কৃষকের সেচ খরচ কমাতে ২৮৩ কোটি টাকার প্রকল্প

ফসল উৎপাদনে কৃষকের সেচের খরচ কয়েকগুণ কমিয়ে আনার জন্য দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। ২৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে বরিশাল সেচ প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনের এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে কৃষকের হেক্টরপ্রতি সেচ খরচ সাড়ে ১১ হাজার টাকা থেকে কমে আড়াই হাজার টাকায় আসবে। এতে ফসল উৎপাদন ব্যয়ও কমে আসবে। বরিশাল বিভাগের দুই জেলার পাঁচ উপজেলায় এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ২৪ হাজার ৫১৩ মেট্রিকটন অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition
  • বতর্মানে ৬৭টি পাম্পের মধ্যে চলমান ১১টি
  • সেচে আসবে ৭ হাজার ৩১১ হেক্টর জমি
  • বছরে ২৪ হাজার ৫১৩ টন অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন

ফসল উৎপাদনে কৃষকের সেচের খরচ কয়েকগুণ কমিয়ে আনার জন্য দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। ২৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে বরিশাল সেচ প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনের এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে কৃষকের হেক্টরপ্রতি সেচ খরচ সাড়ে ১১ হাজার টাকা থেকে কমে আড়াই হাজার টাকায় আসবে। এতে ফসল উৎপাদন ব্যয়ও কমে আসবে। বরিশাল বিভাগের দুই জেলার পাঁচ উপজেলায় এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ২৪ হাজার ৫১৩ মেট্রিকটন অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন করা সম্ভব হবে। সাড়ে তিন বছরে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পটি বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য পেশ করা হচ্ছে বলে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দেয়া প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক ও কৃষিনির্ভর দেশ, যেখানে ভূ-উপরিস্থ সেচ প্রকল্পগুলো কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বরিশাল সেচ প্রকল্প (ইওচ) ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করে কৃষিজমিতে সেচ প্রদান, শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ভূগর্ভের পানির স্তর পুনর্ভরণে একটি সফল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রাকৃতিক নদীনালা ও খালবিলের পানি ব্যবহার করে সেচ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রত্যক্ষ অবদান রাখা এবং ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভূগর্ভের পানির ব্যবহার হ্রাস করা সরকারের লক্ষ্য।

তাই বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলায় বরিশাল সেচ প্রকল্পের ১ম পর্যায়ে ১৯৮০ সালে ৫৮টি এবং ২য় পর্যায়ে ১৯৮৫ সালে ২০টিসহ মোট ৭৮টি পাম্প স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ১১টি প্রধান খালসহ পাম্প হাউজ নদীতে বিলীন হওয়ায় বর্তমানে ৬৭টি পাম্প রয়েছে। এর মধ্যে চলমান রয়েছে ১১টি পাম্প। বরিশাল সেচ প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত প্রতিটি পাম্প কোনো একটি নদী বা খালের সাথে সংযুক্ত। এসব নদী বা খাল হতে ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ দেয়া হয়। এসব খালে যথেষ্ট পানির প্রাপ্যতা রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ ঘটেনি। এ প্রেক্ষাপটে, বরিশাল ও ঝালকাঠি জেলার পাঁচটি উপজেলায় বরিশাল সেচ প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনের (১ম পর্যায়) বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। অনুমোদিত হলে প্রকল্পটি সাড়ে তিন বছরে বাস্তবায়ন হবে; যা আগামী ২০২৯ সালের জুনে সমাপ্ত করা হবে।

প্রেক্ষাপট তুলে ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, বরিশাল সেচ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ১৯৭২ সালে সম্পন্ন হয়। এরপর ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরে প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৭৯-৮০ অর্থবছরে সমাপ্ত হয় এটি। যার আওতায় ৫৮টি পাম্প স্থাপন করা হয়। পরবর্তী সময়ে বাকেরগঞ্জ, রাজাপুর ও কাউখালী উপজেলা অন্তর্ভুক্ত করে ১৯৮০-৮১ থেকে ১৯৮৪-৮৫ অর্থবছরের মধ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ বাস্তবায়িত হয়। যার আওতায় ২০টি পাম্প স্থাপন করা হয়। প্রকল্পের আওতায় মোট ৭২ হাজার ৬৪ হেক্টর সেচযোগ্য এলাকা নির্ধারণ করা হয়। প্রাথমিকভাবে দ্বি-উত্তোলনী (উড়ঁনষব খরভঃরহম) পদ্ধতির মাধ্যমে ৭৮টি পাম্প ও ৫০৬টি ফ্লুইসের সহায়তায় ২৬ হাজার ৮৯২ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া হতো। তবে তখন পাম্পগুলো ডিজেলচালিত এবং দ্বি-উত্তোলনী পদ্ধতির কারণে সার্বিক ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় ১৯৯০ সালের দিকে সেচ কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। পরে দ্বি-উত্তোলন পদ্ধতির পরিবর্তে এক-উত্তোলনী (ঝরহমষব খরভঃরহম) পদ্ধতি গ্রহণ করে ১৯৯৭-২০০৪ সালের মধ্যে ১৮টি পাম্প হাউজকে রি-মডেলিং করে বিদ্যুৎচালিত পদ্ধতিতে রূপান্তর করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১টি পাম্পের মাধ্যমে দুই হাজার ৮৫৯ হেক্টর জমিতে গ্রাভিটি পদ্ধতিতে সেচ দেয়া হয়েছে। এ পদ্ধতিতে হেক্টরপ্রতি সেচ ব্যয় প্রায় আড়াই হাজার টাকা; যা কৃষকের নিজস্ব এলএলপি ব্যবস্থাপনায় হেক্টরপ্রতি সাড়ে ১১ হাজার টাকার তুলনায় প্রায় চার গুণ কম। ফলে কৃষকরা গ্রাভিটি পদ্ধতিতে সেচ গ্রহণে অধিক আগ্রহী। ওই প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটি গ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

চলতি এডিপিতে প্রকল্পের অবস্থান :

প্রকল্পটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দবিহীন অননুমোদিত নতুন প্রকল্প হিসেবে সবুজ পাতায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত প্রতিটি পাম্প স্থানীয় নদী ও খালের সাথে সংযুক্ত হওয়ায় এসব জলাধার থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে মিঠাপানি প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়েছে। এ পর্যন্ত লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ ঘটেনি।

প্রকল্পের প্রধান প্রধান কার্যক্রম :

প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় মূল কাজগুলো হলো, ২৩টি ২৫ কিউসেক সাবমারসিবল পাম্প পুনঃস্থাপন, পাম্প হাউজ পুনর্বাসন- ২১টি, সেচ খাল পুনঃখনন- ১০২.২১০ কিলোমিটার, ইনটেক খাল ও লুপ কাট পুনঃখনন-৪.৯৭৩ কিলোমিটার, বাঁধ (ডাইক নির্মাণ)-১৮২.১৫৯ কিলোমিটার, সেচ কাঠামো নির্মাণ/পুনর্নির্মাণ মোট- ৭১৬টি (তন্মধ্যে টার্ন-আউট নির্মাণ- ৫১২টি, চেক স্ট্রাকচার পুনর্নির্মাণ-৬২টি, অফটেক অবকাঠামোর এপ্রোন পুনর্নির্মাণ-১৪টি, হাইড্রোলিক চেক স্ট্রাকচার রিমডেলিং-৬৪টি, অফটেক হাইড্রোলিক স্ট্রাকচারের পুনর্নির্মাণ-৫৬টি প্রভৃতি) এবং স্লুইসগেট (গেট হোয়েস্টিং সিস্টেম সরবরাহ ও সংযোজন কাজ)-২১টি।

ব্যয়ের হিসাব :

প্রস্তাবনায় দেয়া খরচের হিসাবে দেখা যায়, ইনটেক খান ও লুপ কাট পুনঃখননে ৪.৯৭৩ কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে তিন কোটি ৩৪ লাখ ৪২ হাজার টাকা। প্রতি কিলোমিটারে খরচ হবে ৬৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা। আর ১০২.২১০ কিলোমিটার সেচ খাল পুনরাকৃতিতে ব্যয় হবে ৪৩ কোটি ৪৯ লাখ ২৬ হাজার টাকা। যেখানে কিলোমিটারে খরচ ৪২ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। ১৮২.১৫৯ কিলোমিটার বাঁধ (পাইক নির্মাণ) ব্যয় ১৯ কোটি ৬৭ লাখ ৩২ হাজার টাকা ধরা হয়েছে।

পরিকল্পনা বিভাগের অভিমত :

প্রকল্পটির ব্যাপারে কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ মতামতে বলছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পটির ওপর গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কিছু সিদ্ধান্ত পরিপালনসাপেক্ষে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়। দেখা যায় যে, পিইসি সভার সুপারিশের আলোকে প্রস্তাবিত ডিপিপি-টি যথাযথভাবে পুনর্গঠন করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রকল্প এলকায় ২১টি পাম্প হাউজ এবং সংশ্লিষ্ট অফটেক ও চেক স্ট্রাকচার পুনর্বাসনের মাধ্যমে সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সেচ প্রদানকৃত অঞ্চল দুই হাজার ৮৫৯ হেক্টর হতে সাত হাজার ৩১১ হেক্টরে উন্নীত হবে। সেচ খালের উভয় পাড়ে ডাইক নির্মাণ ও খাল খননের মাধ্যমে প্রকল্প এলাকায় গ্র্যাভিটি পদ্ধতিতে নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা প্রদান করে প্রকল্প এলাকায় ফসলের নিবিড়তা ১৭১.০৫ শতাংশ থেকে ২১৬.৫৬ শতাংশে উন্নীত হবে। এতে বছরে প্রায় ২৪ হাজার ৫১৩ মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন করা সম্ভব হবে।