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কেন এতখানি গুরুত্বপূর্ণ?

মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম : ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড কেবল একটি প্রথাগত আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি চার দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রফতানি বাণিজ্য, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিতে এই ব্যাংকের অবদান এককভাবে অনন্য।

বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার সঙ্কটের এই সময়ে ইসলামী ব্যাংকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রেমিট্যান্স আহরণ, আমদানি-রফতানি অর্থায়ন এবং দেশের ভেতর উৎপাদনমুখী শিল্পে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে এই ব্যাংক জাতীয় অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। ফলে এর স্থায়িত্বের সাথে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সরাসরি জড়িত।

নয়া দিগন্ত : আপনি বলছেন এই ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে- এর কারণটা যদি একটু ব্যাখ্যা করতেন।

মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম : কারণ ইসলামী ব্যাংকের নেটওয়ার্ক ও কার্যক্রম দেশের অর্থনীতির একেবারে তৃণমূল থেকে শুরু করে করপোরেট খাত পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ব্যাংকের সাথে লক্ষাধিক উদ্যোক্তা, হাজার হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং প্রায় তিন কোটি গ্রাহক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত।

ফলে ইসলামী ব্যাংক কোনো কারণে সঙ্কটে পড়লে তা শুধু একটি ব্যাংকের সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর জনগণের আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি করবে। মানুষ যদি ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তবে আমানত তোলার হিড়িক পড়বে, নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে যাবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে একটি চেইন-অ্যাকশন বা বিপর্যয় নেমে আসবে।

নয়া দিগন্ত : বর্তমান সরকারের জন্যও কি এই বিষয়টি রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে সংবেদনশীল বলে মনে করেন?

মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম : অবশ্যই। তিন কোটি গ্রাহক মানে তিন কোটি পরিবার। তাদের আমানত ও স্বার্থ যদি বিঘিœত হয়, তবে জনগণের মাঝে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে। যেকোনো বড় অর্থনৈতিক অস্থিরতা দ্রুত সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপে রূপ নেয়। তাই বর্তমান সরকার ও নীতিনির্ধারকদের উচিত এই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা।

সুশাসন, মালিকানা বিতর্ক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা

নয়া দিগন্ত : ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত?

মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম : সবার আগে ব্যাংকের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও শতভাগ পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে। গ্রাহকদের মনে যেন কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা বা সংশয় না থাকে। আমানতকারীরা যাতে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে পারেন যে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ নিরাপদ আছে। এই আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকার এবং বর্তমান পরিচালনা পর্ষদকে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

নয়া দিগন্ত : অতীতে এস আলম গ্রুপের সম্পৃক্ততা ও মালিকানা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার অবস্থান কী?

মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম : আমার অবস্থান পরিষ্কার- অতীতের যেসব বিতর্কিত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে ইসলামী ব্যাংকের ভাবমর্যাদা এবং আর্থিক ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের সম্পূর্ণভাবে ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা থেকে দূরে রাখতে হবে।

ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যাদের পেশাগত সততা, ব্যাংকিং দক্ষতা এবং বিশেষ করে ‘ইসলামী ব্যাংকিং’ দর্শনের প্রতি সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ও নৈতিকতা রয়েছে। এটি করা গেলে তা শুধু এই ব্যাংকের জন্য নয় বরং পুরো আর্থিক খাতের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে।

নয়া দিগন্ত : ব্যাংকের বর্তমান কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম : এই ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দীর্ঘ চার দশক ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। এমনকি বিগত সঙ্কটের সময়েও সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক সচিব আরাস্তু খান একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে, ইসলামী ব্যাংকের কর্মীরা অত্যন্ত পেশাদার। নানা প্রতিকূলতা ও ঝড়ের মধ্যেও যে ব্যাংকটি টিকে রয়েছে, তার মূল কৃতিত্ব এই মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকদের আস্থা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য ‘ম্যানেজমেন্ট স্ট্রাকচার’ বা পরিচালনা কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। বিতর্কহীন ও যোগ্য ব্যক্তিদের নেতৃত্বে নিয়ে আসলে ব্যাংকটি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে।

নয়া দিগন্ত : এই সঙ্কট উত্তরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?

মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম : দেশীয় অর্থনীতির অভিভাবক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে তাদের উচিত ইসলামী ব্যাংকের তারল্য, মূলধন পর্যাপ্ততা, সুশাসন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা দেয়া। বিশেষ প্রয়োজনে ব্যাংকটিকে বিশেষ নীতিগত ছাড় বা আপৎকালীন আর্থিক সহায়তা দেয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত।

নয়া দিগন্ত : অতীতে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেয়া দরকার?

মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম : যেসব অর্থ অবৈধভাবে নামে-বেনামে বের করে নেয়া হয়েছে বা বিদেশে পাচার হয়েছে, সেগুলো উদ্ধারে সরকারকে সর্বোচ্চ আইনি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। দেশ-বিদেশে থাকা সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের সম্পদ ও শেয়ার অবরুদ্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে সেই বাজেয়াপ্ত হওয়া সম্পদ বা শেয়ার বিক্রি করে অর্জিত অর্থ ব্যাংকের মূলধনে যুক্ত করতে হবে, যাতে আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হয়।

তারুণ্যের স্মৃতি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

নয়া দিগন্ত : ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?

মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম : আমি অত্যন্ত আশাবাদী। সঠিক সুশাসন নিশ্চিত করা, দক্ষ-সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখতে পারলে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক আবার দেশের এক নম্বর ও সবচেয়ে শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। কারণ এই ব্যাংকের রয়েছে বিশাল ও অনুগত গ্রাহকভিত্তি, শক্তিশালী ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং একটি সুদৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য।

নয়া দিগন্ত : একটু পেছনের গল্পে যাই। আশির দশকে এই ব্যাংকে আপনার যোগদানের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম : এটি আমার জীবনের অন্যতম একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। ১৯৮০ সালের দিকে আমি অগ্রণী ব্যাংকে কর্মরত ছিলাম এবং একই সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ করছিলাম। সে সময় জানতে পারি, ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ অডিটোরিয়ামে ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের ওপর একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার হবে। ক্লাস ও ব্যাংকের ব্যস্ততার মাঝেও শিক্ষকদের বিশেষ অনুমতি নিয়ে আমি সেখানে যাই।

সেমিনারটির আয়োজক ছিল ‘ইসলামিক ইকোনমিক্স রিসার্চ ব্যুরো’। সেখানে ফখরুল হাসান, শাহ আবদুল হান্নান এবং ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অন্যতম পথিকৃৎ এম. আজিজুল হকের মতো গুণী মানুষদের আলোচনা শুনে আমি এতটাই অনুপ্রাণিত হই যে, মনে মনে সিদ্ধান্ত নিই- বাংলাদেশে যেদিনই ইসলামী ব্যাংক হবে, আমি সেখানে কাজ করব।

নয়া দিগন্ত : একদম শুরুতে ফ্রন্ট ডেস্কে কাজের কোনো বিশেষ স্মৃতি মনে পড়ে?

মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম : আমি যেহেতু অগ্রণী ব্যাংকে কম্পিউটারে কাজ করতাম, তাই প্রথাগত ব্যাংকিং অপারেশনের বাস্তব অভিজ্ঞতা শুরুতে কম ছিল। আমাদের তৎকালীন ব্যবস্থাপক মতিন উদ্দিন বারবী মিয়া আমাকে ফ্রন্ট ডেস্কে গ্রাহকদের ইসলামী ব্যাংকিং বোঝানো এবং অ্যাকাউন্ট খোলার দায়িত্ব দেন।

একটি ঘটনা খুব মনে পড়ে-শুরুর দিকে একবার আমাদের বেশ কিছুদিন ‘লেজার ব্যালেন্সিং’ করা হয়নি। ব্যাংকার হিসেবে বিষয়টি আমাকে খুব উদ্বিগ্ন করছিল। আমি ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মতিউদ্দিন ভূঁইয়া সাহেবকে গিয়ে বললাম, “স্যার, লেজার মিল না করে তো রাতে ঘুমানো যায় না। আজই এটা মিলাতে হবে।” তিনি হেসে আমাদের উৎসাহিত করলেন। সহকর্মী শামসুল আলম সাহেবসহ আমরা কয়েকজন মিলে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করে ব্যালেন্স মেলালাম। আমাদের জন্য রাতে পাউরুটি আর জিলাপির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেই রাত জাগা আর দায়িত্ববোধের স্মৃতি আজীবন মনে রাখার মতো।

নয়া দিগন্ত : ব্যাংকের প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ বা আইটি খাতের রূপান্তরে আপনার ভূমিকা সম্পর্কে বলুন।

মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম : ১৯৯৬ সালে আমাকে ব্যাংকের কম্পিউটার বিভাগের প্রধান করা হয়। তখন বিশ্ববাজারে আধুনিক কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল আর ইসলামী ব্যাংকিংয়ের উপযোগী সফটওয়্যার তো পাওয়াই যেত না। তখন আমরা দেশীয় প্রযুক্তিতে নিজস্ব সফটওয়্যার তৈরির চ্যালেঞ্জ নিই।

খ্যাতিমান তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মাহমুদ হোসেনের কারিগরি সহায়তা এবং আমাদের ব্যাংকিং লজিক ও জ্ঞানের সমন্বয়ে আমরা সফলভাবে তৈরি করি ‘ইআইবিএস’ সফটওয়্যার। ১৯৯৯ সালের মধ্যে আমাদের সব শাখা এর আওতায় আসে, যার ফলে অত্যন্ত সফলভাবে আমরা বিশ্বব্যাপী আলোচিত ‘ওয়াই২কে’ (সহস্রাব্দ পরিবর্তন) চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পেরেছিলাম।

নয়া দিগন্ত : আপনি ইসলামী ব্যাংককে প্রায়ই ‘ন্যাশন ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউশন’ বা রাষ্ট্র গঠনের প্রতিষ্ঠান বলেন, কেন?

মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম : কারণ এর কাজের পরিধি শুধু ঋণ দেয়া-নেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই ব্যাংকের ‘পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প’-এর মাধ্যমে দেশের প্রায় ৩০ হাজার গ্রামের ১৭ লক্ষাধিক প্রান্তিক মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে মুক্ত হয়েছে, যার বেশির ভাগই নারী। বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্প, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, আবাসন ও এসএমই খাতের বিকাশে এই ব্যাংকের অবদান এককভাবে সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া ‘ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কারিগরি কেন্দ্র পরিচালনা করে এটি মানবসম্পদ উন্নয়নে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে।

নয়া দিগন্ত : নাইজেরিয়ায় জাইজ ব্যাংক পিএলসির সিইও হিসেবে আপনার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার গল্পটি দিয়ে শেষ করতে চাই।

মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম : ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের সফলতা আন্তর্জাতিকভাবে এতটাই স্বীকৃত ছিল যে, নাইজেরিয়া সরকার যখন তাদের দেশে প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়, তখন আইডিবি তাদের বলে, “তোমরা বাংলাদেশে যাও এবং ইসলামী ব্যাংকের মডেল ও অভিজ্ঞতা ধার করো।”

তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে আইডিবি ও জাইজ ব্যাংকের অনুরোধে আমি নাইজেরিয়ায় ওআইসি ব্লকের এই ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব নিই। সেখানে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে ব্যাংকটিকে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করি, মূলধন বৃদ্ধি করি এবং এটিকে রিজিওনাল ব্যাংক থেকে নাইজেরিয়ার অন্যতম শীর্ষ ‘ন্যাশনাল ব্যাংকে’ উন্নীত করার গৌরব অর্জন করি। এটি আসলে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং মডেলেরই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

নয়া দিগন্ত : নয়া দিগন্তের পাঠকদের উদ্দেশ্যে আপনার মূল বার্তা কী?

মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম : আমার শেষ কথা একটাই- ইসলামী ব্যাংককে বাঁচানো মানে কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভবন বা কোম্পানিকে রক্ষা করা নয়; বরং দেশের অর্থনীতি, শিল্প, রেমিট্যান্স এবং কোটি মানুষের জীবিকাকে রক্ষা করা। দল-মত নির্বিশেষে দেশের স্বার্থে এই প্রতিষ্ঠানটিকে সুশাসন ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে আবার পুনর্গঠন করতে হবে। এটি করা গেলে ইসলামী ব্যাংক আবার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির অন্যতম প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে ভূমিকা পালন করবে।

নয়া দিগন্ত : আপনাকে ধন্যবাদ।

মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম : ধন্যবাদ নয়া দিগন্তকেও।