বাসস
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের এই যুগে আমরা যেমন আশীর্বাদপুষ্ট, তেমনি সাইবার ঝুঁঁকিও (ডিজিটাল হ্যাজার্ড) আমাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বড় বিপদ তৈরি করছে।
তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো ‘ভুয়া খবর’ (ফেক নিউজ) এখন বৈশ্বিক সভ্যতার জন্য অন্যতম প্রধান কৌশলগত চ্যালেঞ্জ।’ এই সাইবার ঝুঁঁকি মোকাবেলা এবং অনলাইন নিরাপত্তা (ই-সেফটি) নিশ্চিত করতে দেশের আইসিটি বিশেষজ্ঞদের দ্রুত একটি কার্যকর জাতীয় কর্মপরিকল্পনার খসড়া জমা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মন্ত্রী।
গতকাল শনিবার রাজধানীর ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইইবি)-এর কাউন্সিল হলে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
‘বাংলাদেশে ভুয়া খবর মোকাবেলা : নীতি, প্রযুক্তি ও জবাবদিহিতা’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম (এনআইসিটিএফ)।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সমস্যার ভয়াবহতা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, এখন সমাধানের সময় (টাইম ফর সলিউশন)। দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আপনারা দ্রুত একটি ‘জাতীয় কর্মপরিকল্পনা’র খসড়া তৈরি করে তথ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিন। সরকার মেধা ও প্রযুক্তিভিত্তিক সঠিক নীতিমালা প্রণয়নে আপনাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবের অপেক্ষায় রয়েছে।’
বিশ্বব্যাপী মেটা (ফেসবুক), গুগল বা এক্স (টুইটার)-এর মতো টেক জায়ান্টদের জবাবদিহিতা ও রেগুলেশনের আওতায় আনার প্রসঙ্গ টেনে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘মূলধারার গণমাধ্যমগুলো অনেক শ্রম দিয়ে কনটেন্ট তৈরি করে, অথচ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো তা বিনা পয়সায় ব্যবহার করে আয় করছে। অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন আইন করে কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের রয়্যালটি দিতে বাধ্য করছে।’ বাংলাদেশেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে একটি নিয়মতান্ত্রিক ও জবাবদিহিতামূলক কাঠামোর মধ্যে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রাখেন বিএনপির তথ্য, যোগাযোগ ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান, সাবেক সংসদ সদস্য ও এ্যাব-এর আহ্বায়ক প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম তুহিন।
গোলটেবিল আলোচনায় অন্য বক্তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো প্রোপাগান্ডা ও ভুয়া খবর চিহ্নিত করার আধুনিক প্রযুক্তিগত টুলস ব্যবহারের ওপর জোর দেন। একই সাথে মূলধারার গণমাধ্যমের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল লিটারেসি বা তথ্য সচেতনতা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার সুপারিশ করা হয়।
বিদ্যুতের চাপ থেকে ৬৫ ভাগ মানুষকে মুক্ত রাখা হয়েছে
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন, বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কট ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা বিবেচনায় দেশের ৬৫ শতাংশ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির রুটিন সিদ্ধান্তের আওতার বাইরে রেখেছে সরকার। গতকাল সকালে সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতর (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সম্প্রতি সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে আয়োজিত জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা জানান।
ব্রিফিংয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের লিখিত বক্তব্য এবং সার্বিক পরিস্থিতি গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা: জাহেদ উর রহমান। ব্রিফিংয়ে তথ্যমন্ত্রী ও উপদেষ্টা বিদ্যুৎ ও জ্বলানির মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষিত, পরিমাণ ও ধরন তুলে ধরেন। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন তথ্য অধিদফতরের উপপ্রধান তথ্য অফিসার মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম। জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশসহ সকল আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দেশগুলো বড় সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বিগত ২০ বছর ধরে যদি আমাদের দেশের মাটির নিচে আবিষ্কৃত ও চিহ্নিত নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ উত্তোলনের সঠিক নীতিমালা থাকত, তবে এখন আমাদের এতটা আমদানি নির্ভর হতে হতো না। পূর্ববর্তী নীতিমালার ভুলের কারণেই আজ বৈশ্বিক সঙ্কটে আমরা এতটা আঘাতপ্রাপ্ত ও সঙ্কুুচিত হয়ে পড়েছি। এখন আমদানিকারক দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারের বৈশ্বিক মানদণ্ড ও বাধ্যবাধকতা মেনে আমাদের মূল্য নির্ধারণ করতে হচ্ছে।’
কালো টাকার অপরাধের বোঝা বহন করতে হচ্ছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে এখনো ৪১ হাজার কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। অথচ দেশের খেলাপি ঋণ, মানি লন্ডারিং বা ইনফরমাল ইকোনমির (অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি) বিশাল আকারের দিকে তাকালে এই ৪১ হাজার কোটি টাকা কিছুই না। যারা এই অপরাধগুলো করে বিপুল পরিমাণ কালো টাকার মালিক হয়েছেন, বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন, মূলত তাদের সেই অপরাধের বোঝাই আজকের এই সঙ্কটময় ব্যবস্থাপনাকে বহন করতে হচ্ছে।
নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ডিজেলের মূল্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা: জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের যাতায়াত খরচ সাশ্রয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার দর নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে। তিনি বলেন, ‘দেশে ব্যবহৃত মোট জ্বালানি তেলের বেশির ভাগই (৮২ শতাংশ) ডিজেল হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সাহায্য করবে।’
শনিবার সকালে সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতর (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে আয়োজিত এক জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে লিখিত বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান। ব্রিফিংয়ে আরো বক্তব্য রাখেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
উপদেষ্টা বলেন, ‘সারা বিশ্বে এবং বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অনেক বাড়লেও সরকার দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। জুন মাসের জন্য স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে তিন ধরনের জ্বালানি- পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়াতে হলেও ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।’
ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার যৌক্তিকতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা জানান, দেশে প্রতি মাসে ৩ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল ব্যবহৃত হয়, যা মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৮২ শতাংশ। ডিজেল মূলত পণ্যবাহী ট্রাক, গণপরিবহন ও কৃষি সেচকাজে ব্যবহৃত হয়, যার সাথে সাধারণ মানুষের সরাসরি স্বার্থ জড়িত। তিনি আরো বলেন, ‘পেট্রল ও অকটেন মূলত বিত্তবানদের ব্যক্তিগত গাড়িতে ব্যবহৃত হয়, যার মাসিক ব্যবহারের হার যথাক্রমে মাত্র ৯ ও ৮ শতাংশ। ফলে পেট্রল ও অকটেনের দাম বাড়লেও তা সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের যাতায়াত বা নিত্যপণ্যের দামে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।’
বিদ্যুতের নতুন ট্যারিফ ও নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষা সম্পর্কে উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গণশুনানি শেষে সব শ্রেণীর গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের দাম বাড়ালেও সরকার সাধারণ মানুষের স্বার্থে নিজে উদ্যোগী হয়ে পুনরায় আপিল করেছে। এর ফলে শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী ‘লাইফলাইন’ গ্রাহক এবং প্রথম ধাপের (৭৫ ইউনিট পর্যন্ত) গ্রাহকদের বর্ধিত মূল্যের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দেশের মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের প্রায় ৬৫ শতাংশই এই দুই শ্রেণীর আওতাভুক্ত। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের পরও দেশের বেশির ভাগ মানুষকে বাড়তি ব্যয়ের চাপ থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হয়েছে।’ তিনি আরো জানান, এই দাম বৃদ্ধির পরও সরকারকে আগামী বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।



