নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর বাজারে আবারো অস্থির হয়ে উঠেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। এক মাসের কম সময়ের ব্যবধানে প্রতি ডজন ফার্মের মুরগির ডিমের দাম বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। একই সাথে চড়া সবজি, মাছ, মুরগি ও গোশতের বাজারও। বৃষ্টির কারণে সরবরাহ কমে যাওয়া, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিক্রেতারা। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ।
গতকাল রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, কাওরানবাজার, টাউন হল বাজার, খিলগাঁও তালতলা ও সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, ফার্মের বাদামি রঙের ডিমপ্রতি ডজন ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাড়া-মহল্লার দোকানে একই ডিমের দাম আরো বেশি চাওয়া হচ্ছে। সাদা ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা ডজন। অথচ তিন সপ্তাহ আগেও এসব ডিমের দাম ছিল ১০০ থেকে ১১০ টাকা।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের ডিম বিক্রেতা আরশাদ হোসেন বলেন, বৃষ্টির কারণে গত দুই সপ্তাহে ডিমের চাহিদা বেড়েছে। পাইকারি বাজারে দাম বাড়ায় খুচরা পর্যায়েও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
খিলগাঁও তালতলা মার্কেটে বাজার করতে আসা আমিনুর রহমান বলেন, বাজারে এলে মনে হয় পকেট কাটা হচ্ছে। সবজির দাম বেশি শুনে ডিম কিনতে গেলাম, দেখি সেখানেও আগুন। গত সপ্তাহে যে ডিম ১৩০ টাকা ডজন কিনেছি, এখন তা ১৫০ টাকা চাচ্ছে।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের এখন ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা। মাছ-গোস্ত তো দূরের কথা, এখন ডিম খেয়েও টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
বাজারে সবজির দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। আলু ছাড়া প্রায় সব ধরনের সবজি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে।
টাউন হল বাজারের সবজি বিক্রেতা আল-নাহিয়ান বলেন, বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন জেলা থেকে সবজি কম আসছে। আবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচও বেড়েছে। ফলে দাম বাড়তি রাখতে হচ্ছে।
সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের বিক্রেতা আব্দুর রহিম বলেন, সবজির দাম বাড়লে মানুষ ডিমের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এবারো সেটাই হয়েছে। অতিরিক্ত চাহিদার সুযোগে ডিমের দাম হু হু করে বেড়েছে।
বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ব্রয়লার মুরগি। বর্তমানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৮৫ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে কিছু দিন ছিল ১৭০টাকা। সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা এবং কালারবার্ড বা হাইব্রিড সোনালি বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকায়।
গরুর গোশতের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি গরুর পোস্ত ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খাসির গোশতের দাম কেজিতে ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা।
মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই। এক কেজি ওজনের রুই বা কাতলা মাছ ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পাঙাশ ও তেলাপিয়ার মতো সাধারণ মাছও ২২০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাবদা মাছের দামও কেজিতে ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেড়ে ৪০০-৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে মাছ কিনতে আসা গৃহিণী রেহানা পারভীন বলেন, এখন বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে শুধু ঘুরতে হয়, ব্যাগে ভরার মতো সাশ্রয়ী কিছু নেই। মাছ- গোশতের দাম এত বেড়েছে যে পরিবারের প্রোটিনের চাহিদা মেটানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। চালের বাজারেও বেড়েছে চাপ। খুচরা বাজারে মাঝারি মানের চাল ৬০ থেকে ৬৮ টাকা এবং মোটা চাল ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যদিও দেশে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে, তবুও বাজারে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। ভোজ্যতেলের বাজারেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। সম্প্রতি সরকার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে চার টাকা বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা নির্ধারণ করেছে। এরপর বাজারে সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, লাভ কমে যাওয়ায় অনেক ছোট দোকানি তেল রাখতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে বেগুনের দাম বেড়েছে ৮২ শতাংশ, কাঁচা মরিচের দাম ৬৭ শতাংশ এবং শসার দাম ৩০ শতাংশ। একই সময়ে ডিমের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
অন্য দিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে পৌঁছেছে। গ্রাম ও শহর, উভয় এলাকাতেই মূল্যস্ফীতি এখন ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন ব্যয়ের মাধ্যমে সরাসরি নিত্যপণ্যের বাজারে পড়েছে। এর সাথে বৃষ্টিজনিত সরবরাহ সঙ্কট যুক্ত হওয়ায় বাজারে অস্থিরতা আরো বেড়েছে। দ্রুত কার্যকর বাজার তদারকি ও সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।



