খুচরায় বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ১.২৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

গ্রাহকপর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে এক টাকা ২৫ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি (টিইসি)। কমিশনের দাবি, এই প্রস্তাব কার্যকর হলে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা কমে আসবে। তবে এই প্রস্তাব ঘিরে শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী সংগঠন ও গ্রাহক প্রতিনিধিদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে চাপে পড়ে যাবে বিদ্যুতের প্রায় পাঁচ কোটি গ্রাহক।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কেআইবি মিলনায়তনে বিইআরসির দ্বিতীয় দিনের গণশুনানিতে টিইসির সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সেখানে জানানো হয়, আগামী অর্থবছরে ৯ হাজার ৫৬১ কোটি ৫০ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিক্রির ল্য ধরা হয়েছে। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহে বিতরণ সংস্থাগুলোর মোট নিট রাজস্ব প্রয়োজন হবে প্রায় এক লাখ ১৯ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। গণশুনানিতে উপস্থাপিত তথ্য থেকে জানা যায়, ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত দেশে বিদ্যুৎ বিতরণকারী ছয়টি সংস্থার মোট গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ কোটিতে। এর মধ্যে বেশির ভাগই সাধারণ গৃহস্থালি গ্রাহক, যার সংখ্যা চার কোটিরও বেশি।

কারিগরি কমিটির হিসাব অনুযায়ী, দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় সিস্টেম লস ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ থেকে সামান্য কমে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৩৭ শতাংশে নামতে পারে। একই সাথে টিইসি জানিয়েছে, বিদ্যমান গ্রাহকভিত্তিক ‘স্ল্যাব’ কাঠামোতে আপাতত কোনো পরিবর্তন আনা হবে না। বিশেষ করে ০-৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য বর্তমান সুবিধা বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এর আগে ০-৭৫ ইউনিটের প্রথম স্ল্যাব বাতিল করে ০-২০০ ইউনিটের নতুন স্ল্যাব চালুর আলোচনা থাকলেও টিইসি মনে করছে, এতে নিম্ন আয়ের সাধারণ গ্রাহকরা তিগ্রস্ত হতে পারেন। ফলে বিদ্যমান কাঠামো বজায় রাখার পে মত দিয়েছে কমিটি।

গণশুনানিতে অংশ নেয়া বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের আর্থিক ঘাটতির কথা তুলে ধরে বিভিন্ন হারে মূল্য বৃদ্ধির আবেদন জানায়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বাবিউবো) দাবি করেছে, বর্তমান ট্যারিফ বহাল থাকলে আগামী অর্থবছরে প্রতি ইউনিটে তাদের ২৯ পয়সা ঘাটতি হবে। একই সাথে তারা ৮০ কিলোওয়াট পর্যন্ত নিম্নচাপ (এলটি) গ্রাহকসীমা কমিয়ে ৫০ কিলোওয়াট করার প্রস্তাব দিয়েছে।

বাবিউবো আরো প্রস্তাব করেছে, মুনাফাভিত্তিক বেসরকারি হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ ও শিাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সাধারণ গ্রাহকশ্রেণী থেকে সরিয়ে বাণিজ্যিক ট্যারিফের আওতায় আনা হোক। তবে এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে টিইসি। কমিটির মতে, সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় হাসপাতাল ও শিাপ্রতিষ্ঠানকে ঢালাওভাবে বাণিজ্যিক গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করা যৌক্তিক হবে না। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি গড়ে ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। তাদের মতে, বর্তমানে গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ আট টাকা ৫০ পয়সায় বিক্রি হলেও লোকসান এড়াতে তা ৯ টাকায় উন্নীত করা প্রয়োজন। একই সাথে লাইফলাইন সুবিধা আরো সীমিত করার সুপারিশও করা হয়েছে। অন্য দিকে ডিপিডিসি গড়ে ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির আবেদন করে প্রি-পেইড গ্রাহকদের ওপর নতুন সিকিউরিটি চার্জ আরোপ, কম পাওয়ার ফ্যাক্টর ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানামূলক ব্যবস্থা এবং নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ট্যারিফ দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দিয়েছে। ডেসকো গত তিন বছরে দুই হাজার ৬১১ কোটি টাকার ঘাটতির কথা উল্লেখ করে ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে।

ওজোপাডিকো জানিয়েছে, পাইকারি বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির সাথে খুচরা ট্যারিফ সমন্বয় না হওয়ায় বর্তমানে প্রতি ইউনিটে তাদের ৮৫ পয়সার বেশি ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অন্য দিকে নেসকো বলেছে, বিতরণ ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় নতুন করে ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণ ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প নেই। তবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে শিল্প খাত। উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সঙ্কট, ডলারের উচ্চমূল্য এবং কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শিল্প খাত ইতোমধ্যে চাপে রয়েছে। এই অবস্থায় নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে উৎপাদন ব্যয় আরো বেড়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রফতানি সমতা তিগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) কমিশনের কাছে সাত দফা দাবি উত্থাপন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পে বিদ্যুতের মূল্য অপরিবর্তিত রাখা, ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট কমানো, পাওয়ার ফ্যাক্টর চার্জ পুনর্বিবেচনা, ক্যাপাসিটি চার্জ প্রত্যাহার এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। শিরল্পোদ্যোক্তারা সতর্ক করে বলেছেন, বিদ্যুতের মূল্য আবারো বাড়ানো হলে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে, কর্মসংস্থান কমবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও রফতানি খাত বড় ধরনের চাপে পড়বে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।