ডিজিটাল সত্তা চুরির ফাঁদ, এআই নিয়ে হিরা তারিনের সতর্কতা

Printed Edition
ডিজিটাল সত্তা চুরির ফাঁদ, এআই নিয়ে হিরা তারিনের সতর্কতা
ডিজিটাল সত্তা চুরির ফাঁদ, এআই নিয়ে হিরা তারিনের সতর্কতা

সাকিবুল হাসান

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই বিপ্লব’ এখন আর কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়, বরং অভিনয়শিল্পীদের চাকরি কেড়ে নেয়ার এক বাস্তব হুমকি। পাকিস্তানি অভিনেত্রী হিরা তারিন নিজেই এই তিক্ত সত্যটি খুব কাছ থেকে টের পেয়েছেন। একটি প্রোডাকশন হাউজের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে চুক্তির ‘ছোট অক্ষরে লেখা’ শর্তগুলো মন দিয়ে পড়ায় অল্পের জন্য নিজের ক্যারিয়ার রক্ষা করতে পেরেছেন তিনি। গত মঙ্গলবার ইনস্টাগ্রামে এক ভিডিও বার্তায় হিরা তারিন সহকর্মী অভিনয়শিল্পীদের এই আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তিনি জানান, চুক্তিপত্র সই করার আগে প্রতিটি লাইন নিখুঁতভাবে না পড়লে কিভাবে একজন শিল্পী খুব সহজেই শোবিজ অঙ্গন থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারেন। ঘটনার বিবরণ দিয়ে হিরা বলেন, গত মার্চ মাসে একটি নাটকের চুক্তিপত্র পর্যালোচনা করার সময় একটি অদ্ভুত ধারা তার চোখে পড়ে। সেখানে লেখা ছিল, ওই প্রোডাকশন হাউজ এবং চ্যানেল তার ‘ডিজিটাল লাইকনেস’ বা ডিজিটাল অবয়বের মালিকানা পাবে। এর সহজ অর্থ হলো তার কণ্ঠস্বর, চেহারা, অঙ্গভঙ্গি অর্থাৎ একজন মানুষ হিসেবে তার সবকিছুর ওপর তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। শুধু ওই নির্দিষ্ট নাটকের জন্য নয়, বরং যেকোনো প্রজেক্টে চিরকালের জন্য তারা এটি ব্যবহার করতে পারবে। বিষয়টি দেখার পরপরই হিরা ‘অ্যাক্টরস কালেক্টিভ অব পাকিস্তান’ (এসিটি)-এর দ্বারস্থ হন। কিন্তু ঘটনাটি এতই নজিরবিহীন ছিল যে, সংগঠনটির কর্তাব্যক্তিরাও তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারছিলেন না এর জবাবে কী করা উচিত। হিরার ভাষায়, ‘আমরা ভেবেছিলাম পাকিস্তানে অন্তত এমনটা কখনো ঘটবে না।’ কিন্তু এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই অন্যান্য অভিনয়শিল্পীরাও একই ধরনের চুক্তিপত্র পেতে শুরু করেন, যা প্রমাণ করে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং একটি নিয়মে পরিণত হতে চলেছে।

ভবিষ্যতের ভয়াবহ পরিণতির ব্যাখ্যা দিয়ে হিরা বলেন, শুরুতে তারা কেবল পোস্টার তৈরির জন্য এআই ব্যবহার করবে, যা দেখতে খুব নিরীহ মনে হবে। এরপর কণ্ঠস্বর ব্যবহার করবে ডাবিংয়ের জন্য। পরবর্তী ধাপে অভিনেতাদের ২০টি দৃশ্যের জায়গায় মাত্র ১০টি দৃশ্যের শুটিংয়ের জন্য ডাকবে, কারণ বাকি দৃশ্যগুলো আগের ফুটেজ দিয়ে এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তারা নিজেরাই বানিয়ে নেবে। আর শেষমেশ একদিন সেই এআই মডেলটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে যাবে এবং শুটিংয়ের জন্য তারকাদের আর কখনোই ডাকা হবে না। হিরা মনে করিয়ে দেন, হলিউডেও এমন ঘটনা ঘটেছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে ওখানকার অভিনয়শিল্পীরা ধর্মঘট ডেকে পুরো ইন্ডাস্ট্রি অচল করে দিয়েছিলেন, যতক্ষণ না চুক্তিপত্রে তাদের আইনি সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছিল। তিনি স্বীকার করেন যে, হলিউডের মতো শক্তিশালী কোনো ইউনিয়ন পাকিস্তানে নেই। এখানকার শিল্পীদের এমনিতেই পারিশ্রমিক, কাজের পরিবেশ এবং রয়্যালটির মতো নানা সমস্যা নিয়ে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। তবে হিরা যুক্তি দেন, একটি দীর্ঘ চুক্তিনামার ভেতর লুকিয়ে থাকা একটি মাত্র ‘খারাপ ধারা’কে হয়তো অনেকেই এই মুহূর্তে এড়িয়ে যেতে পারেন; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি তাদের ক্যারিয়ার চিরতরে শেষ করে দেবে।

সব অভিনেতাদের উদ্দেশ্যে তিনি চুক্তিপত্রে লাইকনেস (ডিজিটাল অবয়ব), পারপেচুয়িটি (চিরকাল), এআই ট্রেনিং মডেল, ডিজিটাল রেপ্লিকা (ডিজিটাল প্রতিলিপি), ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি (েেমধাস্বত্ব) বা সিন্থেটিক পারফরম্যান্সের মতো শব্দগুলো থাকলেই সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। চুক্তিপত্রে এমন কিছু দেখলেই প্রশ্ন তোলার আহ্বান জানিয়েছেন হিরা। প্রয়োজনে আইনি পরামর্শ নেয়ার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘কেবল একজন অভিনেতা চুক্তিপত্রের ছোট অক্ষরগুলো সতর্কতার সাথে পড়লে কিছুই বদলাবে না। তবে আমরা সবাই মিলে যদি এই একই চুক্তির এই একই ধারাগুলোতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানাই, তবে পুরো পরিস্থিতি বদলে যাবে।’