নয়া দিগন্ত ডেস্ক
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথভাবে ইরানের উপর বোমা হামলা বন্ধ করার পর ইসরাইল গত পাঁচ সপ্তাহে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় হামলা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে এবং বিধ্বস্ত ফিলিস্তিনি ছিটমহলটির দিকে তার অস্ত্রের শক্তি পুনঃনির্দেশিত করেছে।
সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডি, যারা গাজায় ইসরাইলি হামলার উপর নজর রাখে, গতকাল বুধবার এক রিপোর্টে বলেছে, ইসরাইল মার্চের তুলনায় এপ্রিলে ৩৫ শতাংশ বেশি হামলা চালিয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, ৮ এপ্রিল ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পর থেকে গাজায় ইসরাইলি হামলায় আটজন নারী ও ১৩ জন শিশুসহ ১২০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যা আগের পাঁচ সপ্তাহের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি। ২৮ এপ্রিল ইসরাইলি হামলায় যার এক ছেলে নিহত হয়েছিল, সেই দৃষ্টিহীন ফিলিস্তিনি লাফি আল-নাজ্জার রয়টার্স সংবাদ সংস্থাকে বলেন, ‘যুদ্ধ এখনো চলছে। ঘোষণায় বলা হয়েছে যুদ্ধ থেমে গেছে, কিন্তু বাস্তবে এবং মাঠপর্যায়ে যুদ্ধ থামেনি,’ তিনি যোগ করেন। তার পরিবার এক সময় গাজার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খান ইউনিসের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে বাস করছে। গাজায় ইসরাইলের দুই বছরের গণহত্যামূলক যুদ্ধের অংশ হিসেবে অক্টোবর থেকে সেখানে তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর থাকলেও, ইসরাইলি সামরিক বাহিনী সেখানে তাদের ক্রমবর্ধমান হামলার কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতায় হওয়া এই ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তির লক্ষ্য ছিল গাজায় বড় ধরনের লড়াই বন্ধ করা; কিন্তু ইসরাইলি বাহিনী ওই অঞ্চল থেকে সরে যায়নি। একই সাথে, ইসরাইল ত্রাণ সরবরাহের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে চলেছে এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় বাধা দিচ্ছে।
ইসরাইলি বাহিনী এখনো গাজার অর্ধেকেরও বেশি ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, যেখানে তারা অবশিষ্ট অনেক ভবন ভেঙে দিয়েছে এবং সমস্ত বাসিন্দাকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। উপকূল বরাবর একটি ছোট্ট ভূখণ্ডে এখন বিশ লাখেরও বেশি মানুষ বাস করে, যাদের বেশির ভাগই ক্ষতিগ্রস্ত কাঠামো বা অস্থায়ী তাঁবুতে থাকে এবং যেখানে হামাস যোদ্ধাদের কার্যত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় প্রায় ৮৫০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। একই সময়ে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে অন্তত চারজন ইসরাইলি সৈন্য নিহত হয়েছেন। মার্চ মাসে ইরানের ওপর বোমা হামলায় ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগ দেয়ার পর থেকে দেশটির সামরিক বাহিনী লেবাননেও স্থল অভিযান ও বিমান হামলা শুরু করেছে, যেখানে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি পৃথক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও, বিশেষ করে দেশটির দক্ষিণে লড়াই অব্যাহত রয়েছে।
ইসরাইলি কারাগারে ধর্ষণ-নির্যাতনের শিকার ফিলিস্তিনিরা
ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যা এবং পশ্চিম তীরে জমি দখল করে অবৈধ বসতি স্থাপনের বহু অভিযোগ রয়েছে। তবে, এবার ফিলিস্তিনি বন্দীদের ধর্ষণ এবং যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত বর প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদ মাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। পুলিৎজার বিজয়ী কলামিস্ট নিকোলাস ক্রিস্টফ প্রকাশিত একটি দীর্ঘ অনুসন্ধানী মতামত কলামে যৌন নির্যাতনের শিকার ১৪ জন ফিলিস্তিনি নারী-পুরুষের সাক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে। ইসরাইলি কারাগারে দেশটির সেনা, কারারক্ষী, বসতি স্থাপনকারী ও জিজ্ঞাসাবাদকারীদের দ্বারা ব্যাপক যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
কলামিস্ট ক্রিস্টফ লিখেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে আমাদের ভিন্নমত থাকলেও ধর্ষণের নিন্দায় আমাদের এক হওয়া উচিত। ইসরাইলি নেতারা ধর্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন বলে কোনো প্রমাণ না থাকলেও ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এমন একটি ‘নিরাপত্তা কাঠামো’ তৈরি করেছে যার মাধ্যমে যৌন সহিংসতা ইসরাইলের ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’-এর অংশে পরিণত হয়েছে।
ইসরাইলে নির্যাতনবিরোধী পাবলিক কমিটির নির্বাহী পরিচালক সারি বাশিই বলেন, ফিলিস্তিনি বন্দীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক যৌন নির্যাতন বাস্তব ঘটনা। কারাগারে এসব স্বাভাবিক করা হয়েছে। রিজার্ভ সেনাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ প্রত্যাহারের পর কড়া মন্তব্য করেন বাশিই। বাশিই-এর ভাষায়, অভিযোগ প্রত্যাহার করা মানে ধর্ষণের অনুমতি দেয়া। শেষে কলামিস্ট ক্রিস্টফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু আর্থিক ও সামরিকভাবে ইসরাইলকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, তাই এসব অভিযোগ মোকাবেলার দায় ওয়াশিংটনেরও রয়েছে। তিনি লেখেন, আমাদের আমেরিকান করের অর্থ ইসরাইলের নিরাপত্তা কাঠামোকে সহায়তা করছে। ফলে এমন যৌন সহিংসতার সাথে যুক্তরাষ্ট্রও জড়িত।
১৪ সাক্ষ্যদাতার মধ্যে ভুক্তভোগী ফিলিস্তিনি সাংবাদিক সামি আল-সাই বলেন, ২০২৪ সালে আটক হওয়ার পর কারারক্ষীরা তার ওপর প্রায়ই নির্যাতন চালিয়েছে। তিনি বলেন, তারা সবাই আমাকে মারছিল আর একজন আমার মাথা ও ঘাড়ের ওপর পা দিয়ে চেপে ধরে রেখেছিল। কারারক্ষীরা আমাকে বিবস্ত্র করে বিভিন্ন বস্তু দিয়ে নির্যাতন করছিল এবং অট্টহাসিতে মেতে উঠেছিল। এটা ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক ছিল। আমি মৃত্যুর জন্য প্রার্থনা করছিলাম।
ক্রিস্টফ এক ফিলিস্তিনি কৃষকের সাক্ষ্য তুলে ধরেছেন। কারারক্ষীদের যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি ওই কৃষক অভিযোগ করতে গেলে তাকে ধাতব লাঠি দিয়ে বারবার নির্যাতন করা হয়। তার দাবি, শিন বেত (ইসরাইলের অভ্যন্তীণ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য) কর্মকর্তারা তাকে প্রকাশ্যে কথা না বলতেও হুমকি দিয়েছিল।
রিপোর্টে ২০২৩ সালের পর গ্রেফতার হওয়া এক ফিলিস্তিনি নারীর বক্তব্যও রয়েছে। ওই নারী বলেন, ইসরাইলি সেনারা তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের ধর্ষণের হুমকি দিয়েছিল। তার ভাষায়, তাকে বারবার বিবস্ত্র করা হয়, মারধর করা হয় এবং যৌন হেনস্তা করা হয়। ওই নারী বলেন, তাদের (ইসরাইলি বাহিনীর সদস্যদের) হাত আমার পুরো শরীরে ছিল।
গাজার আরেক সাংবাদিকও আটক অবস্থায় নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, কেউ তাদের যৌন নির্যাতন থেকে রেহাই পায়নি।
ক্রিস্টফ কয়েকজন ফিলিস্তিনি কিশোরের সাক্ষাৎকারও নিয়েছেন। কিশোররা জানায়, আটক অবস্থায় ধর্ষণের হুমকি ছিল নিয়মিত ঘটনা। ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের ভাষ্য অনুযায়ী, কারারক্ষীরা বলেছিল, এটা করো (যৌনতার ইঙ্গিত), না হলে এই লাঠি তোমার শরীরে ঢুকিয়ে দেব। ক্রিস্টফ তার প্রতিবেদনে জাতিসঙ্ঘ, বি’তসেলেম , সেইভ দ্য চিলড্রেন, ইউরো মেইড হিউম্যান রাইটস মনিটর এবং কমিটি টু প্রটেক্ট জারনালিস্ট থেকে প্রকাশিত রিপোর্টের তথ্য সংযুক্ত করেছেন। ইউরো-মেডের এক রিপোর্টে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি বাহিনী যৌন সহিংসতাকে ‘পদ্ধতিগত’ এবং ‘রাষ্ট্র-সমর্থিত সংগঠিত নীতির অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ‘গুরুতর যৌন সহিংসতার ধারা’ নথিভুক্ত করেছে ইসরাইলি মানবাধিকার সংগঠন বি’তসেলেম। অন্য দিকে সেভ দ্য চিলড্রেন জানায়, ইসরাইলের হাতে আটক ফিলিস্তিনি শিশুদের মধ্যে জরিপে অংশ নেয়া অর্ধেকেরও বেশি বলেছে তারা যৌন সহিংসতা প্রত্যক্ষ করেছে বা নিজেরা এর শিকার হয়েছে।
তবে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরাইলের কারা কর্তৃপক্ষ। নিউইয়র্ক টাইমসের বরাতে এক মুখপাত্র বলেন, তারা সুস্পষ্টভাবে অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে অভিহিত করেছেন। ক্রিস্টফের মতে, দায়মুক্তির সংস্কৃতি এসব নির্যাতন চালিয়ে যেতে সহায়তা করছে।
ইসরাইলে নির্যাতনবিরোধী পাবলিক কমিটির নির্বাহী পরিচালক সারি বাশিই বলেন, ফিলিস্তিনি বন্দীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক যৌন নির্যাতন বাস্তব ঘটনা। কারাগারে এসব স্বাভাবিক করা হয়েছে। রিজার্ভ সেনাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ প্রত্যাহারের পর কড়া মন্তব্য করেন বাশিই। বাশিই-এর ভাষায়, অভিযোগ প্রত্যাহার করা মানে ধর্ষণের অনুমতি দেয়া।



